
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল হেরেছে। দল হারলে দলের নামটা বললেই তো হতো, তাই না? ধরুন, যদি ট্রাম্পের দল হারে, আলাদা করে কি ট্রাম্পের নামও বলতে হবে? হবে না। কিন্তু মমতার বেলায় আমি তা বলব। বলব এই কারণে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি যতটা নিজেদের জন্য জিতেছে তার চেয়ে বেশি জিতেছে মমতার কারণে। আমার মতে, তৃণমূল হেরেছে যতটা, তার চেয়ে অধিক হেরেছেন মমতা। এটা ছিল ‘মমতা’ আর ‘নো মমতা’র ভোটযুদ্ধ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথ থেকে উঠে আসা নেত্রী। কিন্তু বাংলার হাওয়া সব সময় এমন যে প্রথমবার কেউ জিতে এলে তাকে মনে হয় জনতার প্রতিনিধি। দ্বিতীয়বারে মালকিন, তৃতীয়বার আসতে পারলে দস্যুরাজ বা দস্যুরানী। আর যদি এর বেশি কেউ পারেন, তো তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। পালানোর বিকল্প থাকে না। মমতা অনেক আগেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আসুন শুরুতেই তাঁর একটা কবিতা পড়ি:
এপাং ওপাং ঝপাং/সুর ধরেছে পটাঙ
ব্যাঙ ডাকে গ্যাঙ গ্যাঙ/হাতির কতো বড় ঠ্যাং
হরে কর কমবা/গরু ডাকে হাম্বা
গর্জন করে অম্বা/মা ডাকেন বুম্বা
হরে কর কমবা/ডব্বা ডব্বা রব্বা
হুড়হুড় করে হুম্বা/তোবা তোবা আব্বা
এটি তিনি যে নিজে লিখেছেন, তা কবিতা পাঠ করলেই বোঝা সম্ভব। আমাদের দেশে এরশাদও কবিতা লিখতেন। বলা হয়ে থাকে, এরশাদের কবিতাগুলো লিখে দিতেন দেশের বিশিষ্ট কবিকুলের কেউ কেউ। এরশাদ নিজে যদি একটি লাইনও লিখে থাকেন, তো তার মান ছিল ঢের ভালো। আমি যে কথা বলতে চাইছি—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি কেউ বাধ্য করেছিল কবিতা লিখতে? কেউ কি তাঁকে বলেছিল যে ছবি আঁকুন; না আঁকলে আপনার খবর আছে? পাগলামির একটা সীমা থাকে। এই কবিতা নামের অখাদ্য বস্তুটি পড়ে আপনার কি মনে হয়, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন?
আমরা সব সময় মনে করি, আমাদের দেশের কবি-সাহিত্যিক, গায়ক-গায়িকা বা বুদ্ধিজীবীরাই ভোল পাল্টান। বিশেষত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে হিড়িক পড়ে গিয়েছিল আওয়ামী হওয়ার। দলে দলে সবাই যোগ দিয়ে তেল মেরে এমন পিচ্ছিল এক পথ তৈরি করে দিয়েছিল, যাতে আছড়ে পড়ে শেখ হাসিনারই কোমর ভেঙেছে! অন্য যারা, তারা আড়ালে-আবডালে ঘাপটি মেরে আছে মত ও পথ পাল্টাবে বলে।
ওপার বাংলার দুই প্রধান কবি জয় গোস্বামী আর শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়। জয় গোস্বামী কবি হিসেবে স্বনামধন্য, আমার প্রিয় একজন কবি। কিন্তু এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি মেরুদণ্ডহীন, ব্যক্তিত্বহীন একজন মানুষও বটে। যে ঘটনাটা একসময় ভালো এবং প্রশংসার মনে হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে তা ছিল তাঁর মেরুদণ্ডহীনতা। বলা নাই, কওয়া নাই বাংলাদেশে এসে কবি আল মাহমুদের বাড়ি গিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করায় আল মাহমুদ নিজেও বিরক্ত হয়েছিলেন। কারণ আল মাহমুদ তত দিনে সালাম বা পায়ে ধরায় অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। যাক, ভাবলাম বড় কবিকে এভাবেই শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন জয় গোস্বামী। এরপর আবার বাংলাদেশে এসে অভিনেতা মোশাররফ করিমের পা ধরার জন্য আকুলি-বিকুলি করা এই কবিকে দেখে মনে হয়েছিল ভাঁড়! তাঁর ইমেজ ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এটা যায় না। এই লোকই মমতার সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, মমতা যেখানে, সেখানেই তিনি আছেন এবং থাকবেন। এই যে তেল দেওয়া, এখন কি তিনি মমতার সঙ্গে রাজপথে বা জেলে গেলে সেখানে থাকবেন?
অন্য কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিমবঙ্গের অতীত গৌরব বা সুনাম ধরে রাখতে পারেননি। কবীর সুমনের কথাই ধরুন। কী একটা লোক! বিজেপি জেতার পরদিনই বলছেন, ‘আমি তৃণমূল ছিলাম না।’ এসব বর্ণচোরারা বুদ্ধিজীবী বলেই উভয় বাংলায় কথা বলার লোক পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় ভাঁড় আর সং; যারা কোনো দিন কাউকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে না। সমাজ আর জাতিকে অন্ধকারে ডুবিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা এরাই মূলত বিপজ্জনক।
মমতার কথায় আসি। তিনি হেরেছেন। ১৫ বছর রাজ্য শাসন আর পাগলামির পর এখন তাঁর বিদায় ঘটেছে। কিন্তু ওপার বাংলার যে ঐতিহ্য বা ধারা—সেই ধারাকে তিনি বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে চলে গেছেন। এই লেখা যখন লিখছি, তখন সবার আগে আক্রান্ত হয়েছেন লেনিন। লেনিনের মূর্তি ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওপার বাংলায় লেনিন কেন থাকবেন মূর্তি হয়ে? এটা যাঁরা বলছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন এই মূর্তি বা লেনিন দীর্ঘ সময় ধরে আছেন বা ছিলেন। কিন্তু কেউ ভাঙার কথা ভাবেনি। আর তাঁদের কথা যদি মানি, তাহলে পৃথিবীর বহু দেশে রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর মূর্তি কেন থাকবে? কেন জাপানে থাকবে সুভাষ বোসের মূর্তি? এই ভাঙচুর আমাদের দেশেও ঘটেছিল। এখন টুকটাক চলছে। এই আক্রোশ যে বিজেপির জন্য কাল হবে উঠবে, সেটা সময়ের ব্যাপার।
মমতা তো গেলেন, মূল্যায়ন কী বলছে? একসময় ভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে যে তিনজন ডাকসাইটে নারীনেত্রীর নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতো, তাঁরা হলেন জয়ললিতা, কুমারী মায়াবতী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের সূত্র ধরে সেই ত্রয়ীর রাজনৈতিক প্রভাব আজ আবার আলোচনার কেন্দ্রে। বিরোধী নেত্রী হিসেবে লড়াকু ইমেজকে সামনে রেখে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর থেকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের দায়িত্ব সামলেছেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনের রায়ে সেই ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন ঘটেছে। বিজেপি জিতেছে ২০৭টা আসন, তৃণমূলের ঝুলিতে ৮০টা আসন। বিশেষত ‘ঘরের মাঠ’ ভবানীপুর কেন্দ্রে একদা তাঁরই ঘনিষ্ঠ এবং অধুনা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পরাজয় একাধিক জল্পনাকে উসকে দিয়েছে।
মমতার প্রভাব বাংলাদেশে কী পরিস্থিতির জন্ম দেবে বা দিতে পারে, সেটার বিচারক সময়। কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা আর উদারতার রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়ে তিনি যে সবাইকে বিপদের মুখে ফেলে গেলেন, এটা শতভাগ সত্য। ঘুরে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগবে। আর এই সময়কালে বাংলাদেশ ও ওপার বাংলার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন ভাবার বিষয়।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি (৫৫-৬০ শতাংশ) আসে বোরো মৌসুমে। এর মধ্যে সাতটি হাওরবেষ্টিত জেলায় উৎপাদিত হয় প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু এবার উৎপাদন মৌসুমে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় কৃষকের আহাজারির শেষ নেই। কারণ, চৈত্র মাসের শেষ দিক থেকে টানা বৃষ্টি আর বৈশাখে উজান থেকে...
৮ ঘণ্টা আগে
একটি জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয় মূলত তার প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত কাঠামোর ওপর। কাগজ-কলমে বাংলাদেশে শিক্ষার হার আগের চেয়ে বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ঠিকই রয়ে গেছে। আর এই সংকটের পেছনে রয়েছে এক নির্মম সত্য।
৯ ঘণ্টা আগে
বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা দরপত্র বা টেন্ডারের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বরগুনারস্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তিনজন বড়...
৯ ঘণ্টা আগে
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান। তিনি নরওয়ের বারগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং অস্ট্রেলিয়ার নিউ ইংল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাইব্রিড পিসবিল্ডিংয়ের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
১ দিন আগে