বিভুরঞ্জন সরকার

পৃথিবীতে যে কত কারণে কত দিবসের জন্ম হয়েছে, তার সবগুলো সম্পর্কে এখনো হয়তো অনেকেরই জানা হয়নি। সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে আমাদের এমন সব দিবস সম্পর্কেও জানতে হয়, যা না জানলে অন্যদের তেমন কোনো লাভ-লোকসান আছে বলে মনে হয় না। তবে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের কথা আলাদা। এই দিবস নানা কারণে মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা বুঝি বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে, নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণ আছে, তা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। তবে নানা বিষয়েই যে আমরা মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছি, সেটা তো কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমরা কেউ আর পরের কথা শুনতে চাই না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চাই। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা, অসহনশীলতা।
সম্ভবত এ জন্যই প্রতিবছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতিবছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।
‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’
ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কর্মসূচি নেওয়ার কথা শোনা যায় না। কারণ কি এই যে আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আমাদের আর নতুন করে সহনশীলতাচর্চার প্রয়োজন নেই? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। বিরোধী দলকে নির্বাচনে না আসতে যা যা করার তা করি বিপুল আনন্দে। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই মারামারি, খুনোখুনি হচ্ছে।
অবশ্য যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থা হয়নি। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায় বললে বলতে হয়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়, সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, আরও ছোট করে বললে এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?
স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না—এমনতর সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না—সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা, জঙ্গিবাদের জন্ম।
আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, আমার বিশ্বাসই চরম সত্য—এমন অন্ধত্ব দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি করছে। আমার সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে, আমার কথা সবাইকে মেনে চলতে হবে, না হলেই গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়ার চিন্তা পৃথিবীকে শক্তিমত্তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্যের সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেওয়ার মনোভাবকে এখন একধরনের দুর্বলের চিত্তবিকার বলে উপহাস করা হয়। পৃথিবী নাকি শক্তের ভক্ত, নরমের যম! তাই শক্তিচর্চার অবাধ আয়োজন বিকারগ্রস্ত এক সময়ের মধ্যে এনে ফেলেছে মানবসভ্যতাকে।
যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। অন্যের বিশ্বাস, অধিকার, মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। নিয়ম মানায় অভ্যস্ত হতে হবে। একে অপরের বোকামি বা পাকামিকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঔদার্য শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি। ধর্ম রক্ষার জন্য ছুরি হাতে, বন্দুক হাতে না ছুটে সৌহার্দ্যের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা।
শেষ করি জালালউদ্দিন রুমিকে উদ্ধৃত করে: ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

পৃথিবীতে যে কত কারণে কত দিবসের জন্ম হয়েছে, তার সবগুলো সম্পর্কে এখনো হয়তো অনেকেরই জানা হয়নি। সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে আমাদের এমন সব দিবস সম্পর্কেও জানতে হয়, যা না জানলে অন্যদের তেমন কোনো লাভ-লোকসান আছে বলে মনে হয় না। তবে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের কথা আলাদা। এই দিবস নানা কারণে মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা বুঝি বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে, নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণ আছে, তা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। তবে নানা বিষয়েই যে আমরা মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছি, সেটা তো কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমরা কেউ আর পরের কথা শুনতে চাই না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চাই। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা, অসহনশীলতা।
সম্ভবত এ জন্যই প্রতিবছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতিবছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।
‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’
ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কর্মসূচি নেওয়ার কথা শোনা যায় না। কারণ কি এই যে আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আমাদের আর নতুন করে সহনশীলতাচর্চার প্রয়োজন নেই? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। বিরোধী দলকে নির্বাচনে না আসতে যা যা করার তা করি বিপুল আনন্দে। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই মারামারি, খুনোখুনি হচ্ছে।
অবশ্য যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থা হয়নি। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায় বললে বলতে হয়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়, সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, আরও ছোট করে বললে এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?
স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না—এমনতর সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না—সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা, জঙ্গিবাদের জন্ম।
আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, আমার বিশ্বাসই চরম সত্য—এমন অন্ধত্ব দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি করছে। আমার সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে, আমার কথা সবাইকে মেনে চলতে হবে, না হলেই গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়ার চিন্তা পৃথিবীকে শক্তিমত্তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্যের সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেওয়ার মনোভাবকে এখন একধরনের দুর্বলের চিত্তবিকার বলে উপহাস করা হয়। পৃথিবী নাকি শক্তের ভক্ত, নরমের যম! তাই শক্তিচর্চার অবাধ আয়োজন বিকারগ্রস্ত এক সময়ের মধ্যে এনে ফেলেছে মানবসভ্যতাকে।
যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। অন্যের বিশ্বাস, অধিকার, মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। নিয়ম মানায় অভ্যস্ত হতে হবে। একে অপরের বোকামি বা পাকামিকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঔদার্য শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি। ধর্ম রক্ষার জন্য ছুরি হাতে, বন্দুক হাতে না ছুটে সৌহার্দ্যের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা।
শেষ করি জালালউদ্দিন রুমিকে উদ্ধৃত করে: ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা
বিভুরঞ্জন সরকার

পৃথিবীতে যে কত কারণে কত দিবসের জন্ম হয়েছে, তার সবগুলো সম্পর্কে এখনো হয়তো অনেকেরই জানা হয়নি। সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে আমাদের এমন সব দিবস সম্পর্কেও জানতে হয়, যা না জানলে অন্যদের তেমন কোনো লাভ-লোকসান আছে বলে মনে হয় না। তবে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের কথা আলাদা। এই দিবস নানা কারণে মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা বুঝি বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে, নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণ আছে, তা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। তবে নানা বিষয়েই যে আমরা মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছি, সেটা তো কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমরা কেউ আর পরের কথা শুনতে চাই না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চাই। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা, অসহনশীলতা।
সম্ভবত এ জন্যই প্রতিবছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতিবছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।
‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’
ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কর্মসূচি নেওয়ার কথা শোনা যায় না। কারণ কি এই যে আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আমাদের আর নতুন করে সহনশীলতাচর্চার প্রয়োজন নেই? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। বিরোধী দলকে নির্বাচনে না আসতে যা যা করার তা করি বিপুল আনন্দে। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই মারামারি, খুনোখুনি হচ্ছে।
অবশ্য যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থা হয়নি। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায় বললে বলতে হয়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়, সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, আরও ছোট করে বললে এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?
স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না—এমনতর সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না—সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা, জঙ্গিবাদের জন্ম।
আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, আমার বিশ্বাসই চরম সত্য—এমন অন্ধত্ব দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি করছে। আমার সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে, আমার কথা সবাইকে মেনে চলতে হবে, না হলেই গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়ার চিন্তা পৃথিবীকে শক্তিমত্তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্যের সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেওয়ার মনোভাবকে এখন একধরনের দুর্বলের চিত্তবিকার বলে উপহাস করা হয়। পৃথিবী নাকি শক্তের ভক্ত, নরমের যম! তাই শক্তিচর্চার অবাধ আয়োজন বিকারগ্রস্ত এক সময়ের মধ্যে এনে ফেলেছে মানবসভ্যতাকে।
যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। অন্যের বিশ্বাস, অধিকার, মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। নিয়ম মানায় অভ্যস্ত হতে হবে। একে অপরের বোকামি বা পাকামিকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঔদার্য শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি। ধর্ম রক্ষার জন্য ছুরি হাতে, বন্দুক হাতে না ছুটে সৌহার্দ্যের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা।
শেষ করি জালালউদ্দিন রুমিকে উদ্ধৃত করে: ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

পৃথিবীতে যে কত কারণে কত দিবসের জন্ম হয়েছে, তার সবগুলো সম্পর্কে এখনো হয়তো অনেকেরই জানা হয়নি। সংবাদপত্রে কাজ করার কারণে আমাদের এমন সব দিবস সম্পর্কেও জানতে হয়, যা না জানলে অন্যদের তেমন কোনো লাভ-লোকসান আছে বলে মনে হয় না। তবে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের কথা আলাদা। এই দিবস নানা কারণে মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা বুঝি বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে, নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণ আছে, তা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। তবে নানা বিষয়েই যে আমরা মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছি, সেটা তো কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমরা কেউ আর পরের কথা শুনতে চাই না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চাই। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা, অসহনশীলতা।
সম্ভবত এ জন্যই প্রতিবছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতিবছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।
‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’
ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কর্মসূচি নেওয়ার কথা শোনা যায় না। কারণ কি এই যে আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আমাদের আর নতুন করে সহনশীলতাচর্চার প্রয়োজন নেই? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। বিরোধী দলকে নির্বাচনে না আসতে যা যা করার তা করি বিপুল আনন্দে। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই মারামারি, খুনোখুনি হচ্ছে।
অবশ্য যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থা হয়নি। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায় বললে বলতে হয়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়, সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, আরও ছোট করে বললে এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?
স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না—এমনতর সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না—সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা, জঙ্গিবাদের জন্ম।
আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, আমার বিশ্বাসই চরম সত্য—এমন অন্ধত্ব দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি করছে। আমার সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে, আমার কথা সবাইকে মেনে চলতে হবে, না হলেই গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়ার চিন্তা পৃথিবীকে শক্তিমত্তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্যের সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেওয়ার মনোভাবকে এখন একধরনের দুর্বলের চিত্তবিকার বলে উপহাস করা হয়। পৃথিবী নাকি শক্তের ভক্ত, নরমের যম! তাই শক্তিচর্চার অবাধ আয়োজন বিকারগ্রস্ত এক সময়ের মধ্যে এনে ফেলেছে মানবসভ্যতাকে।
যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। অন্যের বিশ্বাস, অধিকার, মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। নিয়ম মানায় অভ্যস্ত হতে হবে। একে অপরের বোকামি বা পাকামিকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঔদার্য শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি। ধর্ম রক্ষার জন্য ছুরি হাতে, বন্দুক হাতে না ছুটে সৌহার্দ্যের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর এর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা।
শেষ করি জালালউদ্দিন রুমিকে উদ্ধৃত করে: ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে...
১ দিন আগে
দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
১ দিন আগে
আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন...
১ দিন আগে
সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী।
১ দিন আগেচিররঞ্জন সরকার

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের অবিরাম হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে আপসহীন ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই রাষ্ট্রটির প্রতি সমর্থনের কখনোই খুব একটা ঘাটতি হয়নি।
ইরানে এর আগেও বহুবার আন্দোলন হয়েছে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পর সংঘটিত আন্দোলনের কথা। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী, হিজাব না পরার অভিযোগে ইরান সরকারের ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ গাইডেন্স পেট্রল মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং পুলিশি হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর ঘটনায় ইরানজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এই প্রতিবাদ একসময় নারী স্বাধীনতার দাবি ছাড়িয়ে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজপথে নারীদের প্রকাশ্যে হিজাব খুলে প্রতিবাদ করা ইরানে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় এনে দেয়। যদিও রাষ্ট্র কঠোর দমনপীড়ন চালায়, এই আন্দোলন ইরানি সমাজে ভয়ের দেয়াল ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবারের আন্দোলনটিকে তারই ধারাবাহিকতা বলা যায়। তবে এবার যেন ইরানের সাধারণ মানুষের পা ফাটা বাঁশের চিপায় আটকে গেছে। তারা পড়েছে দ্বিমুখী এক গভীর সংকটে। একদিকে প্রায় ৪৪ বছর ধরে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকা খোমেনির উত্তরাধিকারী শাসনের সীমাহীন দুর্নীতি, নৈতিকতা পুলিশের দৌরাত্ম্য, নারীদের ওপর সামাজিক ও পোশাকগত বিধিনিষেধ, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি এবং লাগামছাড়া জিনিসপত্রের দামে জনজীবনের নাভিশ্বাস। অন্যদিকে এই শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খোপে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা—যা বহু ইরানির কাছেই সমান আতঙ্কের।
তবু এই সব দ্বিধা সত্ত্বেও ইরানের মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আজ ইরান জ্বলছে। বিক্ষোভের আগুন রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের আন্দোলনে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ইতিহাস বলছে, ইরানে শাসন বদল কখনোই সহজ হয়নি। ১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তাঁকে সরাতে ইরানিদের লেগেছিল প্রায় ৫৫ বছর। সেই পাহলভির পতনের পর যে খোমেনি শাসন কায়েম হলো, তার সূচনালগ্নে ইরানিদের দেখানো হয়েছিল এক ভিন্ন স্বপ্ন—ইসলামি মূল্যবোধে গড়া এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ফলে চার দশকের বেশি সময় পর আজ সেই খোমেনির উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার পতন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছে।
তবে ইরানের ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো—প্রতিটি অভ্যুত্থানের জন্য মানুষকে প্রায় অর্ধশতাব্দী বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, আর প্রতিবারই পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা পথে নেমেছে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই পুরোপুরি ধরা দেয়নি। সামনের দিনে ইরানিদের ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেন, খামেনি শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যে আরও গভীরভাবে আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যে প্রতিরোধী বলয় রয়েছে, সেটিও কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানের মুক্তিকামী মানুষ চলমান লড়াইয়ে জয়ী হলেও প্রকৃত মুক্তি আদৌ মিলবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হওয়ার আশঙ্কা তাদের সামনে হাতছানি দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
আজ ইরান এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের শাসন-সংকট এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদারদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই বাজার বা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ছাড়িয়ে একটি সার্বিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। দ্রুত অবমূল্যায়িত রিয়াল, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার ফাটল—সব মিলিয়েই এই বিস্ফোরণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অভিঘাত। যুদ্ধ রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা কমাতে পারেনি; বরং নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি আয়ের সংকোচন এবং মুদ্রার আরও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যে যুদ্ধ সাময়িকভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়েছিল, যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় সেটিই আন্দোলনের জন্য উর্বর জমি তৈরি করেছে।
আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর ভাষাও ক্রমেই আরও হুমকিমূলক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের নিরাপত্তা ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে—বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে কঠোরতম শাস্তি, দ্রুত বিচার এবং ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক দমন করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের গুজব ইরানজুড়ে নতুন এক আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ইরানিই আশঙ্কা করছেন, অভ্যন্তরীণ আন্দোলনকে অজুহাত করে যদি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বা সীমিত হামলা হয়, তাহলে তার ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। ফলে রাজপথে ক্ষোভ ও সাহস যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘরে ঘরে জমছে অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধভীতির চাপ—যা এই আন্দোলনকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই আন্দোলনের প্রাথমিক চালিকাশক্তি ছিল অর্থনীতি। রিয়ালের মূল্য ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ‘জীবনের ব্যয় কমাও’ ধরনের স্লোগান রূপ নেয় সরাসরি শাসনবিরোধী দাবিতে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রাদেশিক শহর এমনকি সরকারি ভবনও হয়ে ওঠে ক্ষোভের কেন্দ্র। আন্দোলন ঠেকাতে রাষ্ট্র ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও ব্ল্যাকআউটের পথ বেছে নেয়—যা একদিকে আন্দোলনের সংগঠন দুর্বল করলেও, অন্যদিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সংকটে একধরনের দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছেন। শুরুতে সংলাপ, সহানুভূতি ও সীমিত ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা বেড়েছে। একদিকে সংযমের ভাষা, অন্যদিকে ‘বহিরাগত শত্রুর ষড়যন্ত্র’—এই পরিচিত বয়ান আবারও সামনে এসেছে। বাস্তবতা হলো, এই আন্দোলন মূলত ঘরোয়া সংকটের ফল; কিন্তু আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুযোগসন্ধানী অবস্থান আন্দোলনকারীদের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বাড়ালেও, একই সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর দমননীতিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। ওয়াশিংটন থেকে আসা হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত ইরানের ভেতরে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনে দেয়, আর তেহরানও পাল্টা হুমকির ভাষায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এই ভূরাজনৈতিক নাটক আন্দোলনের আসল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।
যদিও প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আন্দোলন কি নিকট ভবিষ্যতে শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বহুস্তর কাঠামো এখনো শক্তভাবেই টিকে আছে; অন্তত এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। স্বল্প মেয়াদে রাষ্ট্র হয়তো দমন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করবে, কিন্তু এর বিনিময়ে রাজনৈতিক বৈধতা আরও ক্ষয় হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই জমে থাকা ক্ষোভ দমন দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়।
ইরানের বর্তমান আন্দোলন মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক বৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ; তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকেন্দ্রিক চলমান ভূরাজনৈতিক চাপ একে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ক্রমাগত মুদ্রার মান কমে যাওয়া, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কাজের সংকট এবং নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ মানুষকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ক্ষোভ আর ভয় একসঙ্গে জমাট বাঁধছে। এর বিস্ফোরণকে সম্ভবত মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে কিংবা গুলি করে মেরে থামানো যাবে না। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার দাবি মানুষের মৌলিক দাবি। কাজ নেই, খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, অথচ আছে প্রতিনিয়ত চোখরাঙানি। কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যযুক্ত একটি দেশের মানুষকে বছরের পর বছর ধরে দমনপীড়ন করে আর জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা সম্ভব নয়; কোনো না কোনো চেহারায় এই অসন্তোষ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের অবিরাম হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে আপসহীন ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এই রাষ্ট্রটির প্রতি সমর্থনের কখনোই খুব একটা ঘাটতি হয়নি।
ইরানে এর আগেও বহুবার আন্দোলন হয়েছে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুর পর সংঘটিত আন্দোলনের কথা। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী, হিজাব না পরার অভিযোগে ইরান সরকারের ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ গাইডেন্স পেট্রল মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁকে প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং পুলিশি হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর ঘটনায় ইরানজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এই প্রতিবাদ একসময় নারী স্বাধীনতার দাবি ছাড়িয়ে সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজপথে নারীদের প্রকাশ্যে হিজাব খুলে প্রতিবাদ করা ইরানে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় এনে দেয়। যদিও রাষ্ট্র কঠোর দমনপীড়ন চালায়, এই আন্দোলন ইরানি সমাজে ভয়ের দেয়াল ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবারের আন্দোলনটিকে তারই ধারাবাহিকতা বলা যায়। তবে এবার যেন ইরানের সাধারণ মানুষের পা ফাটা বাঁশের চিপায় আটকে গেছে। তারা পড়েছে দ্বিমুখী এক গভীর সংকটে। একদিকে প্রায় ৪৪ বছর ধরে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকা খোমেনির উত্তরাধিকারী শাসনের সীমাহীন দুর্নীতি, নৈতিকতা পুলিশের দৌরাত্ম্য, নারীদের ওপর সামাজিক ও পোশাকগত বিধিনিষেধ, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি এবং লাগামছাড়া জিনিসপত্রের দামে জনজীবনের নাভিশ্বাস। অন্যদিকে এই শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খোপে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা—যা বহু ইরানির কাছেই সমান আতঙ্কের।
তবু এই সব দ্বিধা সত্ত্বেও ইরানের মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই আজ ইরান জ্বলছে। বিক্ষোভের আগুন রাজধানী তেহরান ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের আন্দোলনে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ইতিহাস বলছে, ইরানে শাসন বদল কখনোই সহজ হয়নি। ১৯২৫ সালে কাজার রাজবংশকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তাঁকে সরাতে ইরানিদের লেগেছিল প্রায় ৫৫ বছর। সেই পাহলভির পতনের পর যে খোমেনি শাসন কায়েম হলো, তার সূচনালগ্নে ইরানিদের দেখানো হয়েছিল এক ভিন্ন স্বপ্ন—ইসলামি মূল্যবোধে গড়া এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে। বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ফলে চার দশকের বেশি সময় পর আজ সেই খোমেনির উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার পতন সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছে।
তবে ইরানের ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো—প্রতিটি অভ্যুত্থানের জন্য মানুষকে প্রায় অর্ধশতাব্দী বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, আর প্রতিবারই পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তারা পথে নেমেছে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই পুরোপুরি ধরা দেয়নি। সামনের দিনে ইরানিদের ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেন, খামেনি শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যে আরও গভীরভাবে আমেরিকা-ইসরায়েল জোটের প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যে প্রতিরোধী বলয় রয়েছে, সেটিও কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানের মুক্তিকামী মানুষ চলমান লড়াইয়ে জয়ী হলেও প্রকৃত মুক্তি আদৌ মিলবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের হাতের পুতুল হওয়ার আশঙ্কা তাদের সামনে হাতছানি দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
আজ ইরান এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের শাসন-সংকট এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদারদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই বাজার বা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ছাড়িয়ে একটি সার্বিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। দ্রুত অবমূল্যায়িত রিয়াল, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার ফাটল—সব মিলিয়েই এই বিস্ফোরণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের অভিঘাত। যুদ্ধ রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা কমাতে পারেনি; বরং নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি আয়ের সংকোচন এবং মুদ্রার আরও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যে যুদ্ধ সাময়িকভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়েছিল, যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় সেটিই আন্দোলনের জন্য উর্বর জমি তৈরি করেছে।
আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর ভাষাও ক্রমেই আরও হুমকিমূলক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের নিরাপত্তা ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে—বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে কঠোরতম শাস্তি, দ্রুত বিচার এবং ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক দমন করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের গুজব ইরানজুড়ে নতুন এক আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ইরানিই আশঙ্কা করছেন, অভ্যন্তরীণ আন্দোলনকে অজুহাত করে যদি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বা সীমিত হামলা হয়, তাহলে তার ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। ফলে রাজপথে ক্ষোভ ও সাহস যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘরে ঘরে জমছে অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধভীতির চাপ—যা এই আন্দোলনকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই আন্দোলনের প্রাথমিক চালিকাশক্তি ছিল অর্থনীতি। রিয়ালের মূল্য ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ‘জীবনের ব্যয় কমাও’ ধরনের স্লোগান রূপ নেয় সরাসরি শাসনবিরোধী দাবিতে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রাদেশিক শহর এমনকি সরকারি ভবনও হয়ে ওঠে ক্ষোভের কেন্দ্র। আন্দোলন ঠেকাতে রাষ্ট্র ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও ব্ল্যাকআউটের পথ বেছে নেয়—যা একদিকে আন্দোলনের সংগঠন দুর্বল করলেও, অন্যদিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সংকটে একধরনের দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছেন। শুরুতে সংলাপ, সহানুভূতি ও সীমিত ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি থাকলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা বেড়েছে। একদিকে সংযমের ভাষা, অন্যদিকে ‘বহিরাগত শত্রুর ষড়যন্ত্র’—এই পরিচিত বয়ান আবারও সামনে এসেছে। বাস্তবতা হলো, এই আন্দোলন মূলত ঘরোয়া সংকটের ফল; কিন্তু আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুযোগসন্ধানী অবস্থান আন্দোলনকারীদের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বাড়ালেও, একই সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর দমননীতিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। ওয়াশিংটন থেকে আসা হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত ইরানের ভেতরে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনে দেয়, আর তেহরানও পাল্টা হুমকির ভাষায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এই ভূরাজনৈতিক নাটক আন্দোলনের আসল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।
যদিও প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আন্দোলন কি নিকট ভবিষ্যতে শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বহুস্তর কাঠামো এখনো শক্তভাবেই টিকে আছে; অন্তত এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। স্বল্প মেয়াদে রাষ্ট্র হয়তো দমন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করবে, কিন্তু এর বিনিময়ে রাজনৈতিক বৈধতা আরও ক্ষয় হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই জমে থাকা ক্ষোভ দমন দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়।
ইরানের বর্তমান আন্দোলন মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভাঙন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক বৈষম্যেরই বহিঃপ্রকাশ; তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকেন্দ্রিক চলমান ভূরাজনৈতিক চাপ একে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ক্রমাগত মুদ্রার মান কমে যাওয়া, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, কাজের সংকট এবং নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ মানুষকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ক্ষোভ আর ভয় একসঙ্গে জমাট বাঁধছে। এর বিস্ফোরণকে সম্ভবত মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়ে কিংবা গুলি করে মেরে থামানো যাবে না। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার দাবি মানুষের মৌলিক দাবি। কাজ নেই, খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, অথচ আছে প্রতিনিয়ত চোখরাঙানি। কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যযুক্ত একটি দেশের মানুষকে বছরের পর বছর ধরে দমনপীড়ন করে আর জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা সম্ভব নয়; কোনো না কোনো চেহারায় এই অসন্তোষ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না।
১৬ নভেম্বর ২০২১
দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
১ দিন আগে
আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন...
১ দিন আগে
সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী।
১ দিন আগেমো. শাহিন আলম

দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বোঝার জন্য গ্র্যান্ড বাজারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে এ বাজারটি ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক স্তম্ভ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও এই ব্যবসায়ী শ্রেণি ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। সেই বাজার যখন আজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষোভ নয়; এটি শাসকগোষ্ঠীর সামাজিক সমর্থনভিত্তি ভেঙে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
তবে এই বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ধস। মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানি রিয়ালের মান ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দাম এক বছরে ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই সংকটের জন্য দায় কোথায়? এটি কি কেবল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্ভূত, নাকি অভ্যন্তরীণ শাসন ও নীতি দুর্বলতার ফল? বাস্তবতা হলো, উভয় কারণেই হয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবে, ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশটির অর্থনীতি কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষত খোমেনি মতাদর্শের ভিত্তিতে, সিদ্ধান্ত নেয় যে এই বিপ্লব কেবল ইরানের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই বিপ্লবী আদর্শ রপ্তানি নীতির মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সমর্থন এবং বিভিন্ন দেশে শিয়া রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী সংগঠিত করার পথে এগোয়। এভাবেই আদর্শগত লড়াই ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলে রূপ নেয়। যে কৌশলের বিস্তৃত রূপ হলো তেহরানের তথাকথিত স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ। যার মূল ধারণা হলো, ইরানের যুদ্ধ নিজস্ব সীমান্তে নয়, বরং সীমান্তের বাইরে পরিচালিত হবে। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় আসাদ সরকার, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং ফিলিস্তিনে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে। ফলে ইরানের প্রভাববলয় বিস্তৃত হলেও দায়ভার বাড়তে থাকে বহুগুণে।
এই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল্য দিতে গিয়ে ইরানের অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। এসব গোষ্ঠী ও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, বেতন, লজিস্টিক সহায়তা ও পুনর্গঠনে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়, যা আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট, তেল আয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জনগণের কর থেকে। ফলে যে অর্থ দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা ব্যয় হচ্ছে বাইরের যুদ্ধ ও প্রক্সি রাজনীতিতে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয়, রিয়ালের মান পড়ে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। উপরন্তু, এই আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইরানের ওপর কঠোর ব্যাংকিং ও তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় সাধারণ ইরানি নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগে, তেহরানে যখন চাকরি নেই, জীবনযাপন কঠিন, তখন তাদের অর্থ কেন লেবানন বা সিরিয়ার যুদ্ধে ব্যয় হবে? এই ক্ষোভ থেকেই ব্যবসায়ী ধর্মঘট, শ্রমিক বিক্ষোভ, ছাত্র আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান সরকারবিরোধী স্লোগান দেখা যাচ্ছে। এককথায়, আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ইরান স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ অর্জন করলেও এর ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তিও বাস্তবে ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। কারণ, এই অংশীদারত্বগুলো নিষেধাজ্ঞা ভাঙার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি; বরং ইরান ধীরে ধীরে কাঁচামাল সরবরাহকারী ও স্বল্পমূল্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের পর সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া এবং নতুন সরকার কর্তৃক ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করেছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। একদিকে শীর্ষ নেতা স্বীকার করছেন যে নীতিগত ব্যর্থতাই সংকটের মূল, অন্যদিকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র দাবি করছে। এ দ্বৈত নীতি রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং বিক্ষোভকে আরও তীব্র করছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব কমেছে। সিরিয়া কর্তৃক ঋণ ফেরত না পাওয়া এবং প্রভাবশালী প্রক্সি গোষ্ঠীর দুর্বল অবস্থার কারণে ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাও সীমিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করছে।
এইসব পরিস্থিতি কি কেবল সরকারবিরোধী ক্ষোভ, নাকি প্রকৃত অর্থে রেজিম চেঞ্জের পূর্বাভাস? মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। কোথাও নিরাপত্তা বাহিনী শুরুতে নীরব থেকেছে, আবার কোথাও কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ, ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ফলে ক্ষোভ আরও গভীর হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একাধিক বার্তা দিয়েছে যে তারা ইরানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে মনিটর করছে এবং প্রয়োজন পড়লে সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি নজর রাখছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনা বা আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে।
ইরান নিজেও সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড স্পষ্টভাবে রেডলাইন নির্ধারণ করেছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ রেজিম পরিবর্তনের চেষ্টা বা শহর দখলকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে, ইরান এবং আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি সাধারণ ধর্মঘট এবং শহর দখলের আহ্বান দিয়ে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপই বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকেও ত্বরান্বিত করছে।
সব মিলিয়ে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ একত্র হয়ে ইরানকে এক ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যদি শাসকগোষ্ঠী কাঠামোগত সংস্কারের দিকে না যায়, তবে রেজিম চেঞ্জের সম্ভাবনা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
লেখক: মো. শাহিন আলম শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বোঝার জন্য গ্র্যান্ড বাজারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে এ বাজারটি ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক স্তম্ভ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবেও এই ব্যবসায়ী শ্রেণি ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। সেই বাজার যখন আজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষোভ নয়; এটি শাসকগোষ্ঠীর সামাজিক সমর্থনভিত্তি ভেঙে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
তবে এই বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ধস। মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানি রিয়ালের মান ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দাম এক বছরে ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই সংকটের জন্য দায় কোথায়? এটি কি কেবল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্ভূত, নাকি অভ্যন্তরীণ শাসন ও নীতি দুর্বলতার ফল? বাস্তবতা হলো, উভয় কারণেই হয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবে, ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশটির অর্থনীতি কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষত খোমেনি মতাদর্শের ভিত্তিতে, সিদ্ধান্ত নেয় যে এই বিপ্লব কেবল ইরানের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই বিপ্লবী আদর্শ রপ্তানি নীতির মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সমর্থন এবং বিভিন্ন দেশে শিয়া রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী সংগঠিত করার পথে এগোয়। এভাবেই আদর্শগত লড়াই ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলে রূপ নেয়। যে কৌশলের বিস্তৃত রূপ হলো তেহরানের তথাকথিত স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ। যার মূল ধারণা হলো, ইরানের যুদ্ধ নিজস্ব সীমান্তে নয়, বরং সীমান্তের বাইরে পরিচালিত হবে। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় আসাদ সরকার, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী এবং ফিলিস্তিনে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে। ফলে ইরানের প্রভাববলয় বিস্তৃত হলেও দায়ভার বাড়তে থাকে বহুগুণে।
এই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল্য দিতে গিয়ে ইরানের অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। এসব গোষ্ঠী ও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, বেতন, লজিস্টিক সহায়তা ও পুনর্গঠনে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়, যা আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট, তেল আয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জনগণের কর থেকে। ফলে যে অর্থ দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা ব্যয় হচ্ছে বাইরের যুদ্ধ ও প্রক্সি রাজনীতিতে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয়, রিয়ালের মান পড়ে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। উপরন্তু, এই আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইরানের ওপর কঠোর ব্যাংকিং ও তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় সাধারণ ইরানি নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগে, তেহরানে যখন চাকরি নেই, জীবনযাপন কঠিন, তখন তাদের অর্থ কেন লেবানন বা সিরিয়ার যুদ্ধে ব্যয় হবে? এই ক্ষোভ থেকেই ব্যবসায়ী ধর্মঘট, শ্রমিক বিক্ষোভ, ছাত্র আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান সরকারবিরোধী স্লোগান দেখা যাচ্ছে। এককথায়, আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ইরান স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ অর্জন করলেও এর ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তিও বাস্তবে ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। কারণ, এই অংশীদারত্বগুলো নিষেধাজ্ঞা ভাঙার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি; বরং ইরান ধীরে ধীরে কাঁচামাল সরবরাহকারী ও স্বল্পমূল্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের পর সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া এবং নতুন সরকার কর্তৃক ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট করেছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। একদিকে শীর্ষ নেতা স্বীকার করছেন যে নীতিগত ব্যর্থতাই সংকটের মূল, অন্যদিকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখনো বিদেশি ষড়যন্ত্র দাবি করছে। এ দ্বৈত নীতি রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং বিক্ষোভকে আরও তীব্র করছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব কমেছে। সিরিয়া কর্তৃক ঋণ ফেরত না পাওয়া এবং প্রভাবশালী প্রক্সি গোষ্ঠীর দুর্বল অবস্থার কারণে ইরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাও সীমিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করছে।
এইসব পরিস্থিতি কি কেবল সরকারবিরোধী ক্ষোভ, নাকি প্রকৃত অর্থে রেজিম চেঞ্জের পূর্বাভাস? মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। কোথাও নিরাপত্তা বাহিনী শুরুতে নীরব থেকেছে, আবার কোথাও কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ, ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ফলে ক্ষোভ আরও গভীর হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একাধিক বার্তা দিয়েছে যে তারা ইরানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে মনিটর করছে এবং প্রয়োজন পড়লে সামরিক বা কৌশলগত হস্তক্ষেপ করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি নজর রাখছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনা বা আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে।
ইরান নিজেও সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড স্পষ্টভাবে রেডলাইন নির্ধারণ করেছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ রেজিম পরিবর্তনের চেষ্টা বা শহর দখলকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে, ইরান এবং আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি সাধারণ ধর্মঘট এবং শহর দখলের আহ্বান দিয়ে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপই বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকেও ত্বরান্বিত করছে।
সব মিলিয়ে, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ একত্র হয়ে ইরানকে এক ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যদি শাসকগোষ্ঠী কাঠামোগত সংস্কারের দিকে না যায়, তবে রেজিম চেঞ্জের সম্ভাবনা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
লেখক: মো. শাহিন আলম শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না।
১৬ নভেম্বর ২০২১
এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে...
১ দিন আগে
আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন...
১ দিন আগে
সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী।
১ দিন আগেহাসান আলী

আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—অবহেলা, অপমান, একাকিত্ব ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব। এই মানসিক যন্ত্রণাই ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় চরম সিদ্ধান্তের দিকে।
প্রবীণেরা আত্মহত্যার জন্য যে পথগুলো বেছে নেন—ফাঁসি দেওয়া, বিষপান, নদীতে ঝাঁপ দেওয়া, উঁচু দালান থেকে লাফিয়ে পড়া, নিজের হাতে-মাথায় বা গায়ে গুলি করা, গায়ে আগুন দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজেকে আঘাত করা—এই সবই তাঁদের গভীর হতাশা ও অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ। এসব মৃত্যু শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, একটি পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধকেও শেষ করে দেয়।
প্রথম কারণ অবহেলা। সন্তানেরা বড় হয়ে আলাদা সংসার গড়েন, ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজের জীবন নিয়ে। বাবা-মা থেকে যান একাকী। একসময় যাঁরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, আজ তাঁরাই হয়ে যান বাড়তি বোঝা। দ্বিতীয় কারণ অপমান ও লাঞ্ছনা। কথা বলার ভঙ্গিতে, সিদ্ধান্তে অংশ নিতে না দেওয়ায়, কিংবা সামান্য ভুলে তিরস্কারে প্রবীণের আত্মসম্মান ভেঙে যায়। তৃতীয় কারণ অর্থনৈতিক সংকট। ঋণগ্রস্ত হওয়া, পেনশন বা আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারা—এসব প্রবীণকে অসহায় করে তোলে। চতুর্থ কারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ব্যথা, স্মৃতিভ্রংশ, অক্ষমতা—এসব শুধু শরীর নয়, মনকেও ভেঙে দেয়। এই সবকিছুর সমষ্টিতে প্রবীণের মনে জন্ম নেয় একটি ভয়াবহ ভাবনা—‘আমাকে আর কারও দরকার নেই।’
প্রতিরোধে করণীয় কী?
১. পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রবীণদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় পরিবার। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, কথা বলা, সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এই ছোট ছোট বিষয়ই জীবনের বড় অর্থ তৈরি করে। একটি স্নেহের কথা, একটি আলিঙ্গন অনেক সময় ওষুধের থেকেও বেশি কাজ করে।
২. আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ভাতা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করতে হবে। পরিবারকেও নিশ্চিত করতে হবে যে প্রবীণ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য অর্থ নিয়ে চিন্তিত না থাকেন।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে হবে। প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা জরুরি। বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার চিন্তা কোনো লজ্জার বিষয় নয়—এটা চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।
৪. সমাজভিত্তিক সহায়তা গড়ে তুলতে হবে। মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রবীণদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে পারে। সামাজিক সংযোগ আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
৫. আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। প্রবীণদের অবহেলা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবারে নির্যাতন হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. প্রবীণদের অর্থবহ কাজে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা সমাজের সম্পদ। স্বেচ্ছাসেবা, গল্প বলা, শিক্ষা দেওয়া, ধর্মীয় বা সামাজিক কাজে যুক্ত থাকলে জীবনের অর্থ ফিরে আসে।
প্রবীণদের আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজের ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যদি সময়মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াই, ভালোবাসা ও মর্যাদা দিই, তাহলে অনেক অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব। একজন প্রবীণ বাঁচলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি প্রজন্ম বাঁচে। আসুন, আমরা সেই প্রজন্মকে বাঁচাতে দায়বদ্ধ হই।
হাসান আলী, প্রবীণবিষয়ক সংগঠক ও লেখক

আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—অবহেলা, অপমান, একাকিত্ব ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব। এই মানসিক যন্ত্রণাই ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় চরম সিদ্ধান্তের দিকে।
প্রবীণেরা আত্মহত্যার জন্য যে পথগুলো বেছে নেন—ফাঁসি দেওয়া, বিষপান, নদীতে ঝাঁপ দেওয়া, উঁচু দালান থেকে লাফিয়ে পড়া, নিজের হাতে-মাথায় বা গায়ে গুলি করা, গায়ে আগুন দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজেকে আঘাত করা—এই সবই তাঁদের গভীর হতাশা ও অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ। এসব মৃত্যু শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, একটি পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধকেও শেষ করে দেয়।
প্রথম কারণ অবহেলা। সন্তানেরা বড় হয়ে আলাদা সংসার গড়েন, ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজের জীবন নিয়ে। বাবা-মা থেকে যান একাকী। একসময় যাঁরা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, আজ তাঁরাই হয়ে যান বাড়তি বোঝা। দ্বিতীয় কারণ অপমান ও লাঞ্ছনা। কথা বলার ভঙ্গিতে, সিদ্ধান্তে অংশ নিতে না দেওয়ায়, কিংবা সামান্য ভুলে তিরস্কারে প্রবীণের আত্মসম্মান ভেঙে যায়। তৃতীয় কারণ অর্থনৈতিক সংকট। ঋণগ্রস্ত হওয়া, পেনশন বা আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারা—এসব প্রবীণকে অসহায় করে তোলে। চতুর্থ কারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ব্যথা, স্মৃতিভ্রংশ, অক্ষমতা—এসব শুধু শরীর নয়, মনকেও ভেঙে দেয়। এই সবকিছুর সমষ্টিতে প্রবীণের মনে জন্ম নেয় একটি ভয়াবহ ভাবনা—‘আমাকে আর কারও দরকার নেই।’
প্রতিরোধে করণীয় কী?
১. পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রবীণদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় পরিবার। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, কথা বলা, সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এই ছোট ছোট বিষয়ই জীবনের বড় অর্থ তৈরি করে। একটি স্নেহের কথা, একটি আলিঙ্গন অনেক সময় ওষুধের থেকেও বেশি কাজ করে।
২. আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ভাতা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করতে হবে। পরিবারকেও নিশ্চিত করতে হবে যে প্রবীণ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য অর্থ নিয়ে চিন্তিত না থাকেন।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে হবে। প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা জরুরি। বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার চিন্তা কোনো লজ্জার বিষয় নয়—এটা চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।
৪. সমাজভিত্তিক সহায়তা গড়ে তুলতে হবে। মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার ও স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রবীণদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে পারে। সামাজিক সংযোগ আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
৫. আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। প্রবীণদের অবহেলা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবারে নির্যাতন হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. প্রবীণদের অর্থবহ কাজে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা সমাজের সম্পদ। স্বেচ্ছাসেবা, গল্প বলা, শিক্ষা দেওয়া, ধর্মীয় বা সামাজিক কাজে যুক্ত থাকলে জীবনের অর্থ ফিরে আসে।
প্রবীণদের আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজের ব্যর্থতার প্রতিফলন। আমরা যদি সময়মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াই, ভালোবাসা ও মর্যাদা দিই, তাহলে অনেক অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব। একজন প্রবীণ বাঁচলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি প্রজন্ম বাঁচে। আসুন, আমরা সেই প্রজন্মকে বাঁচাতে দায়বদ্ধ হই।
হাসান আলী, প্রবীণবিষয়ক সংগঠক ও লেখক

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না।
১৬ নভেম্বর ২০২১
এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে...
১ দিন আগে
দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
১ দিন আগে
সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী।
১ দিন আগেসম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী। স্থানীয়ভাবে ‘সুপার ফাইভ বাহিনী’ নামে পরিচিত এই দলটির আরও একটি নাম ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। কেননা, অভিযুক্ত গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
১২ জানুয়ারি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, খালিয়াজুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুর রউফ স্বাধীন, সহসভাপতি ইদ্রিছ আলী মোল্লা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুজ্জামান তরু, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা জিয়া উদ্দিন এবং চাকুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলকাছ মিয়া সুপার ফাইভ বাহিনীর সদস্য। তাঁদের বিরুদ্ধে উপজেলার লেপসিয়া বাজার থেকে কোটি টাকা চাঁদাবাজি ও জলমহাল দখল করে লুটপাটের অভিযোগ এনে ৭ জানুয়ারি তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগকারীদের মধ্যে আবার রয়েছেন বিএনপিরই দুই সক্রিয় সদস্য—মো. আক্তারুজ্জামান চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর আলম খান।
অভিযুক্ত গ্রুপটি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জলমহাল, ফিশারি, বাজার ইজারা, টেন্ডার (পিআইসি), এমনকি প্ৰশাসনিক দপ্তরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলছে। তারা লেপসিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে এবং উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ঘিরেও চাঁদাবাজি করছে বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগপত্র কি তারেক রহমান হাতে পেয়েছেন? পেলে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটাও দেখার বিষয়।
মো. আব্দুর রউফ স্বাধীন এই চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণকাণ্ডের ব্যাপারে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তিও মাথা পেতে নেবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তদন্ত তো এখনো শুরুই হলো না। জেলা বিএনপির সভাপতি চিকিৎসক অধ্যাপক আনোয়ারুল হকও এই অভিযোগের ব্যাপারে কিছু জানেন না। কেন্দ্র থেকে তাঁকে কিছু জানালে তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
অভিযোগকারীরা প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠি কবে নাগাদ তারেক রহমানের হাতে পৌঁছাবে, তিনি তা খুলে পড়ার সুযোগ পাবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে অভিযুক্তরা নিজেদের আখের গুছিয়ে ফেলার বেশ সময় পেয়ে যেতে পারেন, যদি তাঁরা সত্যিই অপরাধী হয়ে থাকেন।
নিজেদের ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি না হলে যেকোনো রাজনৈতিক দলকেই ভোটের মাঠে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। চাঁদাবাজি সেই কাজটা আরও সহজ করে দেয়। নির্বাচন যখন দোরগোড়ায়, ঠিক তখনো বিএনপির দলীয় ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ চাঁদাবাজি আর নিয়ন্ত্রণের ব্যবসা করে যাবে—এটা নিশ্চয়ই দল প্রশ্রয় দেবে না। বিএনপি ‘সুপার’ একটি সিদ্ধান্ত নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী। স্থানীয়ভাবে ‘সুপার ফাইভ বাহিনী’ নামে পরিচিত এই দলটির আরও একটি নাম ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। কেননা, অভিযুক্ত গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
১২ জানুয়ারি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, খালিয়াজুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুর রউফ স্বাধীন, সহসভাপতি ইদ্রিছ আলী মোল্লা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুজ্জামান তরু, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা জিয়া উদ্দিন এবং চাকুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলকাছ মিয়া সুপার ফাইভ বাহিনীর সদস্য। তাঁদের বিরুদ্ধে উপজেলার লেপসিয়া বাজার থেকে কোটি টাকা চাঁদাবাজি ও জলমহাল দখল করে লুটপাটের অভিযোগ এনে ৭ জানুয়ারি তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগকারীদের মধ্যে আবার রয়েছেন বিএনপিরই দুই সক্রিয় সদস্য—মো. আক্তারুজ্জামান চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর আলম খান।
অভিযুক্ত গ্রুপটি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জলমহাল, ফিশারি, বাজার ইজারা, টেন্ডার (পিআইসি), এমনকি প্ৰশাসনিক দপ্তরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলছে। তারা লেপসিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে এবং উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ঘিরেও চাঁদাবাজি করছে বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগপত্র কি তারেক রহমান হাতে পেয়েছেন? পেলে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটাও দেখার বিষয়।
মো. আব্দুর রউফ স্বাধীন এই চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণকাণ্ডের ব্যাপারে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তিও মাথা পেতে নেবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তদন্ত তো এখনো শুরুই হলো না। জেলা বিএনপির সভাপতি চিকিৎসক অধ্যাপক আনোয়ারুল হকও এই অভিযোগের ব্যাপারে কিছু জানেন না। কেন্দ্র থেকে তাঁকে কিছু জানালে তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
অভিযোগকারীরা প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠি কবে নাগাদ তারেক রহমানের হাতে পৌঁছাবে, তিনি তা খুলে পড়ার সুযোগ পাবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে অভিযুক্তরা নিজেদের আখের গুছিয়ে ফেলার বেশ সময় পেয়ে যেতে পারেন, যদি তাঁরা সত্যিই অপরাধী হয়ে থাকেন।
নিজেদের ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি না হলে যেকোনো রাজনৈতিক দলকেই ভোটের মাঠে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। চাঁদাবাজি সেই কাজটা আরও সহজ করে দেয়। নির্বাচন যখন দোরগোড়ায়, ঠিক তখনো বিএনপির দলীয় ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ চাঁদাবাজি আর নিয়ন্ত্রণের ব্যবসা করে যাবে—এটা নিশ্চয়ই দল প্রশ্রয় দেবে না। বিএনপি ‘সুপার’ একটি সিদ্ধান্ত নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না।
১৬ নভেম্বর ২০২১
এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে...
১ দিন আগে
দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
১ দিন আগে
আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন...
১ দিন আগে