
মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা শুরু না করলে বোঝা সম্ভব হতো না যে মানববৈচিত্র্য নিয়ে তিনি এ জগতে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। বয়সে তরুণ। যথেষ্ট স্মার্ট। কথাও বলছিলেন মীম ইসলাম দৃপ্ত স্বরে। প্রথমে কণ্ঠস্বর ছিল কষ্টে মোড়ানো। ধীরে ধীরে একসময় সেই অবস্থা উধাও। বলছিলেন, জন্মের পর থেকে পরিবারে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে যখন ম-বাবা বুঝতে পারছিলেন যে তাঁদের এই সন্তান অন্য দুটি সন্তানের চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের, ভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়ে তাঁদের সংসারে জন্মগ্রহণ করেছে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সমাজব্যবস্থায় যাদের বিচরণ ও অবস্থান স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক হয়নি কখনো। অন্যসব বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে জগতে ভূমিষ্ঠ হওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তি-গোষ্ঠীর ভেতর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব না থাকলেও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতি তা বেশ লক্ষণীয়। উপরন্তু পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের মূলধারা ও তার অলিগলিতে খুব সহজে অবলীলায় তাদের লাঞ্ছিত হতে দেখা যায়। অন্য বৈচিত্র্য বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসা ব্যক্তিদের প্রতি সমাজ সহানুভূতিশীল হলেও তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি হতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এককথায়, হতে পারেনি। তেমন দৃশ্যমান কোনো দৃষ্টান্ত আদতে নেই। বিগত সরকারের আমলে তাদের ভোটাধিকার ও অন্যান্য বিষয়ে উদ্যোগ গৃহীত হলেও পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই পূর্বের জায়গায় ফিরে যায়। কিংবা কী অবস্থায় আছে তা জানা নেই।
যাহোক, মীমকে নিয়ে মা-বাবার বিরূপ অনুভূতির সঙ্গে নিজের দুঃখকষ্ট যুক্ত হয় যখন শৈশবে বুঝতে পারছিলেন যে আর পাঁচটা মেয়ের মতো তিনি যেমন নন, ঠিক তেমনই আর পাঁচটা ছেলের মতোও তিনি নন। তবে তিনি নিজেকে একজন নারী হিসেবে পরিচিত করতে চান। পারিবারিক মায়া, স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি অবশেষে তাঁর খালার কাছে বেড়ে ওঠেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। মানে দ্বিতীয় সন্তান। মা-বাবার কাছে আর দুটি সন্তান বেড়ে ওঠার সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার পেলেও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর কপালে সেই সব জোটেনি। নিজে সাজতে ভালোবাসতেন। তাই একসময় অন্যকে সাজানোর ইচ্ছে জাগে। পরিচয় ঘটে নারী মৈত্রী নামক একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে। নারী মৈত্রী তাঁকে অদম্য প্রেরণা জোগায়। উদ্বুদ্ধ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে। ট্রেনিং নেন বিউটিশিয়ানের। যে ভাড়া রুমে বসবাস করতেন, সেখানে একটা আয়না ও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে শুরু করেন মীম বিউটিশিয়ান সেলুন। পাশে দাঁড়ায় নারী মৈত্রীর মতো একটি সংস্থা।
এখন মীমের তিন রুমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জে। চেহারায় তাঁর সফলতার অভিব্যক্তি। মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন সবাই তাঁর পরিবর্তিত জীবনের গল্প। মীম বলছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের কথা। আর সেটি হলো, অদম্য সাহস, মনোবল নিয়ে এগিয়ে এখন তিনি তাঁর বাবা ও মায়ের ‘চোখে হারাই’ হয়েছেন। সব সময় তাঁকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা তাঁদের। এক মুহূর্ত মীমকে ছাড়া বাবা ও মায়ের চলে না। কথাগুলো আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলছিলেন মীম। ভাবছিলাম, সমাজে কতজনের কত রকম অর্জন, সফলতা আছে, থাকে এবং সেই সব নিয়ে আছে কত রকম স্বস্তি, শান্তি। মীমের অর্জন ও স্বস্তি সবকিছুকে যেন ছাপিয়ে গেছে। মীম বাবা ও মায়ের চোখে হারাই হয়েছেন। ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার কারণে একদিন মীমকে পরিবার ছেড়ে যেতে হলেও এখন পরিবার তাঁর সঙ্গে। এখন তাঁর জন্মের বিচিত্রতা নিয়ে আফসোস নেই। যাঁরা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিশ্বাস করেন জগতে যা কিছু ঘটে, ঘটবে সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেমতো, প্রতিটি প্রাণীর জন্ম ও মৃত্যুর হিসাব তাঁরই হাতে, অন্তত তাঁরা মীমের মতো ব্যক্তিসত্তার পাশে দাঁড়াতে পারেন। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর বিপরীত হতে দেখা যায়। আমি মীমকে আবিষ্কার করলাম নারী মৈত্রী আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্যাপন অনুষ্ঠানে। তাঁর দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচিত হলাম।
আমরা দেখেছি, সমাজে সহায়তা, সহযোগিতা, সহানুভূতি শব্দগুলো ব্যক্তি-গোষ্ঠীস্বার্থে যতটা ব্যবহৃত বা প্রযোজ্য হয়ে ওঠে, মানবিক কারণে ততটা হতে দেখা যায় না। আবার মানবতাকে পুঁজি করে একটা শ্রেণির থাকে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের পাঁয়তারা। নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এরা প্রচার-প্রচারণা চালায় এবং সেটা করে অসহায় মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। বলা বাহুল্য, এরা সবাই মানব বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু একটু ব্যতিক্রম হয়ে জন্মগ্রহণ করাটাকে এরা মেনে নিতে পারে না অনেক ক্ষেত্রে। এমনকি নিজ পরিবারেও। একজন প্রতিবন্ধী শিশুর মাকে যেমন এমন সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিবন্ধী শিশুটি যেমন পরিবারের বোঝায় পরিণত হয়, ঠিক তেমনি একজন ট্রান্সজেন্ডার শিশু বা ব্যক্তিকে তার প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবার ও সমাজে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। আমাদের দেশে এমন মনমানসিকতা দেখা গেলেও উন্নত বিশ্বে তা দেখা যায় না।
একটি দেশে প্রতিটি মানুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠাই হলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সবাইকে নিয়ে পরিকল্পনা করা, যোগ্যতা অনুসারে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া—সুশাসনের জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। দেশের জনগণের সবার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, একটা নিরাপদ বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যখন দেশে প্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন হয়, প্রাণী হত্যা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বা বৈচিত্র্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করা একজন মানুষকে পরিবার ও সমাজচ্যুত করার প্রবণতা অত্যন্ত দুঃখজনক।
রাস্তাঘাটে এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মানুষগুলোকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় প্রায়ই। পরিবারচ্যুত এই মানুষগুলো দলবদ্ধভাবে, কখনোবা একা অন্যদের দ্বারস্থ হয় সাহায্যের জন্য। হাসি, ঠাট্টা করে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। উত্ত্যক্তের অভিযোগও ওঠে। যাদের দ্বারস্থ হয় তারা বিরক্ত হয়। যোজন দূরত্ব এই দুই শ্রেণির আচরণে। অথচ প্রত্যেকেই নাগরিক এ দেশের। মাঝেমধ্যে এমন সংবাদ পাওয়া যায়—ট্রান্সজেন্ডারদের কেউ কেউ নিজ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁদের সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। রাষ্ট্র চাইলে পারে এই বিশেষ শ্রেণির মানুষগুলোকে সম্পদে পরিণত করতে। যাতে তাদের মানবমর্যাদা বৃদ্ধি হয় এবং তাদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে। মীমের মতো তারাও হয়ে উঠতে পারে বাবা ও মায়ের ‘চোখের হারাই’। আর নারী মৈত্রীর মতো সংগঠনগুলো পারে তাদের সম্মানিত করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতে। অদম্য প্রেরণায় ওরা ওদের সক্ষমতা দেখাক, সার্বিক উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত হোক।

ক্ষমতাসীন দলের একজন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা কেন মাদকের কারবার করবেন, সেটা কোনো প্রশ্ন নয়। কারণ, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক বন্ধনের চেয়ে অর্থ কামানোর দর্শন প্রকট। যার ফলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্তগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখা যায়। দল কী চাইছে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে...
৫ ঘণ্টা আগে
একটা দারুণ সুন্দর কবিতা আছে শঙ্খ ঘোষের। ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ নিয়ে। পশ্চিমা দর্শনের ‘উই’ আর ‘দে’ নয়। এই কবিতা একেবারে আমাদের শিরায় শিরায় প্রবহমান একটি বিষয়ের অবতারণা করেছে। কোনো এক শাসনামলের মন্দকে চিহ্নিত করে সেই শাসককে ফ্যাসিবাদ নাম দেওয়ার পর নিজে যখন ক্ষমতায়, তখন সেই একই রকম ফ্যাসিবাদী শাসন...
৫ ঘণ্টা আগে
গত বছর নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক চাপে জেরবার জনজীবন এই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল। তা একপর্যায়ে এমন দাবানলের রূপ নেয় যে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার। জনরোষের মুখে কয়েকজন মন্ত্রীর পালানোর চেষ্টার ভিডিও সে সময়...
১ দিন আগে
তিন দিকে নদীবেষ্টিত ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে লাগোয়া কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকা। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কালজানি নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এলাকটি। শুধু একটি সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যুগের পর যুগ। নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই...
১ দিন আগে