Ajker Patrika

ইতিহাস ও বাংলাদেশ

জাহীদ রেজা নূর
ইতিহাস ও বাংলাদেশ
নির্বাচন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে কার কী অবদান ছিল, সে প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। ছবি: মঞ্জুর আলম বেগ

নির্বাচনের পর দেশ এখন গণতান্ত্রিক পথ ধরে চলার চেষ্টা করছে। সংসদ বসেছে, তাতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টালবাহানার আপাত অবসান হয়েছে, সংবিধান-বিষয়ক বিতর্ক চলমান—এ ধরনের কিছু ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে মবতন্ত্রের যে অবিশ্বাস্য ‘সাফল্য’ এসেছিল, তা থেকে দেশ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অধ্যাপক ইউনূস তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মববাজিকে এমন এক স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে সেখান থেকে কত দ্রুত সরে আসা যাবে, তা নিয়ে শঙ্কিত ছিল দেশের মানুষ। মববাজির চূড়ান্ত অবসান হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না। সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও তৌহিদি জনতার নাম করে সুযোগ পেলেই একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ তাদের ‘খেলা’ দেখানোর চেষ্টা করছে, করে যাবে। এদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে না পারলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে।

সৌভাগ্যের বিষয়, জামায়াত ও এনসিপির রথে চড়ে বসেনি বিএনপি। একাত্তরকে খারিজ করে দেওয়ার যে দম্ভ প্রকাশিত হচ্ছিল ইউনূস আমলে, তা থেকে কিছুটা হলেও পরিস্থিতি পাল্টেছে। কীভাবে তা পাল্টাল? এটা কি শুধুই রাজনৈতিক প্রশ্ন, নাকি এই প্রশ্নের সঙ্গে গোটা জাতির বিভিন্ন পর্যায়ের, বিভিন্ন স্তরের জীবনযাপনও যুক্ত? আজ সেই আঙ্গিক থেকেই বিষয়টি দেখার চেষ্টা করব।

২. পেছন ফিরে তাকাই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিকে নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করছিল সে সময়কার সরকার এবং তাদের অনুসারীরা। বিএনপি তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়নি। মুক্তিযুদ্ধকে জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন, এ কথা তারা এই সময়টায় বলার চেষ্টা করেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক স্থাপত্যগুলো ভাঙা শুরু হয়েছিল, তাতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, ৮ আগস্ট সরকার গঠনের আগে ও পরে স্বাধীনতাবিরোধীরা এই সময়টিকে তাদের বিজয় হিসেবেই উদ্‌যাপন করেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন করেছিল দেশের আপামর জনগণ। ছাত্র-জনতার এ রকম অভূতপূর্ব জাগরণ এই আন্দোলনকে সফল করে তোলার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এত ব্যাপক হারে এর আগে আর কখনো আন্দোলনে যোগ দেয়নি। কী ছিল এই সাধারণ ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা? আন্দোলন কি তখন কেবল বৈষম্যবিরোধী বা কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি তা সরকার পতনের আন্দোলনে পরিবর্তিত হচ্ছিল? কবে থেকে সে পরিবর্তন আসছিল? কারা একটি ডিপ স্টেটের মতো গোপন অভিসারে গা ভাসিয়েছিল? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ২৯ মিলিয়ন ডলারের প্রসঙ্গটি এনেছেন, সেই অর্থ কোথায় কারা খরচ করছিল, সেটাও তো খতিয়ে দেখতে হবে। কারা কারা জানত, এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি যারা, তাদের রয়েছে ভিন্ন মতলব?

আওয়ামী লীগ সরকারের ভালোমন্দ নিয়ে এই আলোচনা নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যারা ক্ষমতায় এল, কথাবার্তায় তো তারা ফ্যাসিস্ট-বিরোধিতার প্রবল কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাস্তবে? যে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করেছিল তারা, সেই ফ্যাসিবাদ থেকে কতটা দূরে ছিল তাদের অবস্থান? ওই যে সাধারণ ছাত্র-জনতার কথা বলা হলো, কত দিনের মাথায় তাদের মোহ ভঙ্গ হয়েছিল, সে কথা কি কেউ বলতে পারবে? বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর রোডের বাইরে লুঙ্গি ড্যান্স, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শোক জানাতে যাওয়া মানুষকে হেনস্তা করার মাধ্যমে কি প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল, নাকি তারও আগে যখন মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যগুলো ভাঙা হচ্ছিল, তখনই সন্দেহ আর সংশয় জেগে উঠেছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ ছাত্র-জনতার মনে? সাধারণ জনগণ কি তখনই বুঝে গেছে যে, মেটিকুলাস ডিজাইনারদের কাছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের চেয়েও বড় ছিল মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা করা?

৩. কবে থেকে ছাত্র-জনতা বুঝতে শুরু করেছিল, ক্ষমতায় এসেছে যারা, তাদের লুকিয়ে রাখা লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে সমূলে উৎখাত করার ভাবনা? এই প্রশ্নের উত্তর জানা এ কারণেই জরুরি যে পরবর্তীকালে ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ গড়ে উঠল কী করে, তা বোঝা দরকার। সেই যে শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তারা কোথায় গেল কিছুদিন পর? এটা কি মুক্তিযুদ্ধের পর সেই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই কোনো কিছুর লোভ না করে আবার জনারণ্যে মিশে যাওয়ার মতো ঘটনা? হালুয়া-রুটির ভাগ এই ছাত্র-জনতাও তো তখন চায়নি। খুব দ্রুত যে এই আন্দোলনকারী নবীনেরা এবং জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ ক্ষমতায় যাওয়া মেটিকুলাস ডিজাইনের অধিকারীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠল, তারও সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করা খুবই দরকার। এ কথাও বলা দরকার, ‘রাজুতে আয়’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই যখন সমর্থনের বন্যায় ভেসে যেত একদল তরুণ, কিছুদিন পরই ‘রাজুতে আয়’ মন্ত্র আর কোনো কাজ করল না। কেন করল না? এই ‘কেন’র উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক প্রশ্নের উত্তর।

৪. যে ছাত্রদের বলা হলো অধ্যাপক ইউনূসের নিয়োগকর্তা, তাদের আচরণে এমন অনেক কিছুই প্রকাশ পেল, যা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার কাছে ছিল বিস্ময়কর ঘটনা। ছাত্রদের একটি অংশ মিশে গেল ক্ষমতার সঙ্গে। তাদের চেহারায় জেল্লা দেখা দিল। চেহারায়, পোশাকে, অর্থে-বিত্তে তাদের অনেককেই আর চেনার উপায় রইল না। ক্ষমতাবান হওয়ার অর্থ যখন তারা অনুধাবন করতে শুরু করল, তখনকার ঘটনাগুলোর কথা কি মনে পড়ে? বন্যার ত্রাণের টাকা নিয়ে কত গল্প বাতাসে ভেসে বেড়াল! দামি হোটেলের হাঁসের মাংস কিংবা হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ বিতরণের নেশা নিয়ে কত গল্প তৈরি হলো! জনগণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, মুক্তিযোদ্ধার গলায় যখন জুতার মালা পরানো হচ্ছে, তখন এই ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দেওয়া ছাত্ররা একেবারে নীরব থাকল। জাতীয় সংগীত নিয়ে যখন তুমুল বিতণ্ডা তৈরি করল একদল সাম্প্রদায়িক লোক, তখনো তাদের নীরবতা ভাঙল না। তারা দিল কুম্ভকর্ণ ঘুম! ছাত্র-জনতা কি তখনো এদের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম ভাবত? ইতিহাস এই প্রশ্নের উত্তর চাইবে।

শিক্ষার্থীদের কারও কারও সঙ্গে কথা হয়েছে পরে। সেই শিক্ষার্থীরা বাবা-মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। বাবা-মাকে ‘ভীরু, কাপুরুষ’ বলে ভর্ৎসনা করেছিল। গুলি যখন চলছে, তখন তারা বুক পেতে দিয়েছে গুলির সামনে। এখন প্রশ্ন উঠছে সেই গুলির কি কোনো একক মালিকানা ছিল, নাকি গুলির মালিকানা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কোন পথে গুলি আসছিল, তা নিয়েও সংশয় জাগছে মানুষের মনে।

সেই শিক্ষার্থীদের মুখ এখন ম্লান। তাদের স্বপ্নকে দুমড়েমুচড়ে দিল যারা, তাদের পেছনে কি আবার কখনো তারা যাবে? ‘রাজুতে আয়’ কি আবার জাগিয়ে তুলতে পারবে তাদের নেতিয়ে পড়া মনকে?

পারবে না যে, তা বোঝা গিয়েছিল এনসিপি নামক দলটি গঠনের পরপরই। দু-একটি সভা করার পর থেকেই তাদের ‘বিশাল সমাবেশে’ দর্শক-শ্রোতা-সমর্থকের চেয়ে মোবাইল সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি হতে দেখা গেল। দেশজুড়ে তাদের পদযাত্রা বড় রকমের কোনো প্রভাব ফেলল না। গোপালগঞ্জ নিয়ে এক ভজকট পাকানোর পর কি তাদের ব্যাপারে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে জনগণ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল?

৫. নির্বাচন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে কার কী অবদান ছিল, সে প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। সেই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিংশ শতাব্দী এমন কোনো সময় নয়, যখন মানুষ গুহায় জীবনযাপন করত। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। এ সময়ের তথ্য-উপাত্ত এতটাই সহজলভ্য যে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কোনো উপায় নেই। ইউনূস সরকার মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে হেলা করার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তা ফেল মারার একটা বড় কারণ এই ইতিহাসে রক্ষিত সত্য। ইতিহাস বলছে বাঙালির সংগ্রামের কথা। লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে প্রতারণা করার মাধ্যমে যে দেশটির আবির্ভাব হয়েছিল, সে পাকিস্তান দেশটির প্রতি মোহ ভঙ্গ হতে খুব কম সময় লেগেছিল বাঙালির। কতটা কম সময়? অধ্যাপক ইউনূসের প্রতি যে মোহ ছিল, তা ভঙ্গ হতে যে সময় লেগেছিল, তার চেয়ে বেশি সময় লেগেছিল কি? ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন মুসলিম লীগের যে কবর রচনা করেছিল, তারই পথ ধরে এই ভূমিতে পোক্ত হয়েছিল জাতীয়তাবাদ, পোক্ত হয়েছিল স্বাধিকারের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের নায়কদের এড়িয়ে জোর করে অন্য কাউকে নায়ক বানানোর গল্প যে স্থায়িত্ব পাবে না, জুলাই সনদ নিয়ে ইউনূস সরকারের মরিয়া আর্তনাদেই তার প্রমাণ মেলে।

১০০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস রচনা করার সময় স্পষ্ট হয়ে যাবে কার কী অবদান ছিল বাংলা নামের রাষ্ট্রটি গড়ার ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ এই বিজয়কে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু নির্মোহ ইতিহাস রচনা করতে গেলে আওয়ামী লীগকে কি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে? রাজনীতিবিদ কিংবা ইতিহাসবিদের কি সেই বিবেচনাবোধ থাকবে না? কেন প্রগতিশীল বামপন্থীরা একাত্তরের কাছাকাছি এসে জাতীয়তাবাদীদের পেছনে পড়ে গেল, সে ইতিহাস বর্ণনা না করলে কি বামপন্থী আর জাতীয়তাবাদীদের সে সময়ের অবস্থান পরিষ্কার বোঝা যাবে? কী কারণে উনসত্তরে এসে ছাত্ররাজনীতিতে বামপন্থীদের জায়গায় বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বেশি ভালো করছিল, সেটা নিয়ে কি নির্মোহ আলোচনা হবে না? কোন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা যায় আর কোন বিষয় নিয়ে যায় না, সেই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি না জানার কারণে ইতিহাসের সত্য মুখ থুবড়ে পড়ে। আমাদের দেশে বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে।

৬. ইতিহাস নিয়ে নতুন তত্ত্ব দিতে গেলে তা যে কমেডিতে পরিণত হয়, সেটা কি অলি আহমদের সাম্প্রতিক কথাবার্তায় প্রমাণিত হচ্ছে না? নির্মোহ ইতিহাস রচনা করতে হলে এ ধরনের নানা কমেডি থেকে মুক্তি দিতে হবে ইতিহাসকে। সেদিকে নজর না দিলে নির্বাচন আসবে আর যাবে, আদর্শিক দেউলিয়াত্ব কাটবে না কখনো।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত