Ajker Patrika

আত্মহত্যা প্রতিরোধ: ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের বেঁচে থাকার পথ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব

দেশে প্রতিবছর ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন! অথচ এটি অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রয়োজন সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

ডা. শাফেয়ী আলম তুলতুল 
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৪৫
আত্মহত্যা প্রতিরোধ: ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের বেঁচে থাকার পথ
তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব

কখনো কখনো একজন মানুষকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তাঁর জীবন ঠিকঠাক চলছে। তিনি কাজ করছেন, কথা বলছেন, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। অথচ সেই মানুষটির ভেতরে হয়তো চলছে এমন এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, যার কথা তিনি কাউকে বলতে পারছেন না।

আত্মহত্যা অনেক সময় হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বলে মনে হয়। কিন্তু এর পেছনে প্রায়ই থাকে দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা, তীব্র মানসিক চাপ, অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা, একাকিত্ব, অপমান, অপরাধবোধ, সম্পর্কের সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা, মাদক ব্যবহার কিংবা একাধিক ঝুঁকির জটিল সমন্বয়।

মানসিক সংকটের সময় মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে যেতে পারে। বর্তমানের কষ্ট তখন এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখা কঠিন হয়।

আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করেছেন এমন প্রত্যেক মানুষের নির্দিষ্ট মানসিক রোগ থাকবেই, এমন নয়। তবে বিষণ্নতা, বাইপোলার ডিপ্রেশন, সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য সাইকোটিক ডিসঅর্ডার, কিছু পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আত্মহত্যার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়তে পারে। গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণেও তীব্র মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে।

কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা হয়। তারপর তিনি বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু এখানেই চিকিৎসা শেষ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এখান থেকে শুরু হওয়া উচিত আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া।

মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন

আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন প্রয়োজন। কেন এই সংকট তৈরি হলো, বর্তমানে আত্মহত্যার ঝুঁকি কতটা, কোনো মানসিক রোগ আছে কি না, মাদক ব্যবহারের ভূমিকা আছে কি না, কোন ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক চাপ রয়েছে; এসব বোঝা জরুরি।

প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, সাইকোথেরাপি বা উভয়ের সমন্বয়ে চিকিৎসা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত ফলো-আপ এবং সংকটের সময়ে নিরাপদ থাকার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। পরিবার ও কাছের মানুষদেরও সেই চিকিৎসা-পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

অর্থাৎ শুধু মৃত্যুর মুহূর্তটি ঠেকানো নয়; যে যন্ত্রণা মানুষটিকে সেই মুহূর্তে নিয়ে গিয়েছিল, তার চিকিৎসা করাও আত্মহত্যা প্রতিরোধের অংশ।

কিছু সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে

আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা প্রত্যেক মানুষ সরাসরি বলেন না যে তিনি নিজের জীবন শেষ করতে চান। তবে অনেক সময় কথাবার্তা বা আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। সেগুলোর মধ্যে আছে—

  • নিজেকে অন্যের জন্য বোঝা মনে করা
  • গভীর হতাশা বা আশাহীনতার কথা বলা
  • নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া
  • মৃত্যু নিয়ে বারবার কথা বলা
  • হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণগত পরিবর্তন
  • নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়া।

এগুলোর কোনো একটি লক্ষণ দেখা মানেই আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়া নয়। কিন্তু এসব পরিবর্তন ‘নাটক’ বা ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

আর ঝুঁকি বেশি মনে হলে তাঁকে একা না রেখে দ্রুত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। দেশে জাতীয় পর্যায়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ ধরনের সেবা পাওয়া যায়।

অপরাধী নাকি চিকিৎসা জরুরি: আইন কী বলে

আত্মহত্যা প্রতিরোধের আলোচনায় আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার দিকে গুরুত্ব দেয়।

এখানে প্রশ্নটি হলো, আত্মহত্যার চেষ্টা করা একজন মানুষকে আমরা প্রথমে অপরাধী হিসেবে দেখব, নাকি চিকিৎসা ও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন মানুষ হিসেবে দেখব?

আইনের উদ্দেশ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আত্মহত্যা প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সংকটে থাকা মানুষ শাস্তির ভয়ে নিজের কথা লুকিয়ে না রেখে নির্ভয়ে সাহায্য চাইবেন।

অপরাধীকরণের ভয় যদি মানুষকে চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে সেটি আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি জীবন নিয়েই

আত্মহত্যা প্রতিরোধের গল্পটি আসলে মৃত্যুকে ঘিরে নয়; জীবন ঘিরে। একজন মানুষ যখন নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন হয়তো তিনি জীবন অস্বীকার করছেন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্তও তাঁর মনের একটি অংশ তীব্রভাবে বাঁচতে চায়। কিন্তু তিনি তাঁর বর্তমান যন্ত্রণা থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ খুঁজে পান না। সেই পথ খুঁজে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

পরামর্শ দিয়েছেন: ডা. শাফেয়ী আলম তুলতুল, সহকারী রেজিস্ট্রার (সাইকিয়াট্রি)

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত