
পাবলিক পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের সঙ্গে শূন্য পাসের হার বা শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেলের বিষয়টিও সম্পর্কযুক্ত। যদিও অনেক বছর আগেই এর সূত্রপাত। শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিভিন্ন বোর্ডে বছর বছর কমে এলেও, ধারাবাহিকভাবে এক মন্দ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড। সেখানে যেন তা পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। হয়তো কেউ বিশ্বাস করবেন না, আর সহজে তা বিশ্বাস না করারই কথা।
কোনো কোনো শিক্ষা বোর্ডের ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেসবে কেবল ফল বিপর্যয় না বলে ‘মহাবিপর্যয়’ বললে বেশি বলা হবে না। আর ফল মহাবিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নানা কারণে দিনাজপুর বোর্ডের নামটি সবার আগে চলে আসে।
এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিবছর মাত্র একজন বা দুজন করে অংশ নিয়ে সবাই ফেল করে এবং এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান এক যুগ কিংবা এরও বেশি সময় পার করে চলছে। এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না এবং শিগগির এ পরিস্থিতির উন্নয়নেরও কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির নাম উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। রংপুর বিভাগের দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত, মূল ফটকে লেখা রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৮ সাল। অনুসন্ধান করে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ বছর আগে ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত করে নাম বদলিয়ে ‘উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ’ রাখা হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মোট সংখ্যা ২১ জন। কলেজ শাখা খোলার পর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁরা (মোট ১৮ জন; প্রভাষক ১৪ জন ও কর্মচারী ৪ জন) এমপিওভুক্ত নন। দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে বিগত ১৩ বছরে (২০১৩-২৫) মোট ৩৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৭ জন, বাকি ২৯ জন পাস করেনি।
২০১৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক শাখায় মোট তিনজন অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র একজন শিক্ষার্থী। এরপর টানা তিন বছর (২০১৪-১৬) এখানকার আর কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০১৪ সালে ৫ জন, ২০১৫ সালে ৩ জন ও ২০১৬ সালে ১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই পাস করতে পারেনি। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও পাস করেছে মাত্র ৪ জন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত পাঁচ বছরে (২০২১-২৫) ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও বিজ্ঞান শাখায় অংশ নেওয়া মোট ১২ জন পরীক্ষার্থী কেউই পাস করতে পারেনি। ‘শূন্য পাসের হার’ কিংবা ‘শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল’ এমন প্রতিষ্ঠানের কথা হয়তো হরহামেশা শোনা যায়, কিন্তু ধারাবাহিক বিপর্যয়ে হাবুডুবু খাওয়া প্রতিষ্ঠান আর কোনো বোর্ডের অধীনে এমন আরও আছে কি না, তা আমার জানা নেই।
দেশের মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে দিনাজপুর বোর্ডের জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা হলো পরীক্ষার ফলে এর ক্রমাবনতি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বোর্ডের তুলনায় দিনাজপুর বোর্ডের ধারাবাহিক ‘অধোগতি’ যেন থামতেই চাইছে না। ২০২১ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি বোর্ডে শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠান মোট ৫টি, এর মধ্যে উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজসহ তিনটিই ছিল দিনাজপুর বোর্ডে। ২০২২ সালে ১১ বোর্ডে এমন প্রতিষ্ঠান মোট ৫০টি হলেও একমাত্র দিনাজপুর বোর্ডেই ছিল ১৩টি। ২০২৩ সালে ১১ বোর্ডে মোট ৪২টির বিপরীতে কেবল দিনাজপুর বোর্ডেই শূন্য পাসের হারের প্রতিষ্ঠান ১৬টি। ২০২৪ সালে ১১ বোর্ডে শতভাগ ফেল করে মোট ৬৫টি প্রতিষ্ঠান, এগুলোর মধ্যে দিনাজপুর বোর্ড ২০টি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের পরীক্ষায় ১১ বোর্ডে মোট যেখানে ২০২টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ ফেল করে, সেখানে কেবল দিনাজপুর বোর্ডেই রয়েছে ৪৩টি (সর্বোচ্চসংখ্যক) প্রতিষ্ঠানের নাম।
এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার দাঁতভাঙ্গা মডেল কলেজ, সমাজকল্যাণ মহিলা কলেজ ও ভূরুঙ্গামারী মেইডাম কলেজ; ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ আদর্শ কলেজ; নীলফামারী জেলার গলমুন্ডা আদর্শ কলেজ; লালমনিরহাট জেলার দুহুলি এসসি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং দক্ষিণ ঘনাসিয়াম হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ; দিনাজপুর জেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। উল্লিখিত আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিটি থেকে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় একজন করে অংশ নিয়ে আট কলেজের সবাই ফেল করেছে।
রংপুর বিভাগের আটটি জেলার ৬৭১টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ২০২৩ সালের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পরীক্ষার্থী পাসের মুখ দেখেনি।
শূন্য পাসের হার এ ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি কলেজ ও ৮টি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ। একজন করে পরীক্ষা দিয়ে ফেল করা ৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এবার অন্যগুলো: কুড়িগ্রাম জেলার মোহানগঞ্জ আদর্শ কলেজ (মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১১), বাগুয়া অনন্তপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৪ জন); লালমনিরহাট জেলার বেহলাবাড়ি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৫ জন) এবং কুমরিরহাট এসসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২ জন); দিনাজপুর জেলার বেপারিতলা আদর্শ কলেজ (৫ জন); ঠাকুরগাঁও জেলার মোড়লহাট জনতা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৫ জন) এবং কদমরাসুল হাট হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৪ জন); গাইবান্ধা জেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ (২ জন)।
১৬টি কলেজের মোট পরীক্ষার্থী ৪৬ জন। এর মধ্যে ৮টি কলেজের মোট পরীক্ষার্থী যেমন ২৩ জন, ঠিক ৮টি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থীও ২৩ জন (কী অদ্ভুত মিল!)।
বিদ্যালয়টিতে মাধ্যমিকে কী হচ্ছে? ওই একই পরিস্থিতি, ধারাবাহিক ফল বিপর্যয়। দিনাজপুরের উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত (২০২১-২৫) এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ডে অর্জিত পাসের হারের ধারেকাছেও নেই। ১৯৬৮ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ২০২১ সালে ৯০.৬৯ ভাগ (বোর্ডে পাসের হার ৯৪.৮০%), ২০২২ সালে ৬৭.৭৯ ভাগ (বোর্ডের হার ৮১.১৬%), ২০২৩ সালে ৫৬.৮৯ ভাগ (বোর্ডের হার ৭৬.৮৪%), ২০২৪ সালে ৫৪.৫৪ ভাগ (বোর্ডের হার ৭৮.৪৩%) ও ২০২৫ সালে ৩৮.১৫ ভাগ (বোর্ডে পাসের হার ৬৭.০৩%) পরীক্ষার্থী পাস করেছে।
তাহলে এ রকম একটি নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালু করাটা কি খুবই জরুরি ছিল? মাসে কিংবা বছরে এ বাবদ খরচ কত? ১৩ বছরে মোট ৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য মাত্র ৭ জন—এমন তথ্য কী প্রমাণ করে? এ রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি একটি বা দুটি মাত্র? দেশজুড়ে এ রকম শত শত প্রতিষ্ঠানের কী অবস্থা? তা নিয়ে কি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেন কোনো ধরনের উদ্বেগ থাকবে না! মূল্যবোধ আর জবাবদিহির কথা না হয় বাদই দিলাম, দিনে দিনে লজ্জা-শরমের অবশিষ্টাংশটুকুও কি আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে না? এমন ‘অন্তঃসারশূন্য’ শিক্ষাব্যবস্থা জাতির জন্য কী বার্তা বহন করে! তাহলে কি ‘সরকার কা মাল, দরিয়া মে ঢাল’—এই আমাদের পরিণতি?
বিমল সরকার, অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা যে কেউ ভাবেন না, সেটা আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে স্পষ্ট হওয়া যাবে। চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডসংলগ্ন জয়পাহাড়ের কোলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা।
১ ঘণ্টা আগে
আমরা কি বারবার এইসব লোককে দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করব? যদিও মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর কোনো শাসকই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। নানা ধরনের দুর্বলতার কারণে তাঁরা রাষ্ট্র শাসনে অক্ষম হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এত বড় ভারতবর্ষ রাষ্ট্রটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।
১ ঘণ্টা আগে
বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় প্রবীণদের শুধু অন্যের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি তাঁদের নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে। কারণ, প্রবীণেরা শুধু অভিজ্ঞতার ভান্ডার..
৪ ঘণ্টা আগে
আমরা কি বুঝতে পারছি কী ভয়ানক অনিরাপদ সমাজে বেড়ে উঠছে আমাদের নিষ্পাপ শিশুরা? কোন ঘটনা ছেড়ে কোনটার উদাহরণ দেওয়া যায়—নেত্রকোনার ১১ বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া, সিরাজগঞ্জের ৯ বছরের শিশুকে আমের লোভে ধর্ষণ নাকি সিলেটের ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা? এসব ঘটনায় অভিযুক্তরা সবাই...
১ দিন আগে