প্রতিবছরই বাজেট পেশ হয়। জনবান্ধব অর্থনীতিবিদেরা এ নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে বলেন, বাজেটটি যেন সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য হয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, বাজেট আর সাধারণ মানুষের জন্য সুখের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে না। এ বছর সবার প্রত্যাশা ছিল অন্তত এবারের বাজেটটি জনবান্ধব হবে। কারণ, বর্তমান সরকার হলো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকার। কিন্তু এবারও দেখা গেল, বাজেট একটি অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা না হয়ে বরং রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক চাপ ও আনুগত্যের দলিল হয়ে উঠেছে—এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বাজেট নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, এবারের বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)—এই দুই পায়ের ওপর দাঁড়ানো। তাঁর বক্তব্য শুধু সমালোচনা নয়, বরং একটি গভীর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে, যেখানে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যেন হাত বদল হয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ‘ট্রাম্প-আইএমএফ, দুই পায়ের ওপর দাঁড়ানো বাজেট’ মন্তব্যটি শাব্দিকভাবে যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি বাস্তবতায় ততটাই উদ্বেগজনক।
বাজেট যেন কেবল সংখ্যার খেলা নয়; বরং এর পেছনে আছে এক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনীতি সমীকরণ। সেটি বোঝা যায় যখন দেখা যায়, দেশীয় তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, আইটি পেশাজীবীদের ওপর বাড়ানো হয়েছে করের চাপ—অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে শূন্যে। এলএনজির ওপর ভ্যাট তুলে দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সেই ঘাটতি পূরণে জনগণের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে, বাড়ছে ভ্যাট, শুল্ক, আয়কর—একটি ঘূর্ণি-চক্র, যেখানে ভুক্তভোগী সব সময় সাধারণ মানুষ।
আনু মুহাম্মদ এটিকে সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, এটি একটি দ্বৈত নীতির বাজেট—বলা হচ্ছে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জননিরাপত্তা—কিন্তু বাস্তবে এগুলো রয়ে গেছে কথার ফুলঝুরিতে। বাস্তবায়নে গুরুত্ব পেয়েছে করপোরেট স্বার্থ, আমলাতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দায়ও স্পষ্টভাবে তুলেছেন—মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার গ্যাস দুর্ঘটনায় প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংসের দায়ে কোনো ক্ষতিপূরণ আদায়ের পদক্ষেপ বাজেটে অনুপস্থিত। অথচ সেই একই দেশের কোম্পানির স্বার্থে শুল্ক তুলে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কেবল ঋণনির্ভর নয়, নীতিনির্ধারণেও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-ওয়াশিংটন চুক্তির বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই চুক্তি আমাদের শুধু টাকার ঋণ দেয় না, নীতিমালাও চাপিয়ে দেয়—যার মূল্য দিতে হয় দেশীয় জনগণকে।
আরেকটি আশঙ্কাজনক দিক হলো সুদের হার। আনু মুহাম্মদ স্বীকার করেন, এটি বর্তমান সরকারের দোষ নয়, বরং ধারাবাহিক নীতিগত ভুলের ফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার সমাধানে বাজেটে কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে? উত্তর হলো—কিছুই না। বরং আরও বেশি ঋণ গ্রহণ করে এবং ভ্যাট বাড়িয়ে খরচ মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই বাজেট দেশের তরুণ উদ্যোক্তা শ্রেণিকে নিরুৎসাহিত করবে। অনলাইন ব্যবসায় যাঁরা স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের ওপর নতুন করের বোঝা চাপানো হয়েছে। যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং করে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন, তাঁরা এখন হাল ছাড়বেন নাকি দেশ ছাড়বেন—সেই প্রশ্নও এখন সময়োপযোগী। সরকারের তরফ থেকে কোনো সহায়তা বা ইনসেনটিভ নয়, বরং সন্দেহ ও করের চাবুক—এটাই যেন রাজনীতি ও অর্থনীতির নতুন সম্পর্ক।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই বাজেটে কোনো সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন ঘটেনি। কারণ, জনগণের সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ছাড়াই এটি তৈরি করা হয়েছে। অথচ বাজেট হওয়া উচিত ছিল দেশের সামাজিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক বৈষম্য, জলবায়ু সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে পরিকল্পিত উন্নয়নের রূপরেখা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই বাজেটের মূল দর্শন হলো: ‘আন্তর্জাতিক ঋণদাতার শর্ত মেনে চলো, অভ্যন্তরীণ আয় করের মাধ্যমে তোলো, জনগণের ওপর বোঝা চাপাও।’
এই বাজেট নিয়ে আমাদের প্রশ্ন তোলা দরকার—বাজেট কি দেশের প্রান্তিক মানুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি, নাকি করপোরেট স্বার্থ ও আমলাতন্ত্রের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি? বাজেটে পরিবেশের কথা কই? গ্যাস প্রকল্পের ধ্বংসাত্মক প্রভাব নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই কেন? তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো রূপরেখা নেই কেন? নিজস্ব সম্পদ রক্ষা ও বৈষম্য হ্রাসের কোনো রূপরেখা আছে কি?
আনু মুহাম্মদের বক্তব্য অনুসরণ করলে দেখা যায়, এবারের বাজেট আসলে একটি বৈদেশিক আনুগত্যের দলিল—যেখানে জনগণ অনুপস্থিত, ন্যায়বিচার অনুপস্থিত, জাতীয় পরিকল্পনার দূরদৃষ্টি অনুপস্থিত। এর ফলাফল হতে পারে—ঋণনির্ভরতা আরও গভীর হওয়া, আত্মনির্ভরতা হ্রাস পাওয়া এবং এক ধরনের অর্থনৈতিক নিপীড়ন, যার শিকার হবে পরবর্তী প্রজন্ম।
বাজেট নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত জাতীয় ভবিষ্যৎকে ঘিরে—কিন্তু আমরা দেখছি, তা হয়ে উঠছে ক্ষমতার ব্যালেন্সের প্রতিচ্ছবি। যত দিন না এই প্রবণতা পাল্টানো যাচ্ছে, তত দিন বাজেট হবে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র, অর্থনীতির বাস্তব সমাধান নয়।
এই মুহূর্তে দরকার কী? গণতান্ত্রিক বাজেটপ্রক্রিয়া, যেখানে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, তরুণ, নারী, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা থাকবে। না হলে ‘উন্নয়ন’ নামক প্রতারণামূলক শব্দে মোড়ানো এই বাজেট আসলে এক গভীর দাসত্বের প্রস্তাব ছাড়া আর কিছুই হবে না।
লেখক: সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

‘মবের মুলুক’ কাকে বলে, ইউনূসীয় শাসনামলে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দেশের মানুষ। এই কথাটি পত্রপত্রিকায়, চায়ের আড্ডায়, আলোচনা সভায় এত বেশি শোনা গেছে যে মূল যে ‘মগের মুলুক’ প্রবাদটি, তা যেন অনেকটা তলিয়ে গেছে, সেভাবে আর ব্যবহার হচ্ছে না।
১৭ ঘণ্টা আগে
হাসনাত কাইয়ুম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি। হাওরের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে কারাভোগ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
২০ ঘণ্টা আগে
বুঝতে পারছি না, দেশে হচ্ছেটা কী! গত মাসেই কয়েকটা খবর দেখলাম গাছ কাটার। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫৪টি পরিণত বড় গাছ কেটে ফুটপাত ও রাস্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০ ঘণ্টা আগে
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কেন বাড়ে, সেটা বোঝার জন্য পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ তার কারণ জানে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষেরা সেটা জেনেও না জানার ভান করেন। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলো গবেষণা
২ দিন আগে