Ajker Patrika

আদালতে ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি

শিয়ামাক আলী
আদালতে ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি
ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপের পথটি আদালতে ব্যর্থ হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের কৌশল থেমে নেই; বরং তারা নতুন একটি হাতিয়ার খুঁজে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যখন ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আইইইপিএ)-এর আওতায় ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে ঢাকা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) দ্রুত সম্পাদনের পেছনে যে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর তা অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ওয়াশিংটন দ্রুতই সেই সুযোগটুকুও ছিনিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়েছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ধারা ৩০১-এর আশ্রয় নিচ্ছে। জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি অর্থনীতিকে নতুন করে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে।

১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা ৩০১ যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) কোনো রাষ্ট্রের কার্যক্রম, নীতি বা চর্চাকে ‘অযৌক্তিক’, ‘অন্যায্য’ বা ‘বৈষম্যমূলক’ বিবেচনা করে তদন্ত করতে পারেন এবং সেগুলোকে মার্কিন বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারেন। অতীতে এই বিধান মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন, প্রযুক্তি হস্তান্তর নীতি এবং অন্যায্য প্রতিযোগিতার অভিযোগে ব্যবহার হয়েছে। এখন এটি জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তবে সমস্যার মূল রয়েছে এর কাঠামোতেই। বিষয়টি শুধু এই নয় যে ধারা ৩০১ আইইইপিএ-এর চেয়ে শক্তিশালী। বরং শ্রম অধিকারের ভাষ্যকে ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি যন্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে। এখানে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নৈতিক যুক্তি সরবরাহ করছে, ধারা ৩০১ সরবরাহ করছে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র, আর বাংলাদেশকে আবারও হুমকির মুখে বসে দর-কষাকষি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

আইইইপিএ ছিল সরাসরি, নাটকীয় এবং আইনি দিক থেকে দুর্বল। বিপরীতে ধারা ৩০১ অনেক বেশি পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি চর্চার তদন্ত করতে পারে, সেটি কীভাবে মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষতি করছে তা নির্ধারণ করতে পারে, সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিক্রিয়ার যথার্থতা বিচার করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ অভিযোগকে অর্থনৈতিক চাপে রূপ দেওয়ার আগে কোনো নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব বাণিজ্য আইনের কাঠামোর মধ্যেই তদন্তকারী, প্রসিকিউটর এবং কার্যকরকারী—তিন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় নির্বাচনকে নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে, তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি উপস্থাপন করা হয়েছিল প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে। বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে বাংলাদেশকে কিছু কঠিন ছাড় মেনে নিতেই হবে।

কিন্তু যে শুল্ক-আতঙ্ক সেই তাড়াহুড়োর পরিবেশ তৈরি করেছিল, পরে আদালতের রায়ে তার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবুও দৃশ্যমান জন-অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিসরে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার কোনো গুরুতর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এখন ধারা ৩০১ সেই ভূমিকা পালন করছে, যা আইইইপিএ আর নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারছে না। বাংলাদেশকে এমন কোনো শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না যে দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি জোরপূর্বক শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বরং অভিযোগটি প্রশাসনিক—বাংলাদেশের শ্রম আইন বাস্তবায়নের কাঠামো ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা পূরণ করছে না।

এই অভিযোগ তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত, নমনীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। এর ফলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে শুল্ক আরোপের কারণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, অথচ বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কাঠামোগতভাবে বাধ্যতামূলক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল—এমন স্পষ্ট প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কোনো সমস্যা নেই। বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, দুর্বল পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং পরিবারের জীবিকা নির্বাহের চাপ এখনো বিদ্যমান। তবে উন্নয়নজনিত দুর্বলতাকে স্বীকার করা আর সেই দুর্বলতাকে বৃহৎ কোনো শক্তির রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশকে বন্দুকের মুখে দাঁড় করিয়ে দারিদ্র্য দূর করতে বলা যায় না। একইভাবে, যেখানে অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়ার পেছনে প্রায়ই পারিবারিক অসহায়ত্ব কাজ করে, সেখানে শুধু ওয়াশিংটন নতুন কোনো আইনি হাতিয়ার খুঁজে পেয়েছে বলে রাতারাতি একটি সমাজকে মার্কিন মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলাও সম্ভব নয়।

জোরপূর্বক শ্রমের ভাষ্য এমন এক বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের নৈতিক আবরণ হিসেবে কাজ করছে, যার সময় নির্বাচন নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক এবং গভীরভাবে চাপ সৃষ্টিকারী। আইইইপিএ-ভিত্তিক পথ যখন ভেঙে পড়ছে, তখন ধারা ৩০১ সেই চাপ ধরে রাখার নতুন উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে।

বাংলাদেশকে যখন তার শ্রম-প্রয়োগ কাঠামো রক্ষায় ব্যস্ত রাখা হচ্ছে, তখন বৃহত্তর পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দেশটিকে তুলা-নির্ভর বাজার প্রবেশাধিকার, নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য, ডিজিটাল বাণিজ্যবিধি এবং তৃতীয় দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সীমাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন শর্তের মাধ্যমে বেঁধে রাখছে।

শ্রম অধিকার যখন আলোচনার ভাষা হয়ে উঠছে এবং শুল্ক যখন শৃঙ্খলাবদ্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, তখন নির্ভরশীলতাই সেই সমঝোতা, যা বাংলাদেশকে মেনে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

এখানেই ‘কটন ট্র্যাপ’ বা তুলা-নির্ভর ফাঁদের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং জোরপূর্বক শ্রমের ভাষ্যের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, তা প্রকাশ পায়। ওয়াশিংটন শুধু বাংলাদেশকে শ্রম আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করতে বলছে না; তারা শুল্ক-সুবিধাকে সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার শর্তও জুড়ে দিচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যে ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশের কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে। তবে সেই সুবিধার আওতায় কত পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা যাবে, তা নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কতটা মার্কিন বস্ত্রপণ্য আমদানি করছে তার ওপর। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন তুলা এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক (ম্যান-মেড ফাইবার) কাঁচামাল।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) প্রণীত গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান এ বিষয়ে অবশিষ্ট সংশয়ও দূর করে দেয়। এমন এক সময়ে বাংলাদেশকে মার্কিন তুলার বড় বাজার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যখন ওয়াশিংটন নিজ দেশের তুলা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।

যে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো প্রধান রপ্তানি খাত, তার জন্য এটি কোনো সাধারণ কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয় নয়। মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকারকে যদি মার্কিন কাঁচামাল কেনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন তুলা আর শুধু একটি পণ্য থাকে না; এটি নিয়ন্ত্রণ ও চাপ প্রয়োগের একটি উপকরণে পরিণত হয়।

এ কারণেই জোরপূর্বক শ্রমের যুক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কাঠামো থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। একদিকে বাংলাদেশকে দুর্বল শ্রম আইন প্রয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে এমন একটি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা মার্কিন তুলা ও বস্ত্রশিল্পের স্বার্থ রক্ষা করে।

যদি উদ্বেগের বিষয়টি সত্যিই মানবিক হতো, তাহলে গুরুত্ব দেওয়া হতো শ্রমিক সুরক্ষা, পরিদর্শন সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার ওপর। কিন্তু বাস্তবে শুল্ক-সুবিধার পথ তৈরি করা হচ্ছে মার্কিন কাঁচামালের মাধ্যমে। ফলে সমাধানের প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে বাজার দখলের কৌশলের মতো মনে হতে শুরু করে।

ইতিহাসের প্রতিধ্বনিটিও এখানে কাকতালীয় নয়। বাণিজ্য, শ্রম ও উন্নয়ন বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ড. মোশাহিদা সুলতানা ঋতু ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর তুলনা টেনে বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছেন। তাঁর মতে, এ যুক্তি ঔপনিবেশিক তুলা অর্থনীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত একসময়কার প্রধান বস্ত্র উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ তৈরি পোশাকের বাজারে পরিণত হয়েছিল। একই সময়ে ঔপনিবেশিক কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থা ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবকে জ্বালানি জুগিয়েছিল।

বাংলাদেশকে পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী অর্থে উপনিবেশ বানানো হচ্ছে না। কিন্তু কাঠামোগত মিলটি স্পষ্ট—শক্তিশালী বাজার প্রথমে প্রবেশাধিকার দেয়, এরপর সেই প্রবেশাধিকারকে শর্তসাপেক্ষ করে তোলে, যাতে দুর্বল অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে পুনর্গঠিত করতে হয়।

ধারা ৩০১-এর শুল্ক হুমকির জবাবে বাংলাদেশের কৌশল অস্বীকারের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে না। কারণ সেটি ওয়াশিংটনের জন্য খুব সহজেই খারিজ করে দেওয়ার মতো অবস্থান হবে।

আবার আতঙ্কিত হয়ে সব শর্ত মেনে নেওয়াও সমাধান নয়। কারণ তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই বার্তাই যাবে যে প্রতিবার নতুন কোনো শুল্ক-চাপ সৃষ্টি করলেই বাংলাদেশ আরও একটি ছাড় দিতে প্রস্তুত।

সমাধানের পথটি সংকীর্ণ এবং কঠিন। বাংলাদেশকে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের অজুহাত দূর করতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে কাঁচামাল-নির্ভরতার ফাঁদেও পা দেওয়া যাবে না।

ঢাকার উচিত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা। এর সঙ্গে থাকতে হবে কাস্টমস পর্যায়ে নজরদারি, আমদানিকারকের যথাযথ যাচাই (ডিউ ডিলিজেন্স), সরবরাহকারীর নথিপত্র যাচাই এবং ধাপে ধাপে কার্যকর করার ব্যবস্থা।

তবে এই কাঠামো গড়ে উঠতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব আইন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডের ভিত্তিতে; ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মানচিত্র হুবহু অনুসরণ করে নয়। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশ, অঞ্চল বা সরবরাহকারীকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে, সেগুলো বাংলাদেশের জন্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধের নীতি কার্যত ওয়াশিংটনে প্রণীত একটি বৈদেশিক সরবরাহনীতি হয়ে দাঁড়াবে।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ চীন। একবার যদি চীনা কাঁচামালকে আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বা বাণিজ্যিকভাবে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মার্কিন তুলাই পরিকল্পিতভাবে ‘নিরাপদ’ বিকল্প হিসেবে সামনে চলে আসে। এর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনারও প্রয়োজন হয় না। রপ্তানিকারক আলোচনার টেবিলে বসার আগেই তার বিকল্পের পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়।

তাই ঢাকার উচিত শ্রম সংস্কারকে তুলা-নির্ভরতার প্রশ্ন থেকে আলাদা রাখা। বাংলাদেশ সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু শুল্ক-সুবিধাকে মার্কিন বস্ত্র কাঁচামালের সঙ্গে যুক্ত করতে দেওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশ শ্রম পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে, তবে কোথা থেকে তুলা, সুতা, কাপড় বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও ধরে রাখতে হবে। যদি কোনো সরবরাহকারী সত্যিই জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে বাংলাদেশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এমন ব্যবস্থা মেনে নেওয়া উচিত নয়, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের ক্রয়নীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের উচিত বিষয়টিকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখা বন্ধ করা। একই ধারা ৩০১-এর আওতায় ৬০টি অর্থনীতিকে চাপের মুখে রাখা হয়েছে। কেউ অভিযোগের ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে, কেউ অব্যাহতি, সময়সীমা বৃদ্ধি বা বিশেষ ছাড়ের জন্য আলোচনা করছে।

বাংলাদেশের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে এই যুক্তি তুলে ধরা—জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধ বৈধ লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু একতরফা শুল্ক-শাস্তিকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মার্কিন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের হাতিয়ার বানানো গ্রহণযোগ্য নয়।

একই ধরনের চাপ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতারা আকস্মিক শুল্ক বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন কিংবা ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি—কোনোটিই চায় না।

বাংলাদেশ যদি একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে এসব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনের ভেতরেই একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হয়ে উঠতে পারে। বার্তাটি হওয়া উচিত সহজ—বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংস্কার করবে, কিন্তু মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়ার মূল্য হিসেবে স্থায়ী শুল্ক-ভীতি মেনে নেবে না।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া হতে হবে পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী, প্রদর্শনমূলক নয়। ওয়াশিংটন যে নিয়ন্ত্রক দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে, তা দূর করতে হবে; তবে আনুগত্যের নামে সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের নিজস্ব আইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে শ্রম আইন প্রয়োগব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব। এর জন্য মার্কিন তুলা কেনাকে বাধ্যতামূলক করা বা বাংলাদেশ কোথা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করবে, সে বিষয়ে নীরব ভেটো মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

লক্ষ্য ওয়াশিংটনকে উসকে দেওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের প্রতিটি দুর্বলতাকে নতুন কোনো ছাড় আদায়ের অস্ত্রে পরিণত করার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করা।

লেখক: বাংলাদেশের ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক এবং একটি থিংক ট্যাংকের গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত