Ajker Patrika

শাঁখের করাত ও সাইফুল্লাহ সাজার খোয়াব

অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে তুরস্ক বা পাকিস্তানের মুরোদ নেই বাংলাদেশকে কানাকড়িও দেওয়ার। যেটুকু দেওয়ার তা দিতে পারে সৌদি আরব। সেনা ভাড়া খাটিয়ে পাকিস্তানের সমপরিমাণ না হলেও সিকিভাগ বা আধাআধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশের।

আজাদুর রহমান চন্দন
শাঁখের করাত ও সাইফুল্লাহ সাজার খোয়াব
মুসলিমপ্রধান তিন দেশ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান মিলে একটি প্রতিরক্ষা জোট গড়েছে। ছবি: এএফপি

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান—মুসলিমপ্রধান এই তিন দেশ মিলে গত মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি প্রতিরক্ষা জোট গড়েছে। সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা এবং কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্রের ওপর হামলাকে সব সদস্যরাষ্ট্রের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষমতা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোকে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গত ৭ আগস্ট প্রতিরক্ষা চুক্তিটি সই হয়, যা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে জোটটির প্রথম বৈঠকে সৌদি আরবে একজন মহাসচিবের নেতৃত্বে জোটের একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। লোহিতসাগর দিয়ে জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা পেয়ে আগের মাসেই বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ নিয়ে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করে সৌদি আরব। এই জোটেরও লক্ষ্য লোহিতসাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগর দিয়ে সব ধরনের জাহাজের স্বাধীনভাবে চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই জোটেও সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান তো আছেই; আছে মিসর ও জর্ডানের মতো প্রভাবশালী দেশও। বড় একটি প্রতিরক্ষা জোট গড়ার পর মাস গড়ানোর আগেই আরেকটি জোট গঠন করার কী প্রয়োজন পড়ল সে নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়।

নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ যৌক্তিকভাবেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলপন্থী কিছু বিশ্লেষক এই চুক্তিকে ইসরায়েলবিরোধী জোট হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার অন্য অনেকে মনে করছেন, নিজের ও আরব প্রতিবেশীদের পূর্ণ সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেখে সৌদি আরব হয়তো নতুন কোনো নিরাপত্তা নিশ্চিতকারীর সন্ধান করছে। তবে বাস্তবতা হলো, মক্কা চুক্তি মূলত বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিক থেকে চলে আসা মার্কিন নীতিরই এক নতুন সংস্করণ। যে নীতির মূল উদ্দেশ্য পশ্চিমাপন্থী বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, তাদের মার্কিন অভিভাবক এবং তাদের অঘোষিত মিত্র ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া। আর অবাক করার কিছু নেই যে এই নতুন চুক্তির আসল লক্ষ্যও হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শত্রুরা।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ তিনটি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে সরাসরি আঘাত হেনেছে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান এখনো তুরস্কে আক্রমণ না করলেও দেশটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাধান্য থাকা জোট ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তেহরানের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে জোট গঠন করিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি তবে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে একধরনের ধর্মীয় অনুভূতি চাঙা করার চেষ্টা করছে? অথচ কে না জানে যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এযাবৎ ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি নগ্ন আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া দূরে থাক, জোরেশোরে নিন্দাটুকুও করেনি। শুধু তা-ই নয়, গত শতকের সত্তরের দশকে ফিলিস্তিনের ফাত্তাহ গ্রুপের বিখ্যাত গেরিলা ইউনিট ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’কে ধ্বংস করার জন্য জর্ডানের বাদশাহ পাকিস্তানি সৈন্য ভাড়া করেছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা তখন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন প্রয়াত জেনারেল জিয়া-উল-হকের নেতৃত্বে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। সৌদি আরবসহ তিন দেশ এই চুক্তিতে সই করায় তিনি নিজেকে ‘খুবই আনন্দিত’ বলে ঘোষণা করেছেন।

এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে মক্কা চুক্তিকে ‘বিশ্বের মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ফেলা হয়। আমন্ত্রণ পাওয়ার আগেই নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জোটে শরিক হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেন, ‘মক্কা চুক্তির তিন দেশ যদি অভিপ্রায় প্রকাশ করে বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করতে, তাহলে পরে আমরা নিশ্চয়ই সেটা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করব।’ সম্ভবত বাংলাদেশের থিঙ্কট্যাঙ্ককে প্রভাবিত করছে মক্কা জোটের মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো হয়ে ওঠার ধারণা। বলা হচ্ছে, এই জোট ন্যাটোর মতো বিধি তৈরি করবে। ন্যাটোর মৌলনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সম্মিলিত বা যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি। ন্যাটোর ‘পঞ্চম অনুচ্ছেদ’ অনুসরণ করা হয়েছে মক্কা চুক্তিতেও। অর্থাৎ নিয়ম অনুসারে ন্যাটোর এক সদস্য দেশের ওপর আঘাতকে যেমন সব দেশের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করা হয়, তেমনি মক্কা জোটেও এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এটাই বাংলাদেশের থিঙ্কট্যাঙ্ককে প্রভাবিত করেছে। তারা মনে করছে, বৃহৎ শক্তি ভারতের কল্পিত আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার এটাই অন্যতম উপায়। পাকিস্তান বা বাংলাদেশ যে-ই ভারত দ্বারা আক্রান্ত হবে, মক্কা জোটের বাকি দেশগুলোও তাদের ওপর আক্রমণ বলে মনে করবে এবং তা প্রতিহত করবে। এই ভাবনার মধ্যে যে কত বড় গলদ আছে সে ব্যাখ্যা আপাতত মুলতবি রেখে বরং একটু দেখা যাক মূল খেলোয়াড়দের অবস্থাটা।

যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে আগ্রাসন চালানোর পর থেকে বারবার মার খেয়ে বুঝতে পেরেছে যে তারা ইরানের কাছে কতটা অসহায়! ইরান শুধু মার্কিন সামরিক স্থাপনায়ই আঘাত করেনি, সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এর পর থেকেই সৌদি আরব প্রতিরক্ষা জোট গড়তে মরিয়া। জোটের বৃহত্তম শরিক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা—অটোমান সাম্রাজ্যের খুদে সংস্করণ গড়ে তার নেতা হওয়া। সে জন্য অর্থনীতি মেরামতের চেয়ে তারা সমরাস্ত্র উৎপাদনে এবং সেসব সমরাস্ত্র বিক্রি করার জন্য ‘খিলাফাহ’, ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’সহ নানা উদ্দীপক স্লোগান প্রচার করে সমরাস্ত্র বিক্রি করে যাচ্ছে আশপাশের দেশগুলোতে। বিশেষ করে তাদের বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোনটি বিশ্বের সেরা ড্রোনগুলোর একটি। এই ড্রোনসহ বায়রাক্তার আকিনচি এবং বায়রাক্তার কিজিল্লেমা নামের স্টিলথ ফাইটার বিক্রি করেও টাকা কামানো তার লক্ষ্য। তৃতীয় শরিক পাকিস্তানের এই মুহূর্তে অর্থ উপার্জনে প্রধান উপায় সৈন্য ভাড়ায় খাটানো। মোটা অঙ্কের অর্থ পেলে দেশটি সত্তরের মতো ইসরায়েলের পক্ষে সেনা পাঠাতেও পিছপা হবে না। এখন পাকিস্তানের ধসে পড়া অর্থনীতির জন্য একমাত্র দরকার টাকা। সৌদি আরবে আগে থেকেই পাকিস্তানি সেনারা কাজ করছেন। এবার জোটে যোগ দিয়ে সৌদি থেকে আরও মোটা অঙ্কের টাকা কামানোর সুযোগ সৃষ্টি হলো।

অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে তুরস্ক বা পাকিস্তানের মুরোদ নেই বাংলাদেশকে কানাকড়িও দেওয়ার। যেটুকু দেওয়ার তা দিতে পারে সৌদি আরব। সেনা ভাড়া খাটিয়ে পাকিস্তানের সমপরিমাণ না হলেও সিকিভাগ বা আধাআধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশের। তুরস্ক আরব সাগরে খবরদারি করতে চায় সৌদি আরব, পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে রক্ষা করতে মোটেই নয়। দেশটির সেই ক্ষমতাও নেই। তুরস্ক চায় এই অঞ্চলে তাদের অস্ত্র বিক্রি করতে। উপসাগরীয় দেশগুলো ছাড়া পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশসহ এশীয় দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ড্রোন রপ্তানি করছে তুরস্ক। পাকিস্তানে তাদের ড্রোন বানানোর প্ল্যান্ট আছে। এখন বাংলাদেশেও তা করতে চায়।

এ দেশের সরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক ছাড়াও মধ্যরাতে টেলিভিশনের পর্দা ফাটানো কিছু টকার প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র কিংবা নিদেনপক্ষে তার অংশবিশেষ করায়ত্ত করে ফেলার স্বপ্নে বিভোর চব্বিশের পরিবর্তনের পর থেকে। অবস্থা এমন যে কোনো কোনো অধ্যাপকও নিজেকে এ যুগের খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) হওয়ার খোয়াব দেখেন। মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়া বিজয়ী বিখ্যাত আরব সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ শৌর্য ও বীরত্বের জন্য সাইফুল্লাহ, অর্থাৎ ‘আল্লাহর অসি’ উপাধি লাভ করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশি এই স্বকল্পিত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ বা সাইফুল্লাহদের দিবাস্বপ্নের ঘোরে এরই মধ্যে জল ঢেলে দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর। ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান ১০ সেপ্টেম্বর প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, আপাতত জোট সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে আগে তাদের সংগঠন ও সহযোগিতা আরও সুসংহত করতে হবে। এরপর একই ধরনের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির দেশগুলোর জন্য চুক্তিটি উন্মুক্ত করা হবে।

এই জোটে যোগ দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য শাঁখের করাতের মতো হতো যদি সৌদি আরবের দিক থেকে কোনো চাপ থাকত। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে পাকিস্তানের ঘোষণাটি আমাদের জন্য শাপে বর হওয়ার মতোই। এদিকে বাংলাদেশের স্বকল্পিত খালিদ ইবনে ওয়ালিদদের খোয়াব আরও খান খান করে দিচ্ছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। কয়েক সপ্তাহ ধরে হুমকি দেওয়ার পর তারা লোহিতসাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে সরু জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা বন্দরনগর মোখা দখল করেছে। এ অবস্থায়ও নিন্দা ও সংহতি জানিয়েই সৌদির পাশে আছে জোটসঙ্গী তুরস্ক-পাকিস্তান।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত