Ajker Patrika

পেটে লাথি

সম্পাদকীয়
পেটে লাথি

অমানবিকতা কত দূর পর্যন্ত গেলে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে লাথি মারা যায়, সে গল্পই আজ বলা হবে। গল্পটির জন্ম দিয়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)কোডেকের কর্মীরা। ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির টাকা শোধ না করায় এক নারীর চুল ধরে টেনে কিলঘুষি ও পেটে লাথি মারেন তাঁরা। আহত নারী কলাপাড়া হাসপাতালে গেলে পরীক্ষার পর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জানান, এই গৃহবধূকে পেটে আঘাত করা হয়েছে।

তলপেটে আঘাতজনিত কারণে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ওদিকে এনজিওর ধানখালী শাখার ম্যানেজার মারধরের ঘটনা বেমালুম অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ওই গৃহবধূকে অফিসে আসতে বলেছি। তাঁকে কোনো মারধর করা হয়নি। বহুদিন ধরে তিনি কিস্তি বকেয়া রেখেছেন।’ অর্থাৎ কিস্তি বাকি থাকায় খুবই মোলায়েম ভাষায় সেই গৃহবধূকে অফিসে আসতে বলেছেন তাঁরা, অথচ সেই ‘মোলায়েম’ কথার আঘাতেই পেটের সন্তান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এই ব্যাপারে ম্যানেজার সাহেব কি কিছু বলবেন?

মানুষের মন এতটাই নির্দয় হয়ে উঠেছে যে অমানবিকতা দেখলেও আশপাশের কেউ সাড়া দেয় না। দরিদ্র মানুষের জন্য এই ক্ষুদ্রঋণ আশীর্বাদ না অভিশাপ, তা নিয়ে তর্কের টেবিল গুলজার করতে পারবে বিচক্ষণ মানুষের দল, কিন্তু এই ঋণ দারিদ্র্যমুক্তির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছে—এ রকম কথা নির্দ্বিধায় বলা যাবে না। বরং এই ঋণের চাপে কত পরিবার ধসে গেছে, সে পরিসংখ্যান থাকলে দারিদ্র্যের মানচিত্রটি ঠিকভাবে বোঝা যেত।

জমিদারি প্রথার সময় যেভাবে নায়েবের নেতৃত্বে জমিদারের সৈন্য-সামন্ত রায়তদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করত, এই এনজিওগুলোর কাজকারবার তা থেকে কিছুটা ভিন্ন রকমের। বিভিন্ন সময় এসব এনজিও কর্তৃক ঋণ আদায়ের যেসব নৃশংস পন্থার কথা শোনা যায়, তাতে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা থাকা দরকার বলে আমরা মনে করি। ঋণ নেওয়ার সময়ই সেই ঋণ শোধ করার মতো উপায় আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া হয় না কেন?

এই নির্দিষ্ট ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বামী গত ডিসেম্বরে কোডেক থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কুয়েতে যান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে পড়েন। ফলে এখন পর্যন্ত তিনি দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি। কায়ক্লেশে দিন গুজরান করার সময়ও দুটি কিস্তি পরিশোধ করেছেন এই নারী। প্রশ্ন হলো, এনজিওগুলো কি শুধু যান্ত্রিকভাবে টাকা আদায় করার কাজটাই করে, নাকি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা যোগ্যতা তাদের আছে?

ঘটনাটির জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পুলিশ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই ঘটনার তদন্ত করতে পারে। মাত্র ৪০ হাজার টাকার জন্য নারীটির পেটে লাথি মারা হয়েছে। আক্ষরিক ও রূপক—দুই অর্থেই পেটে লাথি মারা হয়েছে। এই নারীর জন্য এনজিওর পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। নইলে এনজিওর অত্যাচার থামবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত