Ajker Patrika

পদ্মার ঢেউ রে...

সম্পাদকীয়
পদ্মার ঢেউ রে...

পদ্মা নদীর ভাঙন বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়। পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটায় প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীগর্ভে বিলীন হয় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও জীবিকার উৎস। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ভাঙন যেন আমাদের কাছে একটি মৌসুমি সংবাদে পরিণত হয়েছে; কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে থাকে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া এলাকায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভাঙন সেই পুরোনো বাস্তবতাকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।

২৩ জুন আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, দৌলতদিয়া ১, ২ ও ৩ নম্বর ফেরিঘাটের কাছে ভাঙন দেখা দিলে কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় ৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া, আরও প্রায় ৪০০ মিটার এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেখানকার শতাধিক পরিবারের দিন কাটছে আতঙ্কে। তাদের অনেকে এর আগেও দু-তিনবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে, বাড়িঘর হারিয়েছে। শুধু কি ঘর হারিয়েছে? তারা বারবার হারিয়েছে নিজেদের জীবনের ভিত্তি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পদ্মা যেমন তার তীরের মানুষদের জীবিকা দেয়, তেমনি এর ঢেউ যেন বারবার ওই মানুষদের শূন্য হাত ও শূন্য হৃদয়ে ফিরিয়ে দেয়।

প্রতিবছর পদ্মা নদীর ভাঙন প্রাকৃতিক ও সাধারণ ব্যাপার হলেও, স্বাভাবিক নয়। কারণ ব্যাপারটা বারবারই ঘটে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বক্তব্যে একই অভিযোগ ফিরে ফিরে আসে; আশ্বাস আছে, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও সেই চিরচেনা শব্দগুলো শোনা যায়—‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে’, ‘আলোচনা চলছে’ কিংবা ‘অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে’। প্রশ্ন হলো, নদী কি অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করে? ভাঙন কি ফাইলের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়?

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হলো এই দৌলতদিয়া। অতীতে ভাঙনের কারণে এখানকার কয়েকটি ফেরিঘাট অকার্যকর হয়ে গেছে। বর্তমান ভাঙন অব্যাহত থাকলে সচল ঘাটগুলোর কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে এটি শুধু স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয় নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

নদীভাঙনকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে দায় এড়ানো সহজ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিবছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে সমস্যার মূল সমাধানে আমরা এখনো সফল হইনি। টেকসই পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন যে খুব বেশি জরুরি, এটা নিশ্চয়ই দায়িত্বরতদের বুঝিয়ে দিতে হবে না। শুধু তাঁদের সদিচ্ছাই সংকটের সমাধান করতে পারে।

দৌলতদিয়ার মানুষ আর নতুন আশ্বাস চায় না, তারা চায় কার্যকর পদক্ষেপ। পদ্মার ভাঙন থামানো কঠিন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা থামানো অসম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা; নচেৎ নদী শুধু মাটি নয়, মানুষের আস্থাও গিলে খাবে!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত