Ajker Patrika

মুখস্থ করাই প্রকৃত শিক্ষা নয়

গালিবা আনতারা সোয়ারা
মুখস্থ করাই প্রকৃত শিক্ষা নয়
প্রতীকী ছবি

প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে কী হবে? যেখানে মুখস্থ করে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেখানে প্রকৃত শিক্ষা খোঁজা বিলাসিতা। কথাটি শুনতে তিক্ত হলেও সত্যি। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা মুখে মুক্তচিন্তার কথা বলি, কিন্তু সেই চিন্তার বিকাশ ঘটানোর মতো শিক্ষাব্যবস্থা আজও গড়ে তুলতে পারিনি। বর্তমানে মুক্তচিন্তার কথা বলা হলেও, সেটি বাস্তবায়নের জন্য ওপরমহলের যথাযথ সচেতনতা কিংবা কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায় না। পরিবর্তনের কথা শোনা যায়, কিন্তু সেই পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টালবাহানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষার চক্রেই আবদ্ধ।

অনার্স পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে মুখস্থনির্ভর বর্ণনামূলক প্রশ্ন। আবার বলা হচ্ছে, যত বেশি কোটেশন ব্যবহার করবে, তত বেশি নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা। তাহলে একজন শিক্ষার্থী কী করবে? বিষয়টি বুঝে নিজের বিশ্লেষণ লিখবে, নাকি অন্যের কথা মুখস্থ করবে? কোটেশন কোনো শিক্ষার্থীর মুক্তচিন্তার প্রকাশ নয়; বরং অন্যের চিন্তার পুনরাবৃত্তি। একটি বিষয় পড়ে একজন শিক্ষার্থী কতটুকু বুঝেছে, কতটা নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারে—সেই ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হলে মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটত। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মন্তব্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—‘মুখস্থ করিয়া পাশ করা-ই তো চৌর্যবৃত্তি।’ এক শতাব্দীরও বেশি আগে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিক্ষা যদি কেবল মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেখানে জ্ঞানের বিকাশ নয়, বরং চিন্তার স্থবিরতা তৈরি হবে, মুক্তচিন্তার বিকাশ মরে যাবে। তাঁর এই সতর্কবাণী আজকের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।

অন্যদিকে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। কিন্তু শুধু প্রশ্নের নাম ‘সৃজনশীল’ হলেই কি শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল হয়ে ওঠে? ছোটবেলা থেকেই যদি প্রশ্ন করার, যুক্তি দেওয়ার, বিশ্লেষণ করার এবং স্বাধীনভাবে ভাবার পরিবেশ না থাকে, তাহলে অল্প বয়সে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রকৃত মুক্তচিন্তা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত?

আজ অনার্স পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার মাঝের কয়েক দিনের ছুটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মুখস্থ করেই ভালো ফলাফল অর্জন করছে। যখন অল্প সময়ে মুখস্থ করে ভালো নম্বর পাওয়া যায়, তখন গভীরভাবে পড়ার, গবেষণা করার কিংবা নতুনভাবে চিন্তা করার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত সেই পথই বেছে নেয়, যে পথে সফল হওয়া সহজ।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; একজন চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি যদি মুখস্থবিদ্যাকে পুরস্কৃত করে, তাহলে প্রকৃত শিক্ষা কখনোই বিকশিত হবে না।

তাই এখন সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার। এমন একটি শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মুখস্থ নয়, বোঝার ক্ষমতা; উদ্ধৃতি নয়, বিশ্লেষণ; পুনরাবৃত্তি নয়, দরকার নতুন চিন্তা—এসবই হবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। কারণ, একটি জাতি মুখস্থবিদ্যা দিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে, কিন্তু মুক্তচিন্তা ছাড়া কখনোই উন্নত সমাজ গড়তে পারে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত