ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকা গত ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পে বেশ জোরেশোরে কেঁপে উঠেছিল। তারপর এক সপ্তাহের মধ্যে সাতবার কেঁপেছে দেশ। বাস্তবজীবনের এই কম্পনের ধাক্কা লেগেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়ও। অনেকেই নিজের বাসা-অফিসের সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজ শেয়ার করেছেন। কে কীভাবে দৌড়েছেন, কার পোষা প্রাণী (কুকুর-বিড়াল) কেমন আচরণ করেছে, কার বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে বাইরের কেমন দৃশ্য ধরা পড়েছে, সেসব ছবি-ভিডিওর বন্যায় ভেসে গিয়েছিল সামাজিকমাধ্যমগুলো।
শুধু ভূমিকম্পের পরপরই নয়, আমরা ছবি-ভিডিওর নেশায় এমন মেতে উঠেছি যে কোথাও একটু ভালো কিছু দেখলে, ভালো কিছু খেলে কিংবা ভালো কিছু ঘটলে চট করে তার ছবি-ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে দিয়ে দিচ্ছি। এটা হয়তো আমাদের সবার সঙ্গে খুশি-আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার সহজাত প্রবণতা। কিন্তু সেই প্রবণতাই দিনে দিনে হয়তো বিপদ ডেকে আনছে।
আধুনিক এই যুগে প্রায় সবার বাসায়ই সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, ক্যামেরাযুক্ত অন্যান্য ডিভাইস আছে। এসব যে কেবল নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে, তা কিন্তু নয়। ঝুঁকিও তৈরি করছে, হুমকিতে ফেলছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে। এই প্রেক্ষাপটে ১ ডিসেম্বর বিবিসিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ না করলেই নয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ২০ হাজার ক্যামেরা হ্যাকড হয়েছে। সেসব ক্যামেরায় চোখ রেখে ছবি-ভিডিও ধারণ করছিল দুষ্ট চক্র। চক্রটি এসব ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে বিদেশি একটি ওয়েবসাইটের জন্য যৌন নিগ্রহমূলক (সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেটিভ) কনটেন্ট তৈরি করত।
তবে চক্রটি পার পায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ চক্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ বলেছে, ইন্টারনেটে যুক্ত ক্যামেরাগুলোর দুর্বল পাসওয়ার্ডসহ নানা ধরনের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েছিল হ্যাকাররা।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশ আরও বলেছে, যে চারজনকে তারা গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা কিন্তু একে অপরের সহযোগী নন। তাঁরা কেউই কাউকে আগে থেকে চেনেন না। একেবারে নিজের মতো করে কাজ করতেন তাঁরা। তাঁদের একজন ৬৩ হাজার ক্যামেরা হ্যাক করে ৫৪৫টি আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করেছেন। সেসব ভিডিও তিনি সাড়ে ৩ কোটি উওন (১২ হাজার ২৩৫ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকার কিছু বেশি) বিক্রি করেছেন। গ্রেপ্তার আরেকজন ৭০ হাজার ক্যামেরা হ্যাক করে ৬৪৮টি ভিডিও তৈরি করেছেন। তিনি এসব ভিডিও ১ কোটি ৮০ লাখ উওনে বিক্রি করেছেন। তাঁরা দুজনে মিলে যে ওয়েবসাইটের কাছে ভিডিওগুলো বিক্রি করেছেন, সেটি আইপি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজ প্রকাশ করে। ওই ওয়েবসাইটে গত বছর প্রকাশিত মোট ভিডিওর ৬২ শতাংশই সরবরাহ করেছেন এই দুজন।
মানুষ বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে মূলত নিরাপত্তা জোরদারের জন্য। এসব আইপি ক্যামেরা বাসাবাড়ির কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। কিন্তু সে ক্যামেরাই এখন নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটিফোর উপন্যাসের একটি লাইন উল্লেখ না করলেই নয়—‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’ (অর্থাৎ বড় ভাই আপনাকে দেখছেন)। এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু অবশ্য কাল্পনিক স্বৈরতান্ত্রিক একটি দেশ। তবে যেভাবে সাইবার জগতে আমাদের নিরাপত্তাজনিত হুমকি বাড়ছে, তাতে এ ক্ষেত্রেও উপন্যাসের ওই কথার সঙ্গে মিলিয়ে বলাই যায়—‘সামওয়ান ইজ ওয়াচিং ইউ (কেউ আপনাকে দেখছে)। এবং সেই দেখার সুযোগটা আমরাই করে দিচ্ছি নানাভাবে।
প্রথমত, আমরা যেসব ডিভাইস কিংবা সেবা ব্যবহার করি সেগুলোর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন (শর্তাবলি) না পড়েই গ্রহণ করি। আপনার-আমার মুঠোফোনে এমনও অ্যাপ্লিকেশন থাকতে পারে, যে চুপিসারে আমাদের কললিস্ট, ফোনবুকে চোখ রাখছে। কিছুদিন আগে ফেসবুক নিয়ে একটি সংবাদ হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ব্যবহারকারীর ফোনের ক্যামেরা ও গ্যালারি দেখতে চায় ফেসবুক। প্রতিষ্ঠানটি তাও বলে-কয়ে, ঘোষণা দিয়ে আমাদের অন্দরমহলে ঢুকতে চাইছে। কিন্তু অনেক অ্যাপ আছে, যারা কিছু না বলেই আমাদের ফোনে চোখ-কান দুটোই পাতছে।
আমাদের অনেকের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করি। পাসওয়ার্ড মনে রাখার ঝামেলা এড়াতে এই কাজ করি আমরা। কিন্তু এতে আমরা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়ার ওই সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাকের ঘটনা। তা ছাড়া ব্যাংক ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যাপেও হ্যাকের ঘটনা অহরহ ঘটে। আবার কেউ কেউ প্রলোভনে পড়ে কিংবা কথার মারপ্যাঁচে পড়ে অন্যকে পাসওয়ার্ড দিয়ে বিপদে পড়ি।
পাশাপাশি আমরা অনেকেই সামাজিকমাধ্যমে প্রচুর ছবি-ভিডিও প্রকাশ করি। আপাতদৃশ্যে নির্দোষ এই কাজের পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। প্রতিটা ছবি ও ভিডিওর ভেতরে লুকানো থাকে কিছু মেটাডেটা। সেসব মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে দুর্বৃত্তরা সহজেই আমাদের অবস্থান, ছবি তোলার স্থান-কাল বের করে ফেলতে পারে। আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি প্রায়ই করি, তা হলো কোনো চিন্তাভাবনা না করেই শিশুদের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করে দিই। এতে শিশুটির জন্য যে কী বিপদ আসতে পারে, তা কখনোই ভাবি না আমরা। ইন্টারনেটে আমরা যেটুকু ঘুরে বেড়াতে পারি, ইন্টারনেট তার চেয়ে অনেক বড়। আর সেই বড় জায়গাটার বিশাল অংশই হলো ডার্কওয়েব।
সেখানে নাগরিকের তথ্য থেকে শুরু করে এমন কিছু নেই যা বিক্রি হয় না। অনেক ওয়েবসাইট আছে যারা শিশুদের ছবি-ভিডিও চুরি করে আপত্তিকর ভিডিও বানায়। আগে এমন কাজ কঠিন হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সবকিছুই এখন সহজ হয়ে গেছে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি আমরা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করব না? আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাব না? সারা বিশ্ব যেখানে চোখের ইশারায় সবকিছু করে ফেলার প্রযুক্তি নিয়ে খেলতে শুরু করেছে, সেখানে আমরা কি এখনো ‘গুহাবাসী’ থেকে যাব? না, আমরাও এগিয়ে যাব প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষিত হয়ে। আমাদের বাসায় কিংবা অফিসে অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, তার পাসওয়ার্ডসহ নিরাপত্তার বিষয়গুলো এমনভাবে নিশ্চিত করব যেন হ্যাকড না হয়। আমরা আমাদের মুঠোফোনসহ স্মার্ট ডিভাইসগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করব। হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করতে আমরা সামাজিকমাধ্যমে ছবি-ভিডিও শেয়ার করব, তবে সচেতন থাকব। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা থাকব স্পর্শকাতর। মুঠোফোনে কোনো অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টল করার আগে তার শর্তাবলি ভালোভাবে পড়ে দেখব সেই অ্যাপ্লিকেশন আমাদের ফোনের কোন কোন জিনিসগুলোয় চোখ রাখতে চায়। নির্ভরযোগ্য না হলে অ্যাপ ব্যবহার করব না। পাশাপাশি প্রযুক্তি দুনিয়ার অগ্রগতি ও হুমকির বিষয়ে সব সময় নিজেকে হালনাগাদ রাখব। তাহলেই কেবল আমরা আমাদের ও আমাদের সন্তানদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে পারব।
লেখক: সাংবাদিক

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়কে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রথমত, তৃণমূলের ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিরাট অংশের মানুষের বিপুল ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আর জি করের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনাও মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তৃণমূল দলটি বেশ কয়েক বছর ধরে ‘আইপ্যাক’ নামের এক
৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের সরকারি চাকরি ব্যবস্থায় সম্প্রতি যে ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, তা হলো শিক্ষা ক্যাডারের ৩৫৫ জন কর্মকর্তার একযোগে প্রশাসন ক্যাডারে উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন। সরকারি কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প পর্যায়ে কর্মরত অনেক অভিজ্ঞ কর
৮ ঘণ্টা আগে
রাজধানীর তিনটি সরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ১২ জন দালালকে আটক করার জন্য র্যাবকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। অবশ্যই এটা একটা বলার মতো কাজ হয়েছে। দালালদের দোর্দণ্ডপ্রতাপে সরকারি হাসপাতালগুলোর যে নাজেহাল অবস্থা, সেটা কোনো নতুন খবর নয়। যাঁরাই সরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁরাই জানেন কী ধরনের পরিবেশ।
৮ ঘণ্টা আগে
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ইতিমধ্যে চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনও প্রায় সমাপ্তির পথে। কিন্তু এরপরও খানিকটা হতাশা নিয়েই লক্ষ করতে হচ্ছে যে মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধিকাংশই এখন পর্যন্ত গঠিত হয়নি।
১ দিন আগে