
ভারতের জাতীয় এবং তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সাবেক অভিনেতা জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়ের উত্থান চমকের সৃষ্টি করেছে। অবশ্য তামিল রাজনীতিতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। বিজয়ের আগে এমজিআর—এমজি রামাচন্দ্রন এবং জয়ললিতা জয়রাম সিনেমার জগৎ থেকে এসে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এমজিআর তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগামকে (এআইএডিএমকে) কেন্দ্র রাজনীতি করে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। জয়ললিতাও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।
তবে বিজয়ের ব্যাপারটি এই দুজনের চেয়ে বেশ খানিকটা আলাদা। এমজিআর ও জয়ললিতা যেখানে পুরোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের হাত ধরে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেখানে থালাপতি বিজয় নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল নিয়ে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছেন।
বছর দুয়েক আগে থালাপতি তাঁর রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) শুরু করলেও তাঁর এই লক্ষ্যে যাত্রা শুরু মূলত ২০০৯ সালে। তখন থেকেই বিজয় তাঁর ভক্তভিত্তি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। সে সময় রাজ্যজুড়ে বিজয় তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলোকে সংগঠিত করে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামের সংগঠনে রূপ দেন। প্রথম দিকে এটি ছিল কল্যাণ ও সেবামূলক নেটওয়ার্ক। কিন্তু ধীরে ধীরে ত্রাণকাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে বুথ পর্যায়ে পরিচিতি তৈরি করে।
এরপর ২০১১ সালের বিধানসভায় এই প্ল্যাটফর্ম প্রকাশ্যে এআইএডিএমকের জোটকে সমর্থন দেয়। এটি ছিল বিজয়ের প্রথম সরাসরি নির্বাচনী অবস্থান। এরপর ২০১০-এর দশকের শেষ ভাগ ও ২০২০-এর শুরুর দিকে বিজয়ের চলচ্চিত্রে ক্রমেই রাজনৈতিক সুর বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএন) সমালোচনা তাঁর সিনেমার বাইরেও অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
চলচ্চিত্রে স্টারডম বা তারকাখ্যাতির দিক থেকে বিজয় হয়তো কমল হাসান বা রজনীকান্তের পর্যায়ে নন, কিন্তু বক্স অফিসে তাঁর সফলতা ও বিশাল ভক্ত-সমর্থক গোষ্ঠীর প্রভাব নিঃসন্দেহে গভীর প্রভাবশালী। নাচ, কমেডি আর জনমুখী সিনেমার ভাষা বোঝার তীক্ষ্ণ ক্ষমতাই তাঁর মূল শক্তি। তবে বিজয়ের তারকাখ্যাতি আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এই বীজটি রোপণ করেছিলেন তাঁর বাবা। তাঁর বাবার মধ্যে কমিউনিস্ট ঝোঁক ছিল এবং তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারেও বেশ আগ্রহী ছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা বাবা সেই কাজে সফল না হলেও বিজয় সফল হয়েছেন। বাবার দেখানো পথ ধরে বিজয় সব সময়ই সেক্যুলার এবং বিরোধিতা করেছেন ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির।
যা-ই হোক, ২০২১ সালে তামিলনাড়ুর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের ‘মাক্কাল ইয়াক্কামের’ প্রার্থীরা যে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তার বেশির ভাগই জিতে নেন। এতে প্রমাণিত হয়, বিজয়ের এই নেটওয়ার্ক শুধু জনসমাগম নয়, ভোটও টানতে পারে। এবং সেটার প্রমাণ পাওয়া গেছে রাজসভা নির্বাচনেও। বিজয়ের দল ১০৮টি আসন জিতে প্রধান দলে পরিণত হয় এবং কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর সহায়তা নিয়ে সরকারও গঠন করেছে।
বিজয়ের জয়ের নেপথ্যে কয়েকটি স্পষ্ট ও পরস্পর সম্পর্কিত কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিনের তারকাখ্যাতি এবং ভক্ত-নেটওয়ার্ককে রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। গত প্রায় দুই দশকে তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলো রক্তদান ও ত্রাণের মতো জনসেবামূলক কাজ করে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করে ভোটব্যাংকের আস্থা তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, তিনি সময়োপযোগী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তামিল জনগণের মাঝে ‘দ্রাবিড়’ পরিচয়ের রাজনীতির সমালোচনা ও অস্থিতিশীলতা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে অনিশ্চিত এই রাজনীতির দুই প্রধান দলের প্রতি জনগণের ‘ক্লান্তি’ বা এই রাজনীতি পরিবর্তনের মনোভাবকে বিজয় ভালোভাবে ক্যাশ করেছেন। তৃতীয়ত, নিজের দলকে তিনি দ্রুত পেশাদার ও কার্যকরী সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েছেন। শুধু ভক্তদের আবেগের ওপর ভরসা না রেখে স্থানীয় পর্যায়ে কো-অর্ডিনেশন, ট্রেইনিং ও ডেটা-ড্রাইভেন কর্মসূচি চালু করায় ভক্তকুলকে দলীয় ভোটারে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে। চতুর্থত, নির্বাচনী বার্তা ও প্রতিশ্রুতি তাঁর জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সামাজিক কল্যাণ, দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার এবং সহজে বোঝা যায় এমন প্রতিশ্রুতি (যেমন নারী ও গরিবদের জন্য তহবিল, নির্দিষ্ট সহায়তা) জনসাধারণের কাছে আকর্ষণীয় ও বাস্তবসম্মত লেগেছে। ফলে তাঁর ফ্যানবেজ ছাড়াও ভোটারদের অন্যান্য শ্রেণিও আকৃষ্ট হয়েছে। পঞ্চমত, দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করার কৌশল হিসেবে তিনি সিনেমার নাটকীয়তা, ব্যক্তিগত ইমেজ ও গণমাধ্যম ব্যবহারে দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর সেলিব্রিটি ইমেজ ও সিনেমার গল্পকে তিনি রাজনৈতিক ন্যারেটিভে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, যা তাঁকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় হতে সহায়তা করেছে।
থালাপতি বিজয়ের উত্থানে তামিলনাড়ুর স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেছে। রাজ্যের প্রধান দুই দ্রাবিড়ীয় রাজনৈতিক দল ডিএমকে ও এআইডিএমকের ভোটব্যাংকে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে বিধানসভার আসনবণ্টন এবং জোটকাঠামোতে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে এবং বহুপক্ষীয় রাজনীতির পথ প্রশস্ত হয়েছে।
বিজয়ের সরকার ক্ষমতায় আসায়—যদি তারা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে—জেলা স্তরের বাজেট বরাদ্দ, কল্যাণ প্রকল্প ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ, নারী-নিরাপত্তা বা অন্যান্য অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন হতে পারে। থালাপতির ভক্ত-নেটওয়ার্ককে সাংগঠনিক কাঠামোয় রূপান্তর করার কারণে স্থানীয় নেতৃত্বও পুনর্গঠিত হচ্ছে। অনেক পুরোনো নেতার প্রতিস্থাপন এবং তরুণ নেতৃত্বের আগমন এ প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে তামিলনাড়ুর বর্ণপ্রথাভিত্তিক জটিলতা ও আঞ্চলিক ভিন্নতার সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া ব্যক্তি ইমেজকে কেন্দ্র করে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলের জন্য রাজ্যের রাজনীতিতে স্থায়ী একটি পক্ষ হওয়া কঠিন। যদি বিজয়ের দল এই সমন্বয়ে ব্যর্থ হয় তবে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ বা ভোট বিভাজন দেখা যেতে পারে। কিন্তু সফল সমন্বয়ের মাধ্যমে দলটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে, যা তামিলনাড়ুর রাজনীতির আগামী দিনের হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে দেবে।
থালাপতি বিজয়ের উত্থান ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বাড়তি মাত্রা যুক্ত করবে। বিশেষ করে, বিজেপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ কণ্ঠ হিসেবে তাঁর জয়ের গুরুত্ব আছে। তামিলনাড়ুতে টিভিকের সাফল্য দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য থেকে একটি রাজনৈতিক বার্তা পাঠায়, কেন্দ্র সরকারবিরোধী ভাবধারা ও ধর্মনিরপেক্ষ ন্যারেটিভ দিয়ে এখনো জনসমর্থন জড়ো করা সম্ভব। বিজয় সরাসরি বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক কর্মসূচি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ফলে জাতীয় মঞ্চে বিজেপির কৌশলগত অবস্থান কিছুটা সংকুচিত বা পুনর্মূল্যায়িত হওয়ার চাপ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে শক্তিশালী দক্ষিণি আঞ্চলিক দল হিসেবে টিভিকে যদি দীর্ঘ মেয়াদে টিকে যায় ও লোকসভা পর্যায়ে উঠে আসে, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে জোট গঠনে দক্ষিণি দলগুলোর গুরুত্ব বাড়বে। অর্থাৎ, কেন্দ্র সরকারের জন্য দক্ষিণ ভারতের রাজনীতির প্রতি বাড়তি মনোযোগ জরুরি হয়ে উঠবে। ফলে বিজেপি তো বটেই, অন্য জাতীয় দলগুলোর জন্য বিজয়ের এই জয় কৌশলগত রূপান্তর। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর ভোটারদের মন জয় করতে স্থানীয় ইস্যু এবং আঞ্চলিক নেতা ও দলগুলোর সঙ্গে জোটবিধি নতুন করে সাজাতে হবে। যাতে টিভিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কাছে ভোট হারানো ঠেকানো যায়। থালাপতির এই জয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভাষা ও প্রচারকৌশলেও পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেলিব্রিটিনির্ভর রাজনৈতিক মডেলের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।

মানুষ কতটা অমানবিক হয়ে গেছে, তার একটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদে। স্রেফ চারটি সুপারির চারা খেয়েছিল তিনটি ছাগল। সেই অপরাধে ছাগল তিনটির পাগুলো এক করে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দুটি ছাগল মারা গেছে এবং একটি ছাগল মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে
বাংলার ইতিহাস পলাশীর যুদ্ধের পরে বড় রাজনৈতিক ঘটনা সাতচল্লিশের দেশভাগ। উভয় ঘটনাই পরাজয়ের। সাতচল্লিশের পরে উনসত্তরে যে গণ-অভ্যুত্থান সেটি কিন্তু পরাজয়ের নয়, জয়েরই। এই অভ্যুত্থান নিয়ে বেশ কিছু লেখা আমরা পেয়েছি, আরও পাব, পাওয়া প্রয়োজন।
১ দিন আগে
আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে ইউরেশিয়ার বরফাবৃত হিমশীতল বনে হেঁটে বেড়াত একদল দূরদর্শী শিকারি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রচলিত শিক্ষায় ও সামাজিক ধারণায় এদের চিত্রায়িত করা হয়েছে হিংস্র, অসভ্য ও বুদ্ধিশূন্য এক গুহাবাসী প্রজাতি হিসেবে—যাদের আমরা বলি ‘নিয়ান্ডারথাল’।
১ দিন আগে
তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর আপাতত থমকে গেছে। কয়েক দিন আগেও যখন আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল, তখন মনে হচ্ছিল ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের বরফ হয়তো গলতে শুরু করেছে।
২ দিন আগে