Ajker Patrika

প্রাণের দামে আর কত দিন টিকবে জাহাজভাঙা শিল্প

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রাণের দামে আর কত দিন টিকবে জাহাজভাঙা শিল্প
হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গ্রিন সনদ ছাড়া কোনো ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙা যাবে না। ছবি: মো. নাফিজুর রহমান, পেক্সেলস

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৪ আগস্ট শুক্রবার সকালে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। তখন জাহাজের খোলে কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। তাঁদের অনেকেই হয়তো জানতেন না, যে জাহাজে তাঁরা কাজ করছিলেন, সেটি মাত্র এক মাস আগেই নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে শ্রম আদালতের মামলায় পড়েছিল।

এই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আরও ১০ থেকে ১২ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের কেউ হয়তো সেদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী-সন্তানকে বলেছিলেন, সন্ধ্যায় ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। এ ঘটনা নতুন নয়। সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তার ঘাটতি ও শ্রমিকদের প্রাণহানির যে ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, এটি তারই আরেকটি উদাহরণ।

এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তিন দফা পরিদর্শনে ইয়ার্ডটির নানা ঘাটতি ধরা পড়ে। বারবার তাগিদপত্রও দেওয়া হয়। তবু ছুটির দিনেও পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ চলেছে। গ্যাস লিকেজে প্রাণ গেছে ৯জনের। সমস্যা তথ্যের অভাবে নয়। ঝুঁকি জানা থাকার পরও কাজ বন্ধ করা হয়নি। এবারও পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে। নেতৃত্বে আছেন শিল্পমালিকদের সংগঠনের একজন কারিগরি উপদেষ্টা। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এনজিও শিপ ব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের হিসাবে, ২০০৯ সাল থেকে এ শিল্পে ৪০০-এর বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি অল গ্লোবাল ইউনিয়নের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে নিহত হয়েছেন ৩৮ জন, আহত ১৭৭ জন। প্রতিবার দুর্ঘটনার পর প্রতিশ্রুতি আসে। কিন্তু বদলায় না পরিস্থিতি।

অথচ এই শিল্পকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। দেশের ইস্পাত চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আসে এই স্ক্র্যাপ থেকে, পদ্মা সেতু থেকে মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত বড় অবকাঠামোর কাঁচামালের একটা বড় অংশ এসেছে সীতাকুণ্ডের এই ইয়ার্ডগুলো থেকেই। বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হয় জাতীয় অর্থনীতিতে, সরকার রাজস্ব পায় ১২ থেকে ১৫০০ কোটি টাকা, আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ২ লাখের বেশি মানুষের সংসার চলে এই শিল্পের ওপর ভর করে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বলতে হয়, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গত ২৬ জুন থেকে গ্রিন সনদ ছাড়া কোনো ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কথা নয়, কিন্তু ২০০-এর বেশি নিবন্ধিত ইয়ার্ডের মধ্যে মাত্র সাত-আটটি এই সনদ পেয়েছে। একটি ছোট ইয়ার্ডকে পরিবেশবান্ধব করতে লাগে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা, সেই বিনিয়োগ মুনাফায় ফিরতে সময় লাগে ১০-১২ বছর বা তারও বেশি। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই খাতকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখায় ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে রাজি হয় না, মেলে কেবল জাহাজ কেনার স্বল্পমেয়াদি ঋণ। ফলে যে মালিক সনদ পাননি, তিনি টিকে থাকার তাগিদেই পুরোনো পথে হাঁটেন, আর ঠিক সেই ইয়ার্ডগুলোতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থেকে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আটকে থাকা আগাম আয়কর, দুই বছর ধরে যা সরকারি দপ্তরে জমে আছে, অথচ ছাড় পেলে সেটাই হতে পারত কমপ্লায়েন্সের প্রথম পুঁজি। নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নিজস্ব দুর্বলতাও আছে, শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের ১৪ সদস্যের তিনজনই ইয়ার্ড মালিকদের প্রতিনিধি, মাত্র চারজন থাকলেই বোর্ডসভা বৈধ হয়ে যায়।

এই ফাঁক গলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ভারত তার আলাং ইয়ার্ডকে চাঙা করতে ৪৫৪ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ আনছে, জাহাজমালিকেরা স্ক্র্যাপ মূল্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রেডিট নোট হিসেবে ফেরত পাবেন। আলাংয়ে এখন শতাধিক কমপ্লায়েন্ট ইয়ার্ড কাজ করছে, এমনকি পূর্ব উপকূলে নতুন কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনাও চলছে, যাতে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা টেনে নেওয়া যায়। পাকিস্তানের গাদানিও সাময়িক সুরক্ষা সনদ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, এক সপ্তাহেই চারটি জাহাজ পেয়েছে তারা। ফল স্পষ্ট, সীতাকুণ্ডের এক ব্যবসায়ীর ভাষায়, বাংলাদেশি ইয়ার্ড টনপ্রতি ৬৫০ ডলার দিলেও ভারতীয় ইয়ার্ড ৬৮০ ডলার দিয়ে জাহাজ কিনে নিচ্ছে।

এখান থেকেই আসল ঝুঁকিটা শুরু। জাহাজমালিকেরা একবার নতুন গন্তব্যে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সহজে ফিরে আসেন না। শিপিং ব্যবসায় শুধু দাম নয়, সম্পর্ক ও আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। আজ বেশি দামের কারণে একটি জাহাজ আলাংয়ে গেলে আগামী দিনে একই মালিকের আরও জাহাজ সেখানে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তত দিনে দালাল, ব্যাংক গ্যারান্টি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থাও পরিচিত হয়ে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় জায়গা না পেলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক জাহাজমালিকদের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। একবার আস্থা হারালে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে দক্ষ শ্রমিকেরা ভালো মজুরি ও নিরাপত্তার আশায় আলাং বা গাদানিতে চলে গেলে সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলো অদক্ষ শ্রমিকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে। এভাবেই কোনো বড় ঘোষণা ছাড়াই একটি শিল্প ধীরে ধীরে প্রতিযোগীদের হাতে চলে যেতে পারে। বিষয়টি যখন স্পষ্ট হবে, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

তাহলে পথ কী। ভারতের ক্রেডিট নোট মডেলের অনুরূপ একটি সীমিত প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডে জাহাজ আনলে আমদানিকারকেরা কর ছাড় পাবেন। আটকে থাকা আগাম আয়কর দ্রুত ছাড় করে ব্যবসায়ীদের হাতে তারল্য ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যা কোনো বাড়তি ব্যয় ছাড়াই কেবল প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের বিষয়। বিচিং ও কাটিং অনুমোদনের দুই মাসের বিলম্ব কমিয়ে আনা জরুরি, কারণ, প্রতিটি দিনের বিলম্বই ব্যাংক সুদের আকারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষয় করে। নিয়ন্ত্রক বোর্ডের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে শিল্পের অংশগ্রহণকে পরামর্শমূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা দরকার, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা বজায় থাকে। আর পরিদর্শনের পর কেবল নোটিশেই থেমে না গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধন না হলে কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করার মতো বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতা পরিদর্শন সংস্থার হাতে থাকা প্রয়োজন। ফেরদৌস স্টিলের ক্ষেত্রে তিন দফা পরিদর্শন ও একটি মামলার পরও কাজ বন্ধ না হওয়াটাই প্রমাণ করে, বর্তমান প্রয়োগকাঠামো কতটা ঠুনকো।

সীতাকুণ্ডের এই ঘটনা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক গুরুত্ব আর শ্রমিকের নিরাপত্তা একে অপরের বিপরীত নয়। বরং একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দুটিই জরুরি। বাংলাদেশের এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। প্রতিযোগীদের এগিয়ে যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। তবে সেই পরিবর্তনের মূল্য যদি বারবার শ্রমিকের প্রাণ হয়, তাহলে বিশ্ব জাহাজভাঙা বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানও একদিন শুধু কাগজে-কলমেই থাকবে, বাস্তবে নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত