Ajker Patrika

সর্বক্ষেত্রে জাগরণ দরকার

মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ১৩: ১৪
সর্বক্ষেত্রে জাগরণ দরকার
হামের টিকার অভাবে এতগুলো অবুঝ শিশুমৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই বর্তায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আমরা কি বারবার এইসব লোককে দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করব? যদিও মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর কোনো শাসকই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। নানা ধরনের দুর্বলতার কারণে তাঁরা রাষ্ট্র শাসনে অক্ষম হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এত বড় ভারতবর্ষ রাষ্ট্রটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

সম্প্রতি ইউনিসেফের কান্ট্রি ডিরেক্টর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনি ২০২৪-২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১০ বার হামের টিকা বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং ৬ বার চিঠিও দিয়েছেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে। তাঁরা সবাই যেন এ বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকেন। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট হয়, বিষয়টি জটিল হয়ে পড়েছে, যখন ক্রয়ের প্রশ্ন এসেছে। পাঠক সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যটি বিশদভাবে পড়লে এই গড়িমসির দায় পরিষ্কার হবে সবার কাছে। অন্তর্বর্তী সরকার নানা চুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং আরও বেশি ব্যস্ত ছিলেন ক্ষমতায় কাকে বসাবে, সেটা নিয়েও। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ব্যস্ত ছিলেন তাঁর নিজের ব্যবসা নিয়ে। নিজের ৬০০ কোটি টাকা কর মওকুফ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি, জনশক্তি রপ্তানির বিষয় এবং নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করা নিয়ে।

এর মধ্যে মানুষ বাঁচল কি না, এটা নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা ছিল না। মব সৃষ্টি করে আক্রমণ করে মানুষ হত্যা, মাজারে আক্রমণ, মানুষকে বিড়ম্বিত করা, মানুষকে অপঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া—এসবই ছিল তাদের কাজ। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, এত দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্তমান সরকার হামের টিকার ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যিনি উপদেষ্টা ছিলেন তিনি যে স্বাস্থ্য বিষয়টা একেবারে বোঝেন না, সেটা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পররাষ্ট্র নীতিসমূহের ব্যাপারে দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্র কর্মকর্তা হয়েও কোনো কার্যকরী পথ দেখাতে পারেননি। সম্ভবত তিনিও বিভিন্ন গণবিরোধী চুক্তির ব্যাপারে খুব ব্যস্ত ছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, তাঁদের চিন্তাভাবনা আসলে কী ছিল? নির্বাচন ঠেকিয়ে, মব দিয়ে, জনগণকে ভয় দেখিয়ে একটা রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা? কিন্তু সেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁদের যে কোনো যোগ্যতা ছিল না, সেটাও তাঁরা প্রমাণ করেছেন তাঁদের তাবৎ কর্মকাণ্ড দিয়ে। তাঁরা কি ভেবেছিলেন সবকিছুই ধামাচাপা পড়ে যাবে? এর আগেও কয়েকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গেছে।

একমাত্র শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজটি সুন্দরভাবে সমাধান করতে পারেনি। কারণ, নানাভাবে তাদের মধ্যে ক্ষমতার উচ্চাশা দেখা দিয়েছিল। দেশের দুই প্রধান বিরোধী দল কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করেছে, আবার একটা পর্যায়ে এসে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও মেনে নিয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে দেশে কোনো নির্বাচন কমিশনই নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। তাই সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

ইউনূসের শাসনামলে যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, নারীরা মব দ্বারা অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে দ্রুত অবনতি হয়েছে, তার দায় কে নেবে? নুসরাত হত্যার দায় কে নেবে? সম্প্রতি পল্লবীতে এবং আরও কয়েক জায়গায় শিশুদের ধর্ষণ করে তাদেরকে হত্যা করা কোনো নিষ্ঠুর মানুষের পক্ষেই সম্ভব! এই মানুষগুলো কীভাবে তৈরি হলো? আজকে পল্লবীতে শিশু হত্যা একটা বড় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মানুষ পথে নেমেছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছে এবং জনগণ দ্রুত বিচার চাইছে। এর জন্য যে শুধু সরকারই দায়ী, সেটা ন্যায্য কথা নয়। কিন্তু সরকারের দায় হলো যে অতীতে এ রকম বড় ধরনের অপরাধের কোনো বিচার হয়নি। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারকে নানাভাবে প্রভাবিত করে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকির ফলে কখনো কখনো আসামিরা পার পেয়ে গেছে। এতে নাগরিক দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না। কারণ, এই ধর্ষকেরা আমাদের সমাজেরই মানুষ। যদিও এদেরকে মানুষ বলা ঠিক হবে না, অমানুষই বলা উচিত। এই অমানুষগুলো সমাজে কী করে বড় হয়ে উঠল কোন শিক্ষাব্যবস্থা, কোন সংস্কৃতিতে—এটাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ দেশে ধর্মীয় সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রবল। কিন্তু সেই সংস্কৃতির দাপট থাকার পরেও সমাজ থেকে দুর্নীতি রোধ করা যায়নি। এমনকি এসব নরপিশাচদেরও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সামনে কোরবানির ঈদ, অনেক শিশুর বাড়িতে প্রদীপ জ্বলবে না। একটি শিশুর জন্মের সময় মায়ের যে সংগ্রাম এবং সেই সঙ্গে অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনের মুখে যে হাসি থাকে, সেই হাসি আজ কান্নায় পরিণত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং এই ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে? সেইসব অযাচিত শাসকদের বিরুদ্ধে, যারা একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। মানুষের মধ্যে হয়তো কিছু স্বপ্ন আবর্তিত হয়েছে সেই আন্দোলনকে ঘিরে। কিন্তু আজকে তা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এ কারণে দেশের অনেক মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়েছে। আর মাত্র কয়েক দিন বাকি ঈদের। যেসব পরিবারে শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে, সেসব পরিবারে ঈদের খুশি থাকবে না, বরং আহাজারি ও অভিশাপ বজায় থাকবে।

পত্রিকায় দেখলাম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের খাবার মুখে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিয়েছেন। হাসপাতালগুলোও সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, যাঁরা হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাঁদের কাছে চিকিৎসকেরা অসহায়। খাবার যাঁরা সরবরাহ করেন, যাঁরা বেডকভার থেকে শুরু করে রোগীদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেখাশোনা করেন, তাঁরা একটা বড় ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। দেশে-বিদেশে বেশ কিছু হাসপাতালে গিয়ে তাদের চিকিৎসাসেবা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। বিদেশের সেসব হাসপাতালে এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। অনেক হাসপাতালে হয়তো খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, কিন্তু সেখানে একটি চমৎকার স্বাস্থ্যসম্মত ক্যানটিন রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেহেতু বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন, কাজেই তিনি নিশ্চয়ই নতুন কোনো পন্থা ভাববেন, যাতে এই সিন্ডিকেট ভাঙা যায়। কাজটা খুব সহজ নয়। কারণ, এর সঙ্গে ব্যাপক দুর্নীতির সংযোগ রয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতিকেরাও যুক্ত আছেন। তবে এ কথা সত্য, হামের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে এ দেশের কোনো রাজনীতিক যুক্ত নন। যুক্ত হচ্ছেন সেসব পূর্ব দিগন্ত থেকে আসা অশ্বারোহী, এনজিওর মালিক এবং কর্মকর্তারা। যার নেতৃত্বে একজন নোবেল বিজয়ী ছিলেন। হায়রে নোবেল! আলফ্রেড নোবেল যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি আত্মহত্যা করতেন। অবশ্য এটা সত্যি যে এটা তো আলফ্রেডের নোবেল পুরস্কার নয়, এটি অদ্ভুত ধরনের শান্তি পুরস্কার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি বারবার এইসব লোককে দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করব? যদিও মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর কোনো শাসকই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। নানা ধরনের দুর্বলতার কারণে তাঁরা রাষ্ট্র শাসনে অক্ষম হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এত বড় ভারতবর্ষ রাষ্ট্রটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি অদ্ভুত অসম চুক্তি করা হয়েছে, যা দেশ বিক্রির চেয়েও নিকৃষ্ট কাজ। এর বিরুদ্ধে তরুণসমাজ রুখে দাঁড়িয়েছে এবং দেশের অনেক দেশপ্রেমিক মানুষ এবং বিশেষ করে বামপন্থী দলগুলো এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে উত্থিত নিজেদের বাংলাদেশপন্থী দাবি করা দলটি এবং প্রধান বিরোধী দল এ বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। কয়েক দিন আগে একটা স্লোগান শুনলাম ‘ঢাকা না ওয়াশিংটন’। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, ‘দিল্লি না ঢাকা’। কোনোটাই আমাদের কাছে কাম্য নয়। দেশের সব মানুষই ঢাকাকেই চায়। তবে স্বাধীনতার পরে এই ৫৫ বছর পরেও এত দেশদ্রোহীর জন্ম হয়েছে, তার তুলনায় দেশপ্রেমিক জন্মের পথটা রোধ করে দেওয়া হচ্ছে। কাজেই সর্বক্ষেত্রে জাগরণ দরকার। হামের টিকার অভাবে এতগুলো অবুঝ শিশুমৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই বর্তায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এজেন্সির প্রতারণা: রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত ৩ বাংলাদেশি

আগামীকাল থেকেই বন্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়

যুবদল ও ছাত্রদলের ৮ নেতা-কর্মীর নামে মামলা দিয়ে ঝিনাইদহ ছাড়লেন পাটওয়ারী

পদত্যাগ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড

এআইয়ের নাম শুনেই খেপে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীরা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত