জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এর দুই বছর পূর্তিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—জুলাই কি সফল, নাকি ব্যর্থ? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ইতিহাসের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্যায়ন হয় অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—দুইয়ের সমন্বয়ে। তাই জুলাইকে হয় সম্পূর্ণ সফল, নয়তো সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলে রায় দেওয়া বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান। বহু বছর ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা, বিরোধীমতের ওপর দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই জনগণকে নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ অন্তত বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের ইচ্ছার ঊর্ধ্বে নয়।
এই পরিবর্তনের পর বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের যে তিনটি লক্ষ্য সামনে আনা হয়েছিল, তার কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে, বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অধিক প্রতিযোগিতামূলক করার চেষ্টা দেখা গেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথ বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়।
তবে এখানেই গল্পের সমাপ্তি নয়। জুলাই যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, তার অনেকটাই এখনো অপূর্ণ। আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ করা, নাগরিক হয়রানি কমানো কিংবা রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিভাজনও কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রত্যাশার মাত্রা। যেকোনো গণ-অভ্যুত্থান জনগণের মনে দ্রুত পরিবর্তনের আশা সৃষ্টি করে। কিন্তু রাষ্ট্রের ভাঙা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, বিচারব্যবস্থা সংস্কার কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে ফেলা কয়েক মাস বা এক বছরের কাজ নয়। ইতিহাস বলে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন হয়। তাই দুই বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পুরো আন্দোলনকে ব্যর্থ ঘোষণা করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি সীমাবদ্ধতাগুলোকে অস্বীকার করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হতে পারে না।
জুলাই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে যে, ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনই হতে হবে ভবিষ্যতের লক্ষ্য। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অপরিহার্য মনে করার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য কখনোই শুভ নয়। একইভাবে, যে আন্দোলন গণতন্ত্রের জন্য লড়েছে, সেই আন্দোলনের উত্তরসূরিদেরও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা ও আত্মসমালোচনার চর্চা করতে হবে। অন্যথায় নতুন বাস্তবতাও পুরোনো সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নেও বাস্তববাদী হওয়া জরুরি। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা—এসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংস্কার কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
সবচেয়ে বড় কথা, জুলাইয়ের সাফল্য শুধু একটি সরকার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কতটা গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হয় তার ওপর। যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবেই জুলাই তার ঐতিহাসিক মর্যাদা পাবে। আর যদি পুরোনো ভুল নতুন রূপে ফিরে আসে, তাহলে ইতিহাস কঠিন প্রশ্ন তুলবেই।
জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আচরণ এবং নাগরিক অধিকার—সব ক্ষেত্রেই টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ এখনো শেষ হয়নি; প্রকৃত পথচলা শুরু হয়েছে মাত্র।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পলিবিধৌত বাংলায় ১৯৭১ সালে যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা আজ সাড়ে পাঁচ দশক পর সিন্ধু নদের অববাহিকায় এক ভৌতিক প্রতিধ্বনি তুলছে। ইতিহাস নাকি নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে—একবার ট্র্যাজেডি হিসেবে, আরেকবার প্রহসন হিসেবে। বর্তমান পাকিস্তানের দিকে তাকালে কার্ল মার্ক্সের এই বিখ্যাত উক্তিটি
১ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৫ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। চারপাশে মুখোশপরা চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীর মাঝে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো মুখোশ ছিল না। মুখে যে কথা আসে বলে ফেলতেন। কথাকে যে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উপযোগী করে বলতে হয়, তা তিনি জানতেন না। অন্য অনেকে কৌশল করে কথা বলেন। কারণ, তাঁরা প্রায় সবাই লোকসমাজে যা
১ ঘণ্টা আগে
কয়েক মাস আগে ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশের এক চিরচেনা দৃশ্য—পাম্পে দীর্ঘ সারির গাড়ির লাইন চোখে পড়েছিল। সে সময় গ্যাস-সংকটের অন্যতম কারণ ছিল ইরান আগ্রাসন। সেই একই পরিস্থিতি আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এবার কিন্তু বৈশ্বিক কোনো ব্যাপার নেই।
১ ঘণ্টা আগে
কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মাস কোনটি? আমি নির্দ্বিধায় বলব, ২০২৪ সালের জুলাই। ক্যালেন্ডারের হিসাবে এটি বছরের সপ্তম মাস—মাত্র ৩১ দিনের। কিন্তু অনুভূতির হিসাবে যেন কয়েক যুগের সমান। এই এক মাসে আমি দেখেছি মানুষের সাহস, ভয়, কান্না, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ এবং আশার এক বিরল
১ দিন আগে