দুই বাংলাতেই অদ্ভুত সমন্বয়ী রাজনীতি আছে
অর্ক ভাদুড়ী পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাকটিভিস্ট; ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকার এক্সিকিউটিভ এডিটর। নিয়মিত কলাম লেখেন ব্রিটিশ দৈনিক ‘মর্নিং স্টার’-এ। স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া
ও ইউরোপের পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বাংলাদেশ নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। ঢাকার
এক কফি হাউসে ভারত-বাংলাদেশ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলন এবং সেখানে অতি
ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের কারণসহ নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন কেমন?
৪ মে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আর আগের মতো নেই। বিজেপির প্রধান বিরোধী দল, খাতায়-কলমে যা এখনো তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দলটাকে কার্যত তিন টুকরো করে দেওয়া হয়েছে। একটা ছোট অংশ মমতা ব্যানার্জির অনুগত হিসেবে তাঁর সঙ্গে আছে। একটা বড় অংশ ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল’ নামে নতুন একটা দল গঠন করেছে, যারা বিজেপির গৃহপালিত বিরোধী দল। আরেকটা অংশ, অর্থাৎ তৃণমূলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য এনসিপিআই নামে আলাদা দল তৈরি করেছেন।
২০১১ সালে ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের মধ্যে একটা দীর্ঘ রক্তক্ষরণ চলছিল। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর, আর তৃণমূল কংগ্রেসের এই অবস্থার ফলে, রাজ্যে বামপন্থীদের সামনে এখন একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভোটের বিচারে এখনো সেটা তেমন দেখা যাচ্ছে না। কারণ, দুটি উপনির্বাচন হয়েছে এবং বামেরা সেখানে ভালো ভোট পায়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে যে তারা হয়তো একটা বড়সড় শক্তির জায়গায় পৌঁছাবে। এখনো পর্যন্ত অবস্থা এই।
বিজেপির এই উত্থান আর ক্ষমতায় আসার পর যেসব কর্মকাণ্ড, এসবের মধ্য দিয়ে তাদের পতন শুরু হলো কি?
না না না, পতন এখনই বলা যাবে না। আমরা বলছি
যে এখন তাদের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ চলছে। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসকে হারিয়ে বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসা আমি দেখিনি, তখন আমার জন্মই হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে সিপিএমকে হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায়
আসা আমি দেখেছি। বিশ্বাস করুন, অন্য রাজ্যেও পালাবদল দেখেছি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার দু-তিন
মাস বা চার মাসের মধ্যেই কোনো সরকার এতটা অজনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে, এটা একটা নতুন প্রবণতা।
এটা আমি আগে দেখিনি।
এর কারণ, একদিকে তারা খুবই আগ্রাসী আচরণ করছে। পুজোতে বামপন্থীদের যে বুকস্টল বসে, সেই বুকস্টল ভাঙা হয়েছে, হকার উচ্ছেদ হচ্ছে, আরও নানা কিছু ঘটছে। জনপ্রিয়তা কমছে। কিন্তু অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এটা একটা দিক মাত্র। আরেকটা দিক হলো, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের একটা বড় অংশ হিন্দুত্বের দিকে পোলারাইজড হয়ে গিয়েছে। তারা হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষ অবলম্বন করছে। কাজেই এখনই এদের পতনের শুরু, এ রকম কিছু বলার কোনো সুযোগ নেই।
এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান প্রতিরোধে করণীয় কী, বিশেষ করে বামপন্থীদের?
প্রথম কথা হলো, এটা এত সহজ নয় যে ওরা এল আর আপনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ করে দিলেন। আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসা একটা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক যুগের সূচনা। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, সামাজিক স্তরে বিভেদের যে ব্যাপক ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটা এত তাড়াতাড়ি কেটে যাবে, এ রকমটা আমার মনে হয় না। এটা লং লং ওয়ে টু গো, অনেক দীর্ঘ পথ বাকি।
বামপন্থীরা যেটা করতে পারেন, তা হলো, আমাদের বাংলায়, আমাদের সমাজের ভেতরে, একটা অদ্ভুত সমন্বয়ী রাজনীতি রয়েছে। ও-বাংলা, এ-বাংলা দুই বাংলাতেই সেই অদ্ভুত সমন্বয়ী রাজনীতি আছে। এটা তো লালনের বাংলা, তাই না? এই বাংলাতেও আলট্রা রাইটকে আটকাতে, ইসলামিস্টদের আটকাতে আমার মনে হয় এই সমন্বয়ী রাজনীতির চর্চা করা খুব জরুরি। আর জরুরি সামাজিক স্তরে একটা বৃহত্তর কোয়ালিশন গড়ে তোলা, ভোটের অঙ্ক কষে নয়। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা যদি এ রকম কিছু করেন, সেই চেষ্টা তাঁরা শুরু করেছেন। তাহলে আমার মনে হয় দীর্ঘ মেয়াদে সেটা ভালো হবে।
ককরোচ পার্টির দ্রুত জনপ্রিয়তা—এটা কি শুধুই প্রশ্নফাঁস বা চাকরি না পাওয়ার বিষয়, নাকি আরও কোনো বিষয় আছে?
১২ বছর ধরে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সরকার শাসনক্ষমতায় রয়েছে। এই সময়ে আমরা একটা জিনিস দেখেছি। সরকার তো তার মতো করে মোকাবিলা করবেই, কিন্তু বিরোধীরা নানা কারণে কখনোই খুব বড় সফল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। অথচ আন্দোলন গড়ে তোলার জমি প্রস্তুত ছিল। একবার এনআরসি-সিএএ-এর বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন আমরা দেখেছি। আরেকবার দেখেছি বড় কৃষক আন্দোলন। এখনো কিন্তু আন্দোলনগুলো জনগণই গড়ে তুলছে।
মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সমাজের বিরাট অংশের ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে। এই ক্ষোভকে ভাষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কিছুটা সমস্যা রয়েছে বলে আমার মনে হয়। একটা স্ফুলিঙ্গের দরকার ছিল। সেই স্ফুলিঙ্গটাই এল যখন প্রধান বিচারপতি ‘ককরোচ’ বলে কটাক্ষ করলেন এবং সেই জায়গা থেকে তরুণেরা রাস্তায় নেমে এলেন।
মানুষ মর্যাদার জন্য লড়াই করে। মর্যাদা জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি এটাকে শুধু চাকরি পাওয়া না-পাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট বা প্রশ্নফাঁসের ভিত্তিতে দেখেন, তাহলে আমার মনে হয় সেটা ঠিক হবে না। মানুষ মূলত রাস্তায় নামছে মর্যাদার জন্য, নিজের ডিগনিটির জন্য।
দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটা দেশ যেমন নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কায় প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে এড়িয়ে নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে। সম্প্রতি ভারতেও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকে এগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ফান্ডিংয়ের কথা বলে ব্যাখ্যা করছেন। আপনাদের ওখানে ককরোচদের উত্থানকেও অনেকে একই কথা বলছেন। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
প্রথম কথা হলো, একটা জিনিস পরিষ্কার করা ভালো। শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে এবং গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ভারতে কোনো গণ-অভ্যুত্থান হচ্ছে না, এটা গণ-আন্দোলন। এটা এখনো গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। আমি মনে করি যে ভবিষ্যতেও হবে না। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আমাদের বিচারব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ভোটেই পরাজিত করতে হবে। রাস্তায় মারামারি করে সরকার ফেলে দেবেন, এটা আমার ধারণা—হবে না। সেটা খুব স্বাস্থ্যকরও নয়। বামপন্থীদের অনেক সময় কিছু বিপ্লবী স্বপ্ন থাকে, বিপ্লবী প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা থাকে, আর সেগুলো আমরা অনেক সময় জনগণের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিতে চাই। ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে তার কোনো সুযোগ নেই বলেই আমার মনে হয়।
আর ‘ইউএস অর্থায়ন’ নিয়ে দুটো কথা বলার আছে। প্রথম কথা হলো, আমেরিকা কিন্তু সরকার ফেলে দেয়। আজ পর্যন্ত তারা পৃথিবীব্যাপী এক শর ওপর ক্যু করেছে। কাজেই আমেরিকা ধোয়া তুলসীপাতা, ব্যাপারটা এ রকম নয়। কিন্তু ধরুন আপনাদের যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। জিওপলিটিকসের কারণে। কিন্তু ভারতের সেই ভূমিকার কারণে আপনি কি গোটা মুক্তিযুদ্ধকে, যেটা আসলে ছিল একটা জনযুদ্ধ, একটা ভারতীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন বলবেন? এটা বলা যায় না।
বাংলাদেশের ডানপন্থীদের অনেকে বলেন মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভারতের ষড়যন্ত্র, পাকিস্তানকে দুই টুকরো করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র। কিন্তু তাঁরা যেটা বলেন না, তা হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধে, জনযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বুকের রক্তে বাংলার মাটি ভিজিয়েছে। তারা আসলে জনগণের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে।
কাজেই ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে কখনো ভারত, কখনো আমেরিকা, কখনো রাশিয়া নানা কিছু করে। কিন্তু আপনি যখন কেবল সেটাকেই বড় করে দেখেন, সেটাকেই একমাত্র গুরুত্ব দেন, তখন আসলে জনগণের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করেন। একই কথা দেশে দেশে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অবশ্যই সেখানে আমেরিকার ভূমিকা থাকতে পারে, অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ যে জনগণের আত্মত্যাগকে যেন আমরা অস্বীকার না করি।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমাগত প্রান্তিক হয়ে পড়ার পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
বামপন্থীদের জন্য এই সময়টা খুব কঠিন সময়। স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারতবর্ষে কোথাও বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত কোনো সরকার নেই। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ আগেই চলে গিয়েছিল, কেরালাতেও বাম সরকার এই মুহূর্তে ক্ষমতায় নেই। এই পরিস্থিতিতে সংসদীয় বামপন্থা ধাক্কার মধ্যে রয়েছে। আবার ঠিক উল্টো দিকে দেখবেন, গণ-আন্দোলন ও রাজপথের রাজনীতিতে বামপন্থীরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, এটা একটু কঠিন, আবার সম্ভাবনাময়ও। কারণ, ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন মতপার্থক্য রয়েছে, একে অন্যের বিরুদ্ধে তাঁদের বহু অভিযোগ রয়েছে, যার অনেকগুলোই হয়তো ন্যায্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সব বাধার দেয়াল পেরিয়ে তাঁদের এক কাতারে নিয়ে আসছে, এক জায়গায় জড়ো করছে। এটা আমার কাছে খুব সম্ভাবনাময় মনে হয়।
ইউরোপের কয়েকটা দেশে একসঙ্গে জনজীবনের সংকট নিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী?
একেকটা দেশের একেক রকম কারণ। ইউরোপ বলতে জীবনযাত্রার মানসহ যেসব ধারণা আমাদের সামনে আসত, সেই ধারণাগুলো বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে ইউরোপের জন্ম হয়েছিল, সেই লিবারেল গণতান্ত্রিক ইউরোপ ভেঙে পড়ছে, তার পা কাঁপছে। অথচ একটা নতুন ইউরোপ এখনো গড়ে উঠছে না।
কাজেই এই সময়ে ইউরোপে একদিকে সর্বত্র অতি দক্ষিণপন্থার উত্থান হচ্ছে। জার্মানিতে নিও-নাৎসি এএফডির উত্থান হচ্ছে, ইতালিতে মুসোলিনির উত্তরসূরিদের উত্থান হচ্ছে, স্পেনে ভক্সের মতো দলের উত্থান হচ্ছে, ফ্রান্সে লা পেনের উত্থান হচ্ছে। এটা যেমন একটা ছবি, তেমনি উল্টো দিকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আবাসনের ভাড়া কমার দাবিতে, শিক্ষার দাবিতে, চাকরির দাবিতে হাজার হাজার, কোথাও কোথাও লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসছে। ফ্রান্সে ঐতিহাসিক আন্দোলন আমরা দেখছি; ইতালিতে, স্পেনে, পর্তুগালে, বেলজিয়ামে দেখছি। এই আন্দোলনগুলোর কেন্দ্রে খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে বামপন্থীরা অবস্থান করছেন।
ফ্রান্সে একদিকে যেমন লা পেনের উত্থান হচ্ছে, তেমনি লা পেনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কোনো লিবারেল বা এই ধরনের কেউ নন, উঠে আসছেন মিডিয়াতে যিনি অতি বামপন্থী নামে পরিচিত, সেই জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁ। ৭৪ বছর বয়সের একজন নেতা। আবার বেলজিয়ামে সেখানকার ওয়ার্কার্স পার্টি, পিটিবি-এর ব্যাপক উত্থান হচ্ছে। কাজেই ইউরোপে আসলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটা নতুন ধরনের বামপন্থারও উত্থান হচ্ছে।
পৃথিবীব্যাপী উগ্র ডানপন্থার উত্থানের কারণ কী?
ইউরোপের কথা বলতে পারি। ইউরোপের ব্যাপারটা আপনাদের এখানকার বা ভারতের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। ইউরোপে বলা হচ্ছে, তাদের যাবতীয় সংকটের মূলে অভিবাসীরা। আমাদের মতো কালো বা বাদামি চামড়ার মানুষ দলে দলে ইউরোপে ঢুকে পড়ে ইউরোপের সর্বনাশ করে দিচ্ছি, সব চাকরি-বাকরি কেড়ে নিচ্ছি, ইউরোপের সুন্দর, গণতান্ত্রিক, সুশীল, সংস্কৃতিবান পরিবেশ নষ্ট করছি—এ রকম কথা বলা হচ্ছে। ভারতেও একই জিনিস বলা হয় যে সব রোহিঙ্গা মুসলমান ঢুকে পড়ে আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও আমরা কার্যত একই কথা শুনতে পাই।
এই যে অপরকে চিহ্নিত করা, অন্য বা ‘আদার’কে চিহ্নিত করা, এই আদার ইউরোপের ক্ষেত্রে অভিবাসী ও মুসলমান, ভারতের ক্ষেত্রে মুসলমান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শাহবাগী, মাজারপন্থী ইত্যাদি; তাকেই যাবতীয় সংকটের মূল বলে চিহ্নিত করে ঘৃণা উৎপাদন করা। আমার মনে হয় এটা সব জায়গারই প্রবণতা। ইউরোপও তার ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
বাংলাদেশে একটা অতি দক্ষিণপন্থা রাজনীতির উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। আমি শুধু জামায়াতে ইসলামীর কথা বলছি না, জামায়াত অতি দক্ষিণপন্থী তো বটেই। তার থেকেও ডানপন্থী শক্তিরা শক্তিশালী অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। এই অতি দক্ষিণপন্থার উত্থানের আশঙ্কা বাংলাদেশে অবশ্যই রয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে আমি এটাও বলি, প্রো-লিবারেশন ফোর্স বাংলাদেশে বিশাল। বাংলাদেশকে আমার সামান্য চেনার ভিত্তিতে আমি যেটুকু বুঝি, সেখান থেকে এটা বলছি। অভ্যুত্থানের পরে অভ্যুত্থানের নেতারা যদি এই কাজগুলো না করতেন, যদি মুক্তিযুদ্ধকে ওউন করতেন, তাহলে এই বিরাট অংশকে তাঁরা নিজেদের সঙ্গে পেতেন। আর বিএনপিও, যাঁরা এখন সরকারে আছেন, তাঁরাও যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি কোনো শিথিলতা না দেখান, তাহলে আওয়ামী লীগের ফেরার জায়গা কমে আসে। গোটা সংসদে কার্যত এখন একজনই বিরোধী নেত্রী, আমি তাঁকে দেখি, রুমিন ফারহানা, যিনি স্বতন্ত্র হিসেবে জিতেছেন।
কাজেই দুটো সম্ভাবনাই আছে। একদিকে অতি দক্ষিণপন্থা শক্তির উত্থানের আশঙ্কা আছে, আরেক দিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে একটা নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমি সংকীর্ণ অর্থে আওয়ামী চেতনা বলছি না, আমি বলছি এই দেশের যে ভিত্তি, সেটাকে। পুরোনো মুক্তিযুদ্ধ-চেতনার যে ব্র্যান্ডিং আমরা দেখেছি, মানুষ যেটা নিয়ে বিরক্ত, সেটা নয়। সেই ভিত্তিকে ধারণ করে যদি নতুন একটা শক্তির উত্থান ঘটে, তাহলে ডেফিনেটলি বাংলাদেশ একটা সুন্দর আগামী দিনের দিকে যাবে। আর তা না হলে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থানের আশঙ্কা থাকবেই।









