Ajker Patrika

শতভাগ সাফল্যের ছায়ায় অদৃশ্য শিক্ষার্থীরা

ড. মো. শফিকুল ইসলাম
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৬
শতভাগ সাফল্যের ছায়ায় অদৃশ্য শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তা নয়। বরং কতজনকে নিজের সম্ভাবনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিল। ফাইল ছবি

একটি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে—খবরটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, শতভাগ পাসের এই সাফল্যের আড়ালে কি কোনো শিক্ষার্থী হারিয়ে যাচ্ছে না তো? একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল যখন শুধু পাসের হার ও জিপিএ ৫-এর সংখ্যায় মূল্যায়িত হয়, তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য, অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষার্থীকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পূরণ করেছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এই ব্যবধানের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন বিদ্যালয় পরিবর্তন, আর্থিক সমস্যা, পারিবারিক বাধা বা আরও অন্য কোনো কারণে। তবে কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও কাঙ্ক্ষিত জিপিএ নম্বর না পাওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এই ঘটনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পাসের হার, জিপিএ-৫-এর সংখ্যা এবং ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর ভালো ফলাফল দেখানোর একধরনের চাপ তৈরি হয়। বেশি জিপিএ-৫ মানে বেশি সুনাম, বেশি সুনাম মানে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি—এই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো শিক্ষার মূল লক্ষ্যকে পেছনে ফেলে দেয়। একটি ভালো বিদ্যালয়ের কাজ শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা নয়; বরং অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের উন্নতির সুযোগ তৈরি করাও তার অন্যতম দায়িত্ব।

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, ফলাফল শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের গল্প বলে। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে জানতে হবে—একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজন দশম শ্রেণি পর্যন্ত টিকে ছিল, কতজন এসএসসির ফরম পূরণ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কতজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। বর্তমানে আমরা সাধারণত শুধু শেষ ধাপের ফলাফল দেখি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি শুরুতে ৫০০ শিক্ষার্থী থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ৩০০ জন পরীক্ষা দেয়, তাদের সবাই পাস করলে সেটি শতভাগ সাফল্য হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু বাকি ২০০ শিক্ষার্থীর গল্প কোথায় হারিয়ে যায়, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ?

শিক্ষাব্যবস্থায় এখন সময় এসেছে সাফল্যের নতুন সূচক নির্ধারণ করার। শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কোহর্ট কমপ্লিশন রেট বা একটি ব্যাচের কত শতাংশ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে—এই তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, এসএসসি ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা যদি বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা হয়, তাহলে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে। শিক্ষাবিদদের মাধ্যমেও এই ধরনের স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত ঝুঁকিভিত্তিক তথ্য অডিট চালু করা। কোনো প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণির নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তুলনায় এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কম হলে বিষয়টি পর্যালোচনার আওতায় আনা দরকার। কারণ, একজন শিক্ষার্থী মাঝপথে কেন হারিয়ে গেল, সেটি জানা শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব। সে কি অর্থনৈতিক কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে, অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেছে, নাকি কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে পরীক্ষার সুযোগ হারিয়েছে—এই তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি করা সম্ভব নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা। কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দিলে তার জন্য একটি কার্যকর আপিল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে এবং শিক্ষার্থী বা অভিভাবক যেন শিক্ষা বোর্ডের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারেন, সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও কর্মজীবনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এটিও সত্য যে সব শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান কঠোর পরিশ্রম, মানসম্মত পাঠদান ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই ভালো ফলাফল বয়ে আনে। সমস্যা হলো, বর্তমান মূল্যায়নকাঠামো এমন একটি প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, যেখানে অনেক সময় ভালো ফল দেখানোর চাপ শিক্ষার্থীর সামগ্রিক উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাচ্ছে।

এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিক্ষার্থী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনের পর একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাযাত্রা অনুসরণ করা গেলে সহজেই বোঝা যাবে, কোথায় ঝরে পড়ার হার বেশি, কোথায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাচ্ছে এবং কোথায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত চিত্র দেখতে পারবেন।

শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তা নয়। বরং একটি শিক্ষাব্যবস্থা কতজন শিক্ষার্থীকে ধরে রাখতে পারল, কতজনকে সুযোগ দিল এবং কতজনকে নিজের সম্ভাবনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিল—সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। শতভাগ পাসের গৌরব তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা নিশ্চিত করতে পারব যে, কোনো শিক্ষার্থীকে পথের মাঝখানে হারিয়ে যেতে হয়নি। সমাজে একটি অস্বাস্থ্যকর সমীকরণ তৈরি হয়েছে। যেমন বেশি জিপিএ-৫=ভালো স্কুল=শতভাগ পাস=সফল প্রতিষ্ঠান। এই সমীকরণ থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত