Ajker Patrika

সামাজিক আচরণেই প্রবীণদের মর্যাদা

হাসান আলী 
সামাজিক আচরণেই প্রবীণদের মর্যাদা

আমরা প্রায়ই প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলি—সভা করি, সেমিনার করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দিই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের দৈনন্দিন আচরণে সেই সম্মান কতটা প্রতিফলিত হয়? পরিবারে, রাস্তায় কিংবা সামাজিক পরিসরে প্রবীণদের প্রতি আমাদের ব্যবহারই আসলে তাঁদের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে। কাগজ-কলমে নীতি কিংবা মুখের কথায় সম্মান নয়, বরং বাস্তবজীবনের ছোট ছোট আচরণই গড়ে তোলে একটি মানবিক সমাজ। তাই প্রবীণদের সম্মান প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক আচরণের পরিবর্তনে—যেখানে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ হবে প্রতিদিনের চর্চা।

সামাজিক আচরণ পরিবর্তন করা সহজ কাজ নয়। তবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ নিলে এটি সম্ভব। প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

প্রথমত, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তোলা। পরিবর্তনের শুরুটা পরিবার থেকেই হতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, তাঁদের কথা শোনা এবং যত্ন নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।

মা-বাবা নিজেরা যদি প্রবীণদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা এবং প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পর্কিত বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে। গল্প, নাটক, প্রবন্ধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করা। টেলিভিশন, পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবীণদের ইতিবাচক দিক, তাঁদের অবদান ও জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে হবে। নেতিবাচক বা হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনা এড়িয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

চতুর্থত, কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানো। এলাকায় এলাকায় প্রবীণদের নিয়ে সভা, গল্পচক্র, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। এতে প্রবীণেরা একাকিত্ব থেকে বের হয়ে আসেন এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

পঞ্চমত, আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ। প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় যে আইনগুলো আছে, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্যাতন বা অবহেলার ঘটনা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ (ইন্টারজেনারেশনাল বন্ডিং) তৈরি করা। তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বিভিন্ন যৌথ কার্যক্রম যেমন—গল্প বলা, অভিজ্ঞতা শেয়ার, প্রযুক্তি শেখানো ইত্যাদি আয়োজন করা যেতে পারে। এতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে।

সপ্তমত, প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করা। পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের মতামত নেওয়া হলে তাঁরা নিজেদের মূল্যবান মনে করেন। এতে তাঁদের আত্মসম্মান বজায় থাকে।

অষ্টমত, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো পদক্ষেপের অপেক্ষা না করে, প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে শুরু করতে পারে। নিজের পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সময় দেওয়া, তাঁদের কথা শোনা—এসব ছোট কাজই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

সবশেষে, সামাজিক আচরণের পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; বরং সচেতনতা, শিক্ষা, ভালোবাসা ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়। আমরা যদি আজ থেকেই নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনি, তবে আগামী প্রজন্ম একটি আরও মানবিক ও প্রবীণবান্ধব সমাজ পাবে।

হাসান আলী , প্রবীণ-বিষয়ক লেখক ও সংগঠক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত