
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার রাজশাহী। পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা এই কৃষিসমৃদ্ধ নগরীর মানুষ আজও রেল সংযোগের ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একটি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে সরাসরি ট্রেনে যাওয়া যায়, সিলেট থেকেও যায়। কিন্তু রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম যেতে হলে আব্দুলপুর জংশনে এসে গেজ পরিবর্তন করতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই একটি ৪০ কিলোমিটারের রেলপথের গেজ বাধা রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবাক করার বিষয়, মাত্র ৪০ কিলোমিটারের এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের রূপান্তর আজও বাস্তবায়িত হয়নি—না কোনো বাজেটে, না কোনো পরিকল্পনায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি পৃথক গেজে বিভক্ত। পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ এবং পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ চলে। রাজশাহী ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের আওতায়। ফলে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট বা ময়মনসিংহে একটানা ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। আব্দুলপুর জংশনে এসে যাত্রী ও পণ্য—উভয়কে ট্রেন পরিবর্তন করতে হয়। যাত্রীর জন্য এটি যন্ত্রণাদায়ক, আর পণ্যের জন্য এটি সর্বনাশা। পচনশীল কৃষিপণ্য ট্রান্সশিপমেন্টের অপেক্ষায় নষ্ট হয়, পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন এবং কৃষক ন্যায্য দাম পান না। ইতিবাচক দিক হলো, বর্তমানে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ডুয়েলগেজ উপযোগী স্লিপার প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। কিন্তু শুধু স্টেশন সংস্কার করলেই হবে না, পুরো ৪০ কিলোমিটার পথ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে না এলে এই বিনিয়োগ অর্ধসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।
এই অঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনা যে কতটা বিশাল, তা সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায়। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এককভাবে প্রায় ৩ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। নওগাঁয় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আমের প্রত্যাশা রয়েছে এবং শুধু নওগাঁ জেলাতেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে। চার জেলা মিলিয়ে চলতি মৌসুমে আম-বাণিজ্য ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে রাজশাহীর রেশম, নাটোরের পেঁয়াজ, নওগাঁর ধান-আলু এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফলবাগান। বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, রাজশাহী বিভাগের জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যা মোট আয়ের ৬০ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এই বিপুল কৃষি উৎপাদন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে রপ্তানি হতে পারত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু রেল যোগাযোগের দুর্বলতায় বছরের পর বছর সেই সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। কৃষক উৎপাদন করছেন, কিন্তু ন্যায্য বাজারে পৌঁছাতে পারছেন না, তার দায় অনেকটাই এই ভাঙা রেল সংযোগের।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের রপ্তানি-বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনা করে। উত্তরাঞ্চলের পণ্য এই বন্দরে দ্রুত এবং সাশ্রয়ে পৌঁছানো গেলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। রেলপথে পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় প্রতি টন-কিলোমিটারে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম ব্যয়বহুল এবং পচনশীল পণ্যের জন্য অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আম মৌসুমে বিশেষ ট্রেন চালু করেছিল। কিন্তু গেজ জটিলতা ও একক লাইনের কারণে ঘন ঘন বিলম্ব হতো, পরিচালন ব্যয় আয়ের দ্বিগুণের বেশি হয়ে পড়ে এবং টানা লোকসান হওয়ার কারণে এই বিশেষ ট্রেন পরিষেবা একসময় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে এই ধরনের ব্যর্থতা আসলে উত্তরাঞ্চলের রেলকাঠামোর দুর্বলতারই প্রতিফলন।
রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন হলে সরাসরি পণ্যবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে পারত। শুধু চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও রংপুরের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হতো। বিনিয়োগকারীরা উত্তরাঞ্চলে কারখানা স্থাপনে তখনই আগ্রহী হবেন, যখন পণ্য পরিবহন করার জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত হবে। রাজশাহীতে শ্রমশক্তি আছে, শিক্ষিত জনবল আছে, কাঁচামাল আছে—শুধু নেই নির্ভরযোগ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা।
এই একটি বাধা দূর হলে পুরো উত্তরাঞ্চলের শিল্পচিত্র বদলে যেতে পারে।
উন্নত রেল সংযোগ শুধু কৃষি ও শিল্পের বিকাশই ত্বরান্বিত করবে না, বরং পদ্মার চর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও পুঠিয়া রাজবাড়ির মতো আকর্ষণীয় গন্তব্যে সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করে উত্তরাঞ্চলের পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
রাজশাহী-আব্দুলপুর রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার আশ্বাস আর পরিকল্পনার কথা বহুবার শোনা গেলেও প্রকল্পটি এখনো ডিপিপি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বাংলাদেশ রেলওয়ের চলমান প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে বৈষম্যের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন এবং আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইনের মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে থাকলেও রাজশাহী-আব্দুলপুর অংশটি এখনো অগ্রাধিকারের তালিকার বাইরে। প্রশ্ন হলো, মাত্র ৪০ কিলোমিটারের এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ কেন বছরের পর বছর নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ পাচ্ছে না?
এর কারণ শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক নয়; নীতিগত ও রাজনৈতিকও। দীর্ঘদিনের ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের ফলে উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো চাহিদা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। পাশাপাশি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার অভাবে রাজশাহী-আব্দুলপুর রেলপথ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিলে এটি বিলাসিতা নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।
বর্তমান সময়টি উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আব্দুলপুর-রাজশাহী অংশকে এখনই যুক্ত করা হবে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ। অন্যথায় সংযোগটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং উত্তরাঞ্চল প্রত্যাশিত সুফল পাবে না। তাই এখনই রাজশাহী-আব্দুলপুর অংশের ডিপিপি প্রণয়ন এবং অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া একান্ত জরুরি। অর্থায়নের পথও পুরোপুরি বন্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রেল খাতে বিনিয়োগ করছে। গ্রহণযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুত করা গেলে এই প্রকল্পের জন্যও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে এর প্রভাব বিনিয়োগের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, কার্যকর রেল সংযোগ আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভারতের মহারাষ্ট্রের ফল উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে বিশেষ মালবাহী রেলসেবা চালুর পর কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে এবং পরিবহনজনিত ক্ষতি কমেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিও একই ধরনের সুবিধা পেতে পারে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা দীর্ঘদিন ধরে দেশের রেল অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করছে। একটি গ্রহণযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।
এখন প্রশ্ন উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়, বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে। উত্তরাঞ্চলের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না; তারা চায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কার্যকর রেল অবকাঠামো। রাজশাহী-আব্দুলপুর ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে এবং পর্যটন খাতও উপকৃত হবে। মাত্র ৪০ কিলোমিটারের এই রেলপথ উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, যা এখন পরিকল্পনার নয়, বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সামরিক উপস্থিতিও সরে গেছে। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি শুধু ইরাকের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ, যে সময়ে মার্কিন সেনারা ইরাক ছাড়ছেন, একই সময়ে ওয়াশিংটন-তেহরান...
৭ ঘণ্টা আগে
যদি কেউ বলে, ১৯ বছরের খিদে পেটে থাকায় বিএনপি, যুবদল বা ছাত্রদল ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর খাই খাই রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তাহলে কি ভুল কিছু বলা হয়? ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে চাঁদাবাজির সঙ্গে যেভাবে জড়াচ্ছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো, তাতে সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার...
৭ ঘণ্টা আগে
সাতক্ষীরার ফিংড়ি ইউনিয়নে এক বিকেলে ছয় বছরের এক শিশু স্কুল থেকে ফিরছিল। পথে তার চেনা এক যুবক তাকে ডাকল বিস্কুট দেবে বলে। শিশুটি ভেতরে ঢুকল। কেউ ছিল না। যুবকটি দরজা বন্ধ করল, মুখ চেপে ধরল, হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করল। অভিযুক্ত ওই যুবক পলাতক।
৭ ঘণ্টা আগে
অর্থনীতিই আসল, অন্য জিনিস ওপরের দৃশ্য। চীন, রাশিয়ার শাসকদের দোষ এটা নয় যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে তারা গণতন্ত্রী বানিয়েছে। অপরাধ এটা যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে তারা পুঁজিবাদের পথে নিয়ে গিয়েছে। ওপরের আচ্ছাদনটা গণতন্ত্রের, ভেতরের কারসাজি—সবটাই পুঁজিবাদের। তার ফলে একসময় যেসব ব্যাধি একেবারেই
১ দিন আগে