Ajker Patrika

বিচার বিভাগে ‘এআই’ ব্যবহার নীতিমালা জরুরি

রাইসুল সৌরভ
বিচার বিভাগে ‘এআই’ ব্যবহার নীতিমালা জরুরি

স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রকৌশল, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, সামরিক-বেসামরিক খাত, এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যক্রমেও দেদার বিশ্বজুড়ে এখন এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। বিচার বিভাগও এ ক্ষেত্রে এখন আর পিছিয়ে নেই। আদালতে বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীরাও বিভিন্ন প্রয়োজনে এআইয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং আইনি কার্যক্রমে তা ব্যবহার করছেন। কিন্তু বিচারব্যবস্থায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের বিচারিক কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা আদৌ উচিত কি না বা করলে কখন, কীভাবে, কতটুকু ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে এবং তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্নও উঠেছে।

কিছু দেশে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চ্যাটজিপিটির মতো টুলের সাহায্যে কতিপয় বিচারক মামলা নিষ্পত্তি ও রায় দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া আইনজীবীরা প্রায়ই আদালতে এআইয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত এমন সব বক্তব্য, উদ্ধৃতি, যুক্তি বা নজির তুলে ধরছেন, যার আসলে বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।

আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে এআইয়ের অযাচিত ও অনৈতিক ব্যবহার রোধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বপ্রতিনিধিত্বকারী বিচারপ্রার্থীরা, বিচারক এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কীভাবে এআইয়ের সাহায্য নিয়ে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন বা বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন, সে বিষয়ে সীমারেখা টেনে দিয়েছে। কারণ, আদালতে মামলার আরজিপত্র, সওয়াল-জবাব, সাক্ষ্য বিশ্লেষণ অথবা রায় তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপরিকল্পিত, অপেশাদার ও অবাধ ব্যবহার অবিচার, অযাচিত বিড়ম্বনা ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা বয়ে আনতে পারে। ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি নাগরিকদের আস্থার সংকট তৈরির পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা, জবাবদিহি, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রভৃতি প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বর্তমান এআইয়ের ব্যাপক উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভবত আইন পেশায় ও আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। বরং এর সুনির্দিষ্ট, পরিকল্পিত, নৈতিক, পেশাদার এবং পরিমিত ব্যবহার কিছু ক্ষেত্রে পরিশ্রম, সময় ও ব্যয় কমিয়ে আইনজীবী এবং বিচারপ্রার্থী উভয়ের জন্যই সহায়ক হতে পারে।

তবে বিচারক বা আইনজীবী বিচারিক বিষয়ে এআই বিশেষত চ্যাটজিপিটির মতো আধুনিক চ্যাটবটের সীমাবদ্ধতা না জেনে বা প্রশিক্ষণ ছাড়া এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তার পরিণতি প্রকট হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলায় ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের অধস্তন আদালতের একটি রায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করা হলে তা কোর্টের নজরে আসে। ওই মামলায় অন্ধ্র প্রদেশের বিজয়ওয়াড়া শহরের একজন কনিষ্ঠ সিভিল জজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রাপ্ত অস্তিত্বহীন এবং কাল্পনিক নজির তাঁর রায়ে উল্লেখ করে মোকদ্দমাটি নিষ্পত্তি করেছেন। ফলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের এ রকম অনভিপ্রেত ব্যবহারের আইনি পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। মামলার গুণাগুণের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের কারণে নয়; বরং বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় অনৈতিকভাবে এআই ব্যবহার করার কারণে সুপ্রিম কোর্টের মতে রায়টি এখন ভারতে যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে এই আপিল দায়েরের আগে অন্ধ্র প্রদেশ হাইকোর্ট ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। হাইকোর্ট বলেছিলেন, বিচারিক আদালতের রায়ের উদ্ধৃতিগুলো সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু বিচারক যদি আইনের সঠিক নীতিসমূহ লিপিবদ্ধ করে বিচারকার্য যথাযথভাবে সমাধান করেন, তাহলে কেবল আদেশে ভুল বা অস্তিত্বহীন রায়/উদ্ধৃতির উল্লেখ করার কারণে আদেশটি বাতিল হতে পারে না।

তবে সুপ্রিম কোর্ট বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করে বলেছেন, এ রকম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে বিচারে ভালো ফলাফল বয়ে নাও আনতে পারে। এভাবে বিচারপ্রক্রিয়ার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। আদালত আরও মত দেন যে কাল্পনিক রায়ের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া রায়ের আদেশ কেবল বিচার বিভাগীয় ভুল হিসেবে দেখলে হবে না বরং এটি বিচার বিভাগীয় অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের অযাচিত ব্যবহার ঠেকাতে ইতিমধ্যে ভারতের কেরালা হাইকোর্ট বিচারকদের এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করেছেন। বিচারব্যবস্থায় এআই কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কমিটিও আছে।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মামলার তালিকা তৈরি, শুনানির ক্রম নির্ধারণ এবং বিভিন্ন বিচারপতির বেঞ্চে মামলার বিন্যাসে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশেও মামলা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং কোথাও কোথাও অনিয়মও হতে দেখা যায়। এমনকি মামলার তালিকা তৈরির সময়ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে।

শুধু বিচারক নন, বিভিন্ন দেশের আদালতে আইনজীবীদের একাংশের নির্বিচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই না করে সরাসরি মামলার নথি বা আদালতের কাজে ব্যবহার করার ফলে বাতিল আইন বা রায়, কাল্পনিক তথ্য, যুক্তি ও নজির ঢুকে পড়ছে সেসব নথিতে।

এ-সংক্রান্ত বৈশ্বিক একটি ডেটাবেইসের হিসাব মতে, এ বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত দুনিয়াজুড়ে ১,২১৯টি মামলা শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে জেনারেটিভ এআই দিয়ে বিভ্রান্তমূলক তথ্য দিয়ে এবং নানা ধরনের কাল্পনিক যুক্তি দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমে উপস্থাপন করেছে। চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবটের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো কাল্পনিক তথ্য বা উদ্ধৃতি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবহারকারীর কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

তাই আদালতের কাজে এআই কখন, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যবহারকারীদের এর কার্যপদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা জানা থাকা দরকার। নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে এআই হয়তো মানুষের পরিশ্রম, খরচ ও সময় কমাতে পারে, কিন্তু আইনজীবী বা বিচারকদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা এআইনির্ভর হয়ে গেলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং এর মূল্য শুধু বিচারপ্রার্থীদের নয়, বরং দিতে হবে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে। কৌঁসুলি বা বিচারকের কাছে বুদ্ধিমত্তার বিকল্প এআই কখনোই হতে পারে না।

আইন পেশায় বিশেষত আইনজীবী ও বিচারকেরা বিচারিক কাজে কীভাবে এআই ব্যবহার করতে পারবেন, সে সংক্রান্ত গাইডলাইন, বিধি বা নির্দেশনা বিভিন্ন দেশ ন্যায়বিচার অক্ষুণ্ন রাখতে ইতিমধ্যে তৈরি করে প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছে। যদিও সেসব গাইডলাইন বা নির্দেশনা কতটুকু বাস্তবসম্মত তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেসব বিতর্কসংক্রান্ত গবেষণাও চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বার কাউন্সিল এবং বিচারকদের জন্য সুপ্রিম কোর্ট থেকে এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কেউ আদালতে এআইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত কাল্পনিক উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের দেশে আদালতের কার্যক্রমে আইনজীবী ও বিচারকেরা এআই টুলস ব্যবহার করছেন না।

যদিও বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে একটি এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। তবে বিচার বিভাগ ও আদালতের জন্য বিশেষত আইনজীবী, বিচারক, আদালতের কর্মকর্তা ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য আলাদা করে সুনির্দিষ্টভাবে এআই ব্যবহারসংক্রান্ত পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একই সঙ্গে আদালতের কাজে ন্যায়বিচারের নীতি অক্ষুণ্ন রেখে দুর্নীতি রোধে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে, মামলার খরচ, জট ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে, আইন ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সহজে জানাতে, সেবার মান বৃদ্ধিতে, বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি লাঘবে, মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া সহজীকরণে প্রভৃতি বিষয়ে এআইয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, আলোচনা, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময়।

লেখক: ডক্টরাল গবেষক, গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বোমা তৈরির পিডিএফ ফাইল ছড়ানো ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার

ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক ক্রু জীবিত উদ্ধার

দলীয় পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

নিখোঁজ পাইলটদের খুঁজতে গিয়ে ভূপাতিত মার্কিন হেলিকপ্টার: মেহের নিউজ

হরমুজ খুলতে জাতিসংঘে ইরানকে চাপ প্রয়োগের প্রস্তাব রুখে দিল তিন দেশ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত