
[এই লেখার প্রস্তাবগুলো একটি সংস্কার-কাঠামো; এগুলোকে বিদ্যমান সরকারি বিধান বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন হবে না। দেশজুড়ে নষ্ট, মেরামতে থাকা ও নিষ্পত্তিকৃত যন্ত্রের যাচাইকৃত সমন্বিত হিসাব ছাড়া অনিয়মের ব্যাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তও দেওয়া সম্ভব নয়।]
সরকারি হাসপাতালে একটি চিকিৎসা যন্ত্র নষ্ট হলে প্রথম প্রশ্নটি করেন রোগী—আবার কবে সেবা পাওয়া যাবে? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলেই সামনে আসে আরও কিছু জরুরি প্রশ্ন। যন্ত্রটি এখন কোথায়? কার দায়িত্বে রয়েছে? মেরামতের আবেদন কবে করা হয়েছে? সিদ্ধান্ত আটকে আছে কোন দপ্তরে? মেরামতের জন্য কত টাকা ব্যয় হয়েছে? সেই ব্যয়ের পর রোগী সেবা পেয়েছেন কত দিন?
নগণের অর্থে কেনা প্রতিটি চিকিৎসা যন্ত্রের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর থাকা প্রয়োজন। যন্ত্র কেনার হিসাব থাকলেই সম্পদের জবাবদিহি সম্পূর্ণ হয় না। কোথায় স্থাপন হলো, কত দিন ব্যবহার হলো, কেন বন্ধ হলো, কোথায় মেরামতে গেল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিষ্পত্তি হলো—পুরো ইতিহাস সংরক্ষণ ও যাচাই করতে হবে।
একটি অচল যন্ত্রের ক্ষতি শুধু তার ক্রয়মূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার অপেক্ষা, অন্য হাসপাতালে যাতায়াত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ব্যয় এবং পরিবারের কর্মঘণ্টা হারানো। তাই চিকিৎসা যন্ত্র ব্যবস্থাপনার সাফল্য বিচার করতে হবে রোগীর প্রয়োজনের সময় নিরাপদ ও কার্যকর সেবা পাওয়ার ভিত্তিতে।
চিকিৎসা যন্ত্রের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘কম্পিউটারাইজড মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নির্দেশিকায় যন্ত্রের তালিকা, সেবাদানের ইতিহাস, প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মক্ষমতার সূচক ও ব্যয়ের তথ্যকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এই নীতির ব্যবহারিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত, প্রতিটি যন্ত্রের পরিচয় নিশ্চিত করা। শুধু ‘একটি সিটি স্ক্যান’ বা ‘পাঁচটি মনিটর’ লিখে সরকারি সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা যায় না। প্রতিটি যন্ত্রের জন্য স্বতন্ত্র সম্পদ নম্বর থাকতে হবে। তার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে প্রস্তুতকারক, মডেল, সিরিয়াল নম্বর, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, সরবরাহকারী, গ্রহণ ও স্থাপনের তারিখ, ওয়ারেন্টির মেয়াদ এবং বর্তমান অবস্থান।
দামি ও গুরুত্বপূর্ণ আনুষঙ্গিক অংশের হিসাবও প্রয়োজন। আলট্রাসনোগ্রামের প্রোব, মনিটরের মডিউল কিংবা যন্ত্রের সঙ্গে সরবরাহ করা বিশেষ কম্পিউটার—এসব মূল যন্ত্রের রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। কোনো অংশ বদলানো, অন্য যন্ত্রে ব্যবহার করা বা সরবরাহকারীর কাছে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদনসহ সংরক্ষণ করতে হবে।
এই তথ্য নিয়ে প্রতিটি যন্ত্রের একটি ‘ডিজিটাল জীবনবৃত্তান্ত’ তৈরি করা যেতে পারে। যন্ত্রের গায়ে লাগানো কিউআর কোড স্ক্যান করলে অনুমোদিত কর্মকর্তা যন্ত্রের পরিচয়, অবস্থান, মেরামতের ইতিহাস ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের তারিখ দেখতে পারবেন। তবে কিউআর কোড নিজে যন্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করে না; প্রতিটি স্থানান্তরের সময় তথ্য হালনাগাদ এবং সরেজমিন যাচাই অপরিহার্য।
ডিজিটালকরণের শুরুতে একটি বাস্তবভিত্তিক সম্পদ গণনা প্রয়োজন। হাসপাতালের রেজিস্টারের সঙ্গে সরেজমিনে পাওয়া যন্ত্রের মিল থাকতে হবে। তালিকায় আছে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন যন্ত্র এবং বাস্তবে আছে কিন্তু তালিকায় নেই—এমন যন্ত্র পৃথকভাবে শনাক্ত করতে হবে। প্রতিটি অমিলের ব্যাখ্যা ও সংশোধনের দায়িত্ব নির্ধারিত থাকবে।
যন্ত্রের অবস্থা নথিভুক্ত করার ভাষাও এক হতে হবে। ‘নষ্ট’ শব্দের আড়ালে বহু ভিন্ন সমস্যা ঢাকা পড়ে যায়। একটি যন্ত্র কারিগরিভাবে সচল হলেও জনবলের অভাবে বন্ধ থাকতে পারে। আরেকটি যন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, পানি বা ব্যবহার্য সামগ্রী নাও থাকতে পারে। কোথাও স্থাপনই হয়নি; কোথাও যন্ত্রাংশের অপেক্ষা; কোথাও মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়নি।
এসব অবস্থাকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কারণ, জনবল সংকটের সমাধান মেরামতের বিল দিয়ে হয় না; আবার কারিগরি ত্রুটির সমাধান শুধু নতুন অপারেটর নিয়োগ করেও হয় না। সঠিক সমস্যার জন্য সঠিক বরাদ্দ ও দায়িত্ব নির্ধারণের পূর্বশর্ত হলো সঠিক তথ্য।
ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর একটি ডিজিটাল অভিযোগ বা কাজের নম্বর চালু করা উচিত। অভিযোগে থাকবে ত্রুটি শনাক্তের সময়, যন্ত্রের পরিচয়, সমস্যার বিবরণ, প্রয়োজন হলে ছবি বা ত্রুটি সংকেত এবং রোগীর সেবায় তার প্রভাব। এরপর প্রতিটি ধাপ একই রেকর্ডে যুক্ত হবে—কে অভিযোগ গ্রহণ করলেন, কখন মূল্যায়ন হলো, কী সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো, কার অনুমোদন প্রয়োজন এবং পরবর্তী কাজের সময়সীমা কত।
এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে চিঠি পাঠানোকে কাজ সম্পন্ন হিসেবে দেখানো যাবে না। একটি আবেদন সমাপ্ত হবে যন্ত্র নিরাপদভাবে সেবায় ফেরার পর, অথবা যথাযথ অনুমোদনে তার বিকল্প ব্যবস্থা বা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে। সিদ্ধান্ত ও তার কারণ রেকর্ডে স্পষ্ট থাকতে হবে।
দায়িত্ব নির্ধারণেও পৃথক ভূমিকা দরকার। ব্যবহারকারী বিভাগ ত্রুটি জানাবে এবং রোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেবে। হাসপাতাল প্রশাসন সম্পদের হেফাজত, যোগাযোগ ও বিকল্প সেবার সমন্বয় করবে। সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন ও মেরামতের বিষয়ে মতামত দেবে। ক্রয়কারী সংস্থা ও চুক্তি ব্যবস্থাপক সরবরাহকারীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন যাচাই করবেন। অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেবেন।
নিমিউ অ্যান্ড টিসিকে (ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার, সংক্ষেপে নিমিউ অ্যান্ড টিসি হলো স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান) এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি কার্যাবলির তালিকায় চিকিৎসা যন্ত্রের গুণগতমান নিশ্চিতকরণসংক্রান্ত কাজ এবং প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মেরামতবিষয়ক প্রশিক্ষণের উল্লেখ রয়েছে। এই সক্ষমতাকে হাসপাতাল পর্যায়ের কারিগরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ আছে।
তবে নিমিউ, হাসপাতাল বা সরবরাহকারী—কাউকেই তথ্য ছাড়া এককভাবে দায়ী করা যথাযথ নয়। বিলম্বের প্রতিটি পর্যায় আলাদা করে দেখতে হবে। আবেদন পাঠাতে দেরি হয়েছে, মূল্যায়নে দেরি হয়েছে, অর্থছাড় হয়নি, নাকি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ করেনি—ডিজিটাল রেকর্ডে তা দৃশ্যমান হতে হবে। প্রতিটি কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ এবং অনিষ্পন্ন থাকলে বিষয়টি কোন ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যাবে, সেটিও নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন।
জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে রোগীর ঝুঁকি ও বিকল্প সেবার প্রাপ্যতাকে। একই ধরনের দুটি যন্ত্রের মধ্যে একটি হাসপাতালে বিকল্প থাকলেও অন্য হাসপাতালে সেটিই একমাত্র ভরসা হতে পারে। তাই শুধু আবেদন জমার ক্রম ধরে মেরামতের তালিকা করলে রোগীর প্রয়োজন যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে জরুরি যন্ত্রের ত্রুটি তাৎক্ষণিকভাবে নথিভুক্ত করা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের প্রাথমিক সাড়া এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মূল্যায়ন বা মূল্যায়নের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এগুলো সব যন্ত্র ৭২ ঘণ্টায় মেরামত শেষ করার প্রতিশ্রুতি নয়। যন্ত্রাংশ আমদানি বা প্রস্তুতকারকের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হলে বাস্তবসম্মত সময় জানাতে হবে এবং রোগীর বিকল্প সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
যন্ত্র হাসপাতালের বাইরে পাঠানো হলে ডিজিটাল হস্তান্তর ও গ্রহণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যন্ত্রের সিরিয়াল নম্বর, ছবি, সঙ্গে পাঠানো অংশের তালিকা, প্রেরণের অনুমোদন, গ্রহণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং প্রত্যাশিত ফেরতের তারিখ একই রেকর্ডে যুক্ত থাকবে। হেফাজত পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপে উভয় পক্ষের স্বীকৃতি থাকতে হবে।
এতে ‘মেরামতে পাঠানো হয়েছে’ কথাটির বাইরে বাস্তব উত্তর পাওয়া যাবে—কোথায় পাঠানো হয়েছে, কত দিন ধরে আছে এবং এখন কার কাছে কাজটি অপেক্ষমাণ। নির্ধারিত সময় পার হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁর তদারককারীকে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা দেওয়া যেতে পারে।
মেরামতের অর্থব্যয়ের আগে ওয়ারেন্টি ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি যাচাই জরুরি। ত্রুটিটি চুক্তির আওতায় পড়ে কি না, কোন যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত, সাড়া দেওয়ার সময়সীমা কত এবং শ্রম বা পরিবহনের ব্যয় কার—এসব স্পষ্ট থাকতে হবে। একই সেবার জন্য যেন দুইবার অর্থ পরিশোধ না হয়, তা পরীক্ষা করতে হবে।
মেরামতের প্রাক্কলনেও শুধু মোট টাকার অঙ্ক যথেষ্ট নয়। যন্ত্রাংশ, শ্রম, পরিবহন, পরীক্ষা ও প্রযোজ্য অন্যান্য ব্যয় আলাদা করে দেখাতে হবে। উচ্চমূল্যের বা বারবার প্রয়োজন হওয়া মেরামতে স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কোনো ত্রুটি পুনরাবৃত্ত হলে শুধু নতুন বিল অনুমোদন না করে আগের মেরামতের মান, পরিবেশগত সমস্যা ও ব্যবহারের পদ্ধতি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
যন্ত্র মেরামত শেষে চালু হলেই তাকে রোগীর ব্যবহারের উপযোগী ঘোষণা করা ঠিক হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্মক্ষমতা পরীক্ষা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণকে পৃথক ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করেছে। সে অনুযায়ী যন্ত্রের ধরন ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং যেখানে প্রযোজ্য ক্যালিব্রেশন সম্পন্ন করে সেবায় ফেরাতে হবে।
আমার প্রস্তাব হলো, মেরামত সম্পন্ন হওয়ার কারিগরি সনদ এবং ব্যবহারকারী বিভাগের গ্রহণ—দুটি নথিই সংরক্ষণ করা। বিল নিষ্পত্তির সঙ্গে যাচাইকৃত কাজের সম্পর্ক থাকতে হবে। মেরামতের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একই ত্রুটি ফিরে এলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যালোচনায় আসবে।
নষ্ট যন্ত্রের সংরক্ষণও দায়িত্বের অংশ। মেরামতযোগ্য যন্ত্র এমন পরিবেশে ফেলে রাখা যাবে না, যাতে আর্দ্রতা, ধুলা, পানি বা অননুমোদিত খোলাখুলিতে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপদ সংরক্ষণস্থান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত বিরতিতে অবস্থার পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যবহার-অনুপযোগী যন্ত্রে স্পষ্ট চিহ্ন থাকতে হবে, যাতে ভুল করে তা রোগীর সেবায় ব্যবহার না হয়।
কোনো যন্ত্র মেরামত করা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত কি না, সেই সিদ্ধান্তও স্বচ্ছ হতে হবে। শুধু বয়স বা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি অঙ্ক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিবেচনায় আসবে নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা, প্রস্তুতকারকের সহায়তা, মেরামতের পর সম্ভাব্য ব্যবহারকাল এবং বিকল্প যন্ত্র চালু করতে প্রয়োজনীয় সময় ও ব্যয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ডিকমিশনিং মেডিকেল ডিভাইসেস’ নির্দেশিকাও কেন, কখন এবং কীভাবে যন্ত্র সেবা থেকে প্রত্যাহার করা হবে—সেই সিদ্ধান্তের কাঠামোকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধি অনুসরণ করে কারিগরি মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অনুমোদন পৃথকভাবে নথিভুক্ত করতে হবে।
নিষ্পত্তির অনুমোদনের পরও হিসাব শেষ হয় না। কোন যন্ত্র সরানো হলো, কাকে হস্তান্তর করা হলো, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কী দামে বিক্রি হলো এবং অর্থ কোথায় জমা হলো—এসব মূল সম্পদ রেকর্ডে যুক্ত থাকতে হবে। অনুমোদিত তালিকা ও বাস্তবে সরানো যন্ত্রের পরিচয় মিলিয়ে দেখতে হবে।
নিষ্পত্তির পরিকল্পনায় পরিবেশ ও তথ্য-নিরাপত্তাও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। রোগীর তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে এমন যন্ত্রের ক্ষেত্রে নিরাপদে তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সংক্রমণ-ঝুঁকিপূর্ণ অংশ, ব্যাটারি বা বিশেষ ঝুঁকিযুক্ত উপাদানের ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী করতে হবে। ‘পুরোনো যন্ত্র বিক্রি’ বলে এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
এই পুরো ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল সম্পদ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। নতুন সফটওয়্যার কেনার আগে বিদ্যমান সরকারি ব্যবস্থা কী করতে পারে, কোথায় ঘাটতি এবং কোন তথ্য ইতিমধ্যে সংরক্ষিত আছে—তা যাচাই করা উচিত। অপ্রয়োজনীয় একাধিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে একই তথ্য বারবার লিখতে বাধ্য করলে কাজের চাপ বাড়বে।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় তথ্য পরিবর্তনের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকতে হবে। কে কখন কী সংশোধন করেছেন, আগের তথ্য কী ছিল এবং সংশোধনের কারণ কী—তা পরে পরীক্ষা করা যাবে। দায়িত্বভিত্তিক প্রবেশাধিকার, নিরাপদ ব্যাকআপ, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে পরে তথ্য যুক্ত করার সুবিধা প্রয়োজন। তথ্যের মালিকানা সরকারের হাতে এবং সরবরাহকারী বদলালেও ব্যবহারযোগ্য তথ্য রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল রেকর্ড সত্যের বিকল্প নয়; সত্য যাচাইয়ের উপায়। তাই নিয়মিত সরেজমিন গণনা, নমুনাভিত্তিক স্বাধীন পরীক্ষা এবং নথির সঙ্গে যন্ত্রের বাস্তব অবস্থার মিল অপরিহার্য। একই ব্যক্তি মূল্যায়ন, অনুমোদন, কাজের গ্রহণ ও বিল যাচাইয়ের সব ধাপ নিয়ন্ত্রণ করলে জবাবদিহি দুর্বল হতে পারে; দায়িত্বের উপযুক্ত বিভাজন থাকা দরকার।
জনগণের জন্য আলাদা একটি সহজবোধ্য অনলাইন তথ্যপৃষ্ঠাও প্রয়োজন। সেখানে হাসপাতালভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ সেবার অবস্থা, যন্ত্র অচল হওয়ার তারিখ, মেরামতের অগ্রগতি, সম্ভাব্য সেবা চালুর সময় এবং বিকল্প সেবার তথ্য থাকবে। তথ্য সর্বশেষ কবে যাচাই করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য বা নিরাপত্তাসংবেদনশীল কারিগরি তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন নেই।
প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা বিচার করতে শুধু ‘কতটি মেরামত হয়েছে’ বলা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে—
– নির্ধারিত সেবা-সময়ের কত শতাংশ যন্ত্র ব্যবহারযোগ্য ছিল; ত্রুটি জানানোর পর প্রাথমিক সাড়া ও সেবায় ফেরাতে কত সময় লেগেছে;
– কতটি কাজ ৩০, ৯০ বা ১৮০ দিনের বেশি অনিষ্পন্ন;
– নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কত শতাংশ সময়মতো সম্পন্ন হয়েছে;
– মেরামতের পর একই ত্রুটি কতবার ফিরে এসেছে;
– যন্ত্র অচল থাকায় কতটি পরীক্ষা বা চিকিৎসা স্থগিত হয়েছে;
– মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিকল্প সেবায় কত ব্যয় হয়েছে।
এসব সূচকের সংজ্ঞা সারা দেশে এক হতে হবে। বড় ও জটিল যন্ত্র মেরামতের প্রতিষ্ঠানকে ছোট যন্ত্রের কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে তুলনা করাও ন্যায্য হবে না।
জবাবদিহির পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। হাসপাতালের কাজের পরিমাণ ও যন্ত্রের জটিলতা অনুযায়ী বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, প্রশিক্ষিত ব্যবহারকারী, পরীক্ষণ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ সহায়তার সঙ্গে হাসপাতাল ও আঞ্চলিক পর্যায়ের সক্ষমতা যুক্ত করা যেতে পারে। অনুমোদিত দক্ষতার সীমার মধ্যে দ্রুত ছোটখাটো সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকতে হবে।
ক্রয়ের সময়ই এই সক্ষমতার হিসাব করতে হবে। যন্ত্রের দরপত্র মূল্যের সঙ্গে স্থাপন, প্রশিক্ষণ, ব্যবহার্য সামগ্রী, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ এবং শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তির সম্ভাব্য ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভবন, বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও জনবল প্রস্তুত না থাকলে শুধু যন্ত্র সরবরাহকে প্রকল্পের সাফল্য হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
বাস্তবায়নের জন্য ধাপে ধাপে এগোনো যেতে পারে। প্রথম ৯০ দিনে নির্বাচিত হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের তালিকা যাচাই, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন কাজ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পরবর্তী ছয় মাসে ডিজিটাল অভিযোগ, হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ-সূচি ও জনসাধারণের তথ্যপৃষ্ঠার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা সম্ভব। এক বছরের মধ্যে স্বাধীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবস্থাটি পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। এগুলো প্রস্তাবিত সময়সীমা; বাস্তবায়নের আগে সম্পদ ও সক্ষমতার মূল্যায়ন প্রয়োজন।
অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। তবে বৈধ কারিগরি জটিলতা, সক্ষমতার ঘাটতি, অবহেলা এবং ইচ্ছাকৃত অনিয়মকে আলাদা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, নথি ও প্রকৃত ক্ষতি যাচাই করে প্রযোজ্য প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং সম্পদের সদ্ব্যবহারের প্রণোদনাও থাকা উচিত।
সরকারি হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্র কোথায় যায়—এই প্রশ্নের উত্তর আর অস্পষ্ট চিঠিপত্র বা মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রতিটি যন্ত্রের পরিচয় থাকবে, প্রতিটি স্থানান্তরের প্রমাণ থাকবে, প্রতিটি ব্যয়ের ভিত্তি থাকবে এবং প্রতিটি বিলম্বের ব্যাখ্যা থাকবে।
জনগণ শুধু জানতে চান না কত টাকায় যন্ত্র কেনা হয়েছে। তাঁরা জানতে চান, সেই যন্ত্র তাঁদের প্রয়োজনে কাজ করবে কি না। চিকিৎসা যন্ত্রের জবাবদিহির শেষ মাপকাঠি হলো—রোগী প্রয়োজনের সময় নিরাপদ সেবা পেলেন কি না।
লেখক: এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ঢাকা

আমাদের জাতীয় জীবনে বিচিত্র সব রোগের প্রকোপ দেখা যায়। তার মধ্যে একটি রোগ নানা সময়ে মাথা চাড়া দেয় এবং সেটা ফিরে ফিরে আসে। রোগটির নাম ‘রবীন্দ্র-চুলকানি’। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর স্বীকৃতি এখনো না মিললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর মহামারি রূপ দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত নড়েচড়ে বসতে পারে।
১২ ঘণ্টা আগে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল অনেকগুলো। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজসহ হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। রাশিয়ার এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিতে বাকি রেখেছে। রাশিয়াকে চরম শিক্ষা দিতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার মানুষ যেন
১২ ঘণ্টা আগে
চারদিকে মিথ্যাচার ও প্রতিশোধস্পৃহার যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেউ কেউ ধর্মীয় হানাহানি উসকে দিচ্ছে, কেউ কেউ ইতিহাস বিকৃত করে দেশের তরুণদের বিভ্রান্ত করছে, কেউ কেউ মবতন্ত্রকে ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। এই সমস্ত নেতিবাচক ঘটনার জন্মদাতা বি
১২ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকী ঘিরে কর্মসূচি; ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে মব সৃষ্টি করে রিকশাচালক, হকার, নারী, সাংবাদিকসহ নানাজনকে হেনস্তা-মারধর; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়ার দাবি তুলে প্রতিপক্ষকে...
২ দিন আগে