
গত বছর নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক চাপে জেরবার জনজীবন এই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল। তা একপর্যায়ে এমন দাবানলের রূপ নেয় যে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার। জনরোষের মুখে কয়েকজন মন্ত্রীর পালানোর চেষ্টার ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিক্ষোভের মুখে সরকার পতনের পর দ্রুত নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার ক্ষমতায় এসেই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দেয়। রাষ্ট্রের নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে তারা খুব বেশি নাড়াচাড়া করেনি। বরং এই বিষয়গুলো ওই সরকার পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
এরপর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নেপালের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে র্যাপার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। নেপালের ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টের ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোট হয়েছে। বাকি ১১০টি আসনে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের অনুপাত বিবেচনায়। সরাসরি ভোট হওয়া ১৬৫টি আসনের মধ্যে আরএসপি জিতে নিয়েছে ১২৪টি আসন। সে হিসাবে তারা ভোটের অনুপাতের বিবেচনায় বাকি ১১০ আসন থেকেও বেশির ভাগ আসন পেয়ে যাবে।
শুধু তা-ই নয়, এই নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে। ওলি বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন বালেন্দ্র শাহের কাছে। প্রশ্ন আসতে পারে, নেপালের নির্বাচনে তরুণদের দল এত বিপুল ভোটে বিজয়ী হলো কী করে? জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখল কেন?
এসব প্রশ্নের আগে বালেন্দ্র শাহের বিষয়ে একটু আলোচনা করা দরকার। তিনি কিন্তু দুদিন আগে হঠাৎ করে রাজনীতির ময়দানে হাজির হননি। ৩৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ‘বলেন’ নামে বেশি পরিচিত। পড়াশোনা করেছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। পেশায় প্রকৌশলী। তিনি অনেক বছর ধরেই র্যাপ গানের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর গানগুলোয় সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে তরুণদের আন্দোলনের সময় বালেন্দ্র শাহের গানগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ে।
বালেন্দ্র শাহ ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর তিনি নিয়ে আসেন তাঁর রাজনৈতিক দল আরএসপি। এই দলটি সব সময়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। ফলে দ্রুত তরুণদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। গত সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভের সময় বালেন্দ্র শাহ সরাসরি বিক্ষোভকারীদের পক্ষে অবস্থান নেন।
মেয়র থাকাকালে বালেন্দ্র শাহ রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখায় জোর দিয়েছিলেন। লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার বিরুদ্ধেও নিয়েছিলেন কড়া অবস্থান। গত ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া বালেন্দ্র শাহের দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের সংখ্যা কমানোর অঙ্গীকার ছিল।
আগামী পাঁচ বছরে নেপালের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারে উন্নীত করার এবং দেশের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি। পাশাপাশি জনগণের জন্য স্বাস্থ্যবিমাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবলয় নিশ্চিত করারও জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
এবার আসা যাক, কেন নেপালের নির্বাচনে আরএসপি এত বড় জয় পেল এবং জনগণ কেন তাদের ওপর আস্থা রাখল, সে প্রশ্নে। নেপালের বিক্ষোভের একটা বড় দিক হলো, বিক্ষোভের জেরে সরকার পতনের পরপরই তরুণেরা ফিরে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা নিজেদের কাজে। তরুণদের প্রতিনিধি অন্তর্বর্তী সরকারে থাকলেও তাঁদের ঘিরে তেমন কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। এমনকি বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে মব কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনাও তেমন ঘটেনি। দেশটির রাজনীতিসচেতন তরুণেরা মূলত প্রহর গুনছিলেন ভোটের জন্য। আর সেই ভোট যখন এল, তাঁরা তাঁদের রায় জানিয়ে দিয়েছেন।
পাশাপাশি বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন আরএসপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোও ব্যাপক হারে ভোট টানতে সহায়ক হয়েছে। নেপাল বেশ কয়েক বছর ধরে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা সংকটে ধুঁকছে। বিশেষ করে দুর্নীতি গেড়ে বসেছিল। বছরের পর বছর ধরে রাজনীতির ময়দান দাপিয়ে বেড়ানো নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। তাঁদের সন্তানদের বিলাসী জীবন সংকটে ধুঁকতে থাকা সাধারণ মানুষকে ধাক্কা দিয়েছিল। ফলে তাঁরা চেনা রাজনীতিকদের প্রতি আস্থা হারিয়েছিলেন। হয়তো তাঁরা ‘নতুন শুরুর’ অপেক্ষায় ছিলেন। জাতীয় নির্বাচনে সেই ‘নতুন শুরুর’ পক্ষেই রায় দিয়েছেন তাঁরা।
আরএসপির নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটির প্রতিশ্রুতিগুলো জনমানুষকেন্দ্রিক। তারা বেকারত্ব দূর করার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দেশে কাজ না পেয়ে তরুণসমাজের মধ্যে বিদেশে চলে যাওয়ার মানসিকতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। জনগণকে এই বিষয়গুলো আকৃষ্ট করেছে। কারণ, সাধারণ একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনি নিজে এবং তাঁর পরিবার। তিনি যে সমাজে বাস করেন, সেই সমাজের নিরাপত্তাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চান, তিনি যে আয় করেন, সেই আয়ের টাকায় তাঁর সংসার চলে যাক। ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা সঞ্চয় থাক। কিন্তু দুর্নীতিসহ নানা কারণে অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়া একটি রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকের এই মৌলিক চাওয়াটা পূরণ করতে পারে না। ফলে জনমনে ক্ষোভ জমতে শুরু করে।
বালেন্দ্র শাহ যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছেন, সেগুলো তিনি যদি শতভাগ না হলেও সিংহভাগ পূরণ করতে পারেন, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, নেপালের সাধারণ মানুষের জীবন অনেকখানি বদলে যাবে। এখন দেখার বিষয়, আরএসপি তার প্রতিশ্রুতিগুলো রাখে কি না, অথবা কতখানি রাখতে পারে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, নেতা যদি তাঁর প্রতিশ্রুতি না রাখেন, কোনো না কোনো দিন তিনি জনরোষের মুখে পড়বেনই। সেই জনরোষের প্রতিফলন দেখা যেতে পারে জাতীয় নির্বাচনে, কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো বিক্ষোভের রূপে।
নেপালে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বালেন্দ্র শাহ ও তাঁর দলকে এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। না হলে তাঁকেও কোনো না কোনো দিন কে পি শর্মা ওলির মতো বিতর্কিত হতে হবে, জনরোষে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নিতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, মেয়র থাকাকালে লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বালেন্দ্র শাহ পুলিশ বাহিনীকে কঠোরভাবে ব্যবহার করেছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে সে সময় সমালোচনাও হয়েছিল। তিনি যদি সরকার পরিচালনার সময়ও এভাবে কঠোর হন, মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করেন, তাহলেও ভবিষ্যতে তাঁকে হয়তো বিপদে পড়তে হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাঁকে পুনর্বাসনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
বালেন্দ্র শাহের সামনে এখন দেশ গঠনের অপার সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তিনি নেপালকে বিশ্ব দরবারে উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। তিনি সেই কাজটি করতে পারেন কি না, তা তাঁর কর্মকৌশলই বলে দেবে।

তিন দিকে নদীবেষ্টিত ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে লাগোয়া কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকা। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কালজানি নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এলাকটি। শুধু একটি সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যুগের পর যুগ। নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই...
৩ ঘণ্টা আগে
মার্কিন-ইসরায়েলের আগ্রাসনের মাধ্যমে সূচিত ইরান সংঘাত বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতেও তীব্র প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর মাধ্যমে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান ৮৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ৮ মার্চ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার একাডেমিক শিক্ষাঙ্গনে আলোকবর্তিকারূপে অবদান রেখে গেছেন।
৪ ঘণ্টা আগে
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের কথা নিশ্চয় কেউ ভোলেননি। শুধু ‘শিবির’ সন্দেহে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছিল। আবরার শিবির করতেন কি না; কিংবা শিবির সমর্থন করতেন কি না, সে ব্যাপারে তাঁর নিহত হওয়ার পরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
১ দিন আগে