Ajker Patrika

বাজেটে জনগণের লাভ-ক্ষতি

সম্পাদকীয়
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১০: ৩০
বাজেটে জনগণের লাভ-ক্ষতি

বাজেটের মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্র কোন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কোন শ্রেণির মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কৌশল নিচ্ছে? ফলে বাজেট নিয়ে আলোচনা মানে শুধু রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাবনিকাশ নয়; বরং মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা।

‘করের বোঝা নয়, বিনিয়োগে প্রণোদনা’র ঘোষণা নিয়ে এবারের বাজেট পেশ করা হয়েছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এবারের বাজেট এমন এক সময়ে পেশ করা হলো, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। ফলে এই বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে শুধু ঘোষণায় নয়, বরং সরকার কতটা সফলভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে, তার ওপর।

সাধারণ মানুষের জন্য এই বাজেটের সবচেয়ে লাভের দিকটি হলো, বাজেটে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০টি পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য করের আওতাও বাড়ানো হয়েছে। কথা হলো, কর কমালেই বাজারমূল্য কমে যায় না! সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর যে ঘোষণা এসেছে, তা যদি মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

তবে মুদ্রার অপর পিঠে উদ্বেগের পাল্লা মোটেও হালকা নয়। সাধারণ মানুষের পিঠ যেখানে মূল্যস্ফীতির দেয়ালে ঠেকে আছে, সেখানে পরোক্ষ কর বা ভ্যাট এবং শুল্কের আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মধ্য ও নিম্নবিত্তের ওপর নতুন বোঝা হয়ে চেপে বসবে। প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের বড় সমস্যা হলো, এটি ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবার ওপর সমানভাবে বর্তায়, যা আয়ের বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের যে ইঙ্গিত বাজেটে রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার খরচকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। দেশের তরুণ ও শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান কোনো মেগা পরিকল্পনার অভাব এই বাজেটকে তরুণ প্রজন্মের কাছে কিছুটা মলিন করে তুলবে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনেক বড় অঙ্কের। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের বাজেট কখনোই শতভাগ ত্রুটিহীন বা সবার জন্য সমান স্বস্তির হতে পারে না—এ কথা সত্য। কিন্তু বাজেটের আসল সাফল্য শুধু বড় সংখ্যার হিসাব বা উন্নয়ন বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলনের ওপর। এই বাজেটের লাভ-ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাবটি নির্ভর করবে এর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত