বাংলাদেশের জনগণ এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে মানুষের মধ্যে। কারণ, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা ধরনের ভূমিকার কারণে সেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, গুম-খুন-নির্যাতন, উন্নয়নের নামে ফুলবাড়ী, রামপালসহ বিভিন্ন প্রাণবিনাশী প্রকল্প গ্রহণের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধের চেতনা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ক্রমে ঘনীভূত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান একটা সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। ২০১৪ সালের পর থেকে অনির্বাচিত সরকারের জোরজবরদস্তি, অবৈধ ক্ষমতা আর অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় লুণ্ঠন, অত্যাচার অব্যাহত রাখতে পারায় সেই শাসকদের মধ্যে তৈরি হয় সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এ ঔদ্ধত্যই ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের অবস্থা তৈরি করে। আর এ হতাহতের নৃশংসতায় বহু বছরে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় এবং তৈরি হয় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান।
বাংলাদেশে দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা একটি গভীর দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে এ গণ-অভ্যুত্থান। এই সময়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে, স্বৈরাচার ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে। এমনকি দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোও এমন পরিণত বার্তাই প্রকাশ করেছে। দেয়ালগুলো ঘোষণা করেছে—মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধনির্বিশেষে সব বাংলাদেশির সমানাধিকার থাকা উচিত। এগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য এটাই যে ধর্ম পরিচয় দিয়ে কোনো বিভেদ সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়। বাঙালি ছাড়াও আরও বহু জাতির দেশ এ বাংলাদেশ, জাতিগত বৈষম্য তাই চলবে না। দেয়ালচিত্রে তরুণেরা লিঙ্গসমতা ও একটি ন্যায়সংগত বাংলাদেশ দাবি করেছে। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন এ দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগণ থেকে আগত। কারণ, কোটা আন্দোলন তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্তানের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল সেখানে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় উঠে আসা ব্যক্তিরা রাজপথে, দেয়ালে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত বৈষম্যের অবসানের দাবিগুলো সমান স্পষ্টতার সঙ্গে যে ধারণ করেননি, তারই প্রকাশ ঘটছে বারবার। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। স্বৈরাচারী শাসন দূর হলেও এখনো দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি অব্যাহত আছে। মব সন্ত্রাস করে মানুষের বাড়িঘর ভাঙা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে। আবার কিছু লোকের ভাড়াটে হিসেবে মব তৈরি করা হয়েছে কাউকে বসানোর জন্য, আবার কাউকে ওঠানোর জন্য।
এই যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাতে সরকারকে আমরা দায়ী করতাম না, যদি আমরা দেখতাম, সরকার এগুলো থামানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা বরং দেখতে পেয়েছি, সরকারের মধ্যে কেউ কেউ এই মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষী তৎপরতা এখনো বন্ধ হয়নি। জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি ও প্রকল্প বহাল আছে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে আমরা গত সরকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। সেই একই রকম স্বৈরাচারী ভাব, জনগণের ওপর একই রকম নিপীড়ন এবং একই রকম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। একইভাবে দেশের স্বার্থ বিপন্ন করে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে।
২. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল আসলে যথাযথ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করা। মানুষ যেন নিরাপদে এবং সুস্থভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, ভোট দিতে পারে, সংঘাত বা সহিংসতা যেন না হয়—এগুলো নিশ্চিত করাই এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল। সরকারের যা নিশ্চিত করার কথা ছিল, তা হলো—সরকার যেন পক্ষপাতহীন থেকে, প্রশাসন এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে বিন্যাস করা। প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাস করা, প্রয়োজনে কাঠামোর ভেতরে যে পরিবর্তন দরকার, সেটা করা। আমরা অতীতে দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো নির্বাচন সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে, সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও দলীয় প্রভাবের মধ্যে আছে। ফলে নির্বাচনের এই প্রচারকালীন অবস্থায়ও সমাজে নানা মাত্রায় অনাস্থা দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি তিনটি দলই ‘কিছু উপদেষ্টার’ অপসারণ চেয়েছে। যে দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেবে, উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে তাদের যদি সমবেতভাবে অভিযোগ থাকে, তবে সেটা সবারই আশঙ্কার বিষয় থাকার কথা ছিল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তিন ধরনের যথা—অদক্ষতা, দুর্নীতি ও দলীয় পক্ষপাত নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু অন্তর্বতী সরকারের প্রধানকে সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তৎপরতা দেখাতে দেখা যায়নি। তিনি সেই অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। প্রশ্ন হলো, যদি অভিযোগগুলো অযৌক্তিক হতো কিংবা জোরজবরদস্তিমূলক হতো—যেমন আমরা অনেক সময় দেখেছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোক বসানো বা সরানোর ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসের মতো প্রবণতা তৈরি করা হয়েছিল, তাহলে সেটাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কথা ছিল না। সেই অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কতটা বিচার-বিবেচনা, দক্ষতা, সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা দিয়ে বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে পেরেছেন? আমাদের এমন সংশয় বেড়েছে তাঁর কথাবার্তার কারণেই।
বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াত—এই তিন দলের মধ্যেই সরকারে, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল। কোথাও জোরজবরদস্তি হয়েছে, কোথাও কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, কোথাও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সেসব তৎপরতা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য বড় হুমকি ছিল। সাধারণভাবে অনেকেই ধারণা করেছেন, এই সরকার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই তিন দলেরই সরকার। এই তিন দলের মধ্যে নিজেদের অংশ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। সেসব অভিযোগের কোনো সমাধান হয়নি। ফলে পূর্ববর্তী ঘটনার জেরের কারণে সামনের সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ যে বড় স্বপ্ন দেখেছে, তার পথে কাঁটা বিছানোর চেষ্টা করছে কেউ কেউ।
৩. ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে সর্বস্তরের মানুষের অদম্য ভূমিকার কারণে। এখানে অংশ নিয়েছে সব ধর্ম, মত, লিঙ্গ, পেশা, বিশ্বাসের মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, নিরাশ্রয়, তরুণ, শিশু, বৃদ্ধ। গুলিতে রক্তাক্ত হতে হতে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যে দাবি সামনে এসেছে তা হলো এই দুর্নীতিবাজ, খুনি, অত্যাচারী শাসকের পতন হোক, আমরা বৈষম্যহীন এবং নিপীড়ন ও আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কেউ ক্ষমতা ব্যবহার করে তার অধস্তনকে নিপীড়ন করবে না, শ্রমজীবী মানুষের হিস্যা আদায় হবে, তাকে নিপীড়িত হতে হবে না, নারীরা নিরাপদে চলাফেরা ও জীবনযাপন করতে পারবে, যেখানে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষদের বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। মানুষের লড়াই তত দিন চলবে, যত দিন জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ অতীত ও বর্তমানের সব মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়ন-অত্যাচারের বিচার না হবে, যত দিন বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্যের অবসান না হবে, তত দিন মানুষের লড়াই থামবে না। এর মধ্যে সামনের নির্বাচন অনুষ্ঠান যথাযথভাবে সম্পন্ন করা এই সরকারের দায়িত্ব, যাতে জনগণের অংশগ্রহণে দেশ পরিচালনা এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু হয়। এর অন্যথা করার কোনো সুযোগ এই সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কেন জানি না গত বছর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলাকে অনেক বেশি ভালো লেগেছিল। এর একটি প্রধান কারণ—বেশ সুসজ্জিত মনোরম ও পরিপাটি করে গাছপালা দিয়ে সাজানো, মনে হচ্ছিল যেন এক চমৎকার প্লান্ট কনজারভেটরিতে এসে পড়েছি।
৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ যে সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি একেবারে হঠাৎ দুর্ঘটনা নয়; বরং বিগত কিছুদিনের ধারাবাহিক ভুল-বোঝাবুঝি, আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা অস্বীকার করার ফল। সাম্প্রতিক সময়ে আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতের আচরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক ছিল।
৮ ঘণ্টা আগে
রাজধানীর নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমিতে শিশু নির্যাতনের পাশবিক ঘটনা ঘটেছে। শিশুটির বয়স চার বছরেরও কম। স্কুলের পোশাক পরা এক শিশুকে অফিসকক্ষে নিয়ে গিয়ে একজন নারী শিশুটিকে চড় মারেন।
৮ ঘণ্টা আগে
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে জনপরিসরে নির্বাচনী আবহ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সরাসরি ভোট চাইতে শুরু করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে প্রার্থীদের নির্বাচনী...
১ দিন আগে