Ajker Patrika

‘একসঙ্গে এত কবর কখনো খুঁড়ি নাই’

বাগেরহাট প্রতিনিধি
আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ১৩: ৫১
‘একসঙ্গে এত কবর কখনো খুঁড়ি নাই’
একই পরিবারের ৯ সদস্যের জন্য নয়টি মসজিদ থেকে আনা হয়েছে ৯টি খাটিয়া। ছবি: সংগৃহীত

বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য কবর প্রস্তুত করা হয়েছে। মোংলা কবরস্থানে পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে ৯টি কবর। এসব কবরেই শায়িত হবেন নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর পরিবারের ৯ সদস্য।

মোংলা কবরস্থানের খাদেম মুজিবুর ফকির বলেন, ‘পরিবারের সম্মতিতে আমরা একই স্থানে ৯টি কবর প্রস্তুত করেছি।’

খাদেম আরও বলেন, ‘১৭ বছর ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছি। কখনো একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্যের কবর খুঁড়ি নাই। ঘটনাটা খুবই হৃদয়বিদারক।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে হস্তান্তর করা হয়।

নিহত ১৪ জনের মধ্যে বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি, ভাগনে-ভাগনিসহ একই পরিবারের ৯ জন রয়েছেন। আজ শুক্রবার ভোরের দিকে তাঁদের মরদেহ পৌঁছায় বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায়। আর কনে তাঁর বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়। জুমার নামাজের আগে কয়রায় তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

পুলিশও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়ল মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের। কনের বাড়িতে বিয়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাঁরা কয়রা থেকে বাগেরহাটের মোংলার উদ্দেশে রওনা হন। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন ওঠেন মাইক্রোবাসে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক দিয়ে আসা নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, বরের ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তাঁর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাঁদের ছেলে আলিফ, আরফা, ইরাম। অন্যদের মধ্যে কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাস চালক নাঈম।

মাইক্রোবাস চালক নাইমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামের। আজ জুমার নামাজের আগে গ্রামের বাড়িতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

মোংলা শহরে বর ছাব্বিরের মোবাইল ফোনের দোকান রয়েছে। কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

বরের বোন ঐশীর শ্বশুর মো. আব্দুল আলীম বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের (বরের বাবা) আদি বাড়ি কয়রাতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। তারা ১২টার পর রওনা দেয়। আমার পুত্রবধূ, একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’

আজ সকালে মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলাবুনিয়ায় কনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শত শত মানুষের ভিড়। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর শুনে আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছে। শোকে স্তব্ধ সবাই। আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ। পাশে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বাকি পাঁচজনের মরদেহ।

প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না!’

নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, ‘আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও বিয়ে দিয়েছিলেন। পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গেল!’

সাজ্জাদ সরদার আরও বলেন, ‘আশপাশের ৯টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে ৯ স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে। জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁদের জনের জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনা, নিহত ১০ জনই একই পরিবারের

কোমায় আছেন মোজতবা, হারিয়েছেন এক পা—ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের দাবি

মির্জা আব্বাসকে দেখতে হাসপাতালে জামায়াত আমির

ইরানকে সাহায্য করছে পুতিনের ‘গোপন হাত’—ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সতর্কতা

ইরাকের ঘাঁটি থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ইতালির

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত