Ajker Patrika

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে তরুণদের দায়িত্ব

ড. রাজীব চক্রবর্তী
শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে তরুণদের দায়িত্ব
সময় এসেছে আমাদের দেশের পরীক্ষা পদ্ধতি আধুনিকায়ন করার। ছবি: আজকের পত্রিকা

কেউ যদি এখন জানতে চায়, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী রাতে চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে যান। সবাই এক বাকে বলবে বিদ্যুৎমন্ত্রী ছাড়া আপাতত অন্যরা রিলাক্সে ঘুমাতে যান! তবে মাঝেমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে একটু চাপান-উতোর চলে। এখন ‘জ্বালানি নেই’ সিজন। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, চুলায় আগুন নেই।

তবে কিছুদিন আগেও শিক্ষামন্ত্রী ছাড়া অন্যরা শান্তিতে ছিলেন। তখন ছিল ‘শিক্ষা’ সিজন। তখন অবস্থা এমন ছিল যে প্রতিদিন কোনো না কোনো পরীক্ষা চলেছে, সেটা হোক এসএসসি, এইচএসসি, মেডিকেল ভর্তি কিংবা চাকরির পরীক্ষা। বিগত সরকারের আমলে কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ‘আউট’ হলে, ব্যস! আগে শুনতাম শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসে বিপদ। এখন ঝড়, বাদল, আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি, কেন্দ্রে পানি উঠেছে কি না সেই খবর নিয়েই মনে হয় মাননীয় মন্ত্রীকে ঘুমাতে যেতে হয়।

অথচ দেখুন, অন্য মন্ত্রীরা, যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোট-টাই পরে দেশ-বিদেশ ঘোরেন। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও কোট-টাই পরে ঘোরেন। তবে সেটা দেশের ভেতরে পরীক্ষাকেন্দ্রে, বিভিন্ন সেন্টারে। নকল ধরতে। ২৫ বছর আগেও তিনি হেলিকপ্টার নিয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গিয়ে নকল বন্ধ করেছেন। তখন তিনি ছিলেন সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।

কিন্তু এখনকার শিক্ষার্থীরা জেন-জি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এরা সব দিকে এগিয়ে। তথ্য আদান-প্রদান, টেকনিক্যাল বিষয়, যোগাযোগ, নতুন আইডিয়া খোঁজা, সবকিছুতে এরা দ্রুত। ফলে এদের অন্য কাজ থেকে বিরত রেখে পড়ার টেবিলে ব্যস্ত রাখার জন্য দায়িত্বরতদের কৌশলী হতে হবে। এই ছাত্ররা সবাই আমাদের মতো মা-বাবার সন্তান। সবাই চান তাঁর সন্তান কাঙ্ক্ষিত লেখাপড়া শেষ করুক। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিন্তু ভুলের জন্য ইতিমধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ভারতের শিক্ষামন্ত্রী সেই সুযোগও পাননি। জানা যায়, তিনি ভারত সরকারের খুব প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। তিনিও কিন্তু ৩০ বছর আগের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতা হিসেবে পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তনের আন্দোলন করে আজকের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

ইদানীং শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল পরিদর্শন ও শিক্ষকদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী, নো ডাউট পরিশ্রমী। প্রথম দিনের সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে সংসদ ভবনের প্রবেশপথে লোহার চেইনের ব্যারিকেড যেভাবে লাফ দিয়ে পার হয়েছেন, সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সবাই বলেছিল এনার্জেটিক মন্ত্রী। আর এখন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি ব্যতিব্যস্ত। এই আবার কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর। ব্যস, আর কী! রাতের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন। কেননা যারা রাত-দিন এক করে লিখিত পরীক্ষায় টেকার পর জানতে পারে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, তখন তাদের চান্স পাওয়ার আশা কমে যায়। ছাত্ররা তখন আন্দোলনে নামে। আবার একশ্রেণি দেশের অস্থিরতা, দৈব-দুর্বিপাকের সুযোগে অটো পাস চায়। মানে, শিক্ষামন্ত্রীর ঘুম হারাম। সরকার বেকায়দায়। আবার তৃতীয় পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে চায়। এটাই হচ্ছে এখন চলতি শিক্ষা-রাজনীতি, যেটা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এগুলোর উৎপত্তি কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। মন্ত্রী-এমপিসহ ঊর্ধ্বতনদের বেফাঁস মন্তব্য সরকারের জন্য বিপদ ডেকে আনে। বিগত সরকারের আমলেও কোটা আন্দোলনের উৎপত্তির দিকে তাকালেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরের মন্ত্রীদের দিনের পর দিন ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর বল প্রয়োগ, কোটা আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

একই ঘটনা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও দেখা গেছে। দুই দেশেই আন্দোলনকারীদের পরিচয় যেমন এক, তেমনি আবার তারাই সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছে। কারণ তাঁদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। তাঁরা সবাই ছাত্র। দুই দেশেই এখন বেকারত্ব একটি জটিল সমস্যা। ভারত যেমন বড় অর্থনীতির দেশ, তেমনি তাঁদের জনসংখ্যা অনুযায়ী বেকারত্বও বেশি। তারা একসঙ্গে পরীক্ষা দেয় ২০ লাখ ছাত্র।

তবে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদেরই জয় হয়েছে। ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের প্রধানমন্ত্রী পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনে নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন। যেটা রাজনৈতিক দলগুলো পারেনি, সেটা বিদেশ থেকে আসা এক ছাত্রের এক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গড়া তেলাপোকা পার্টি এক মাসের মধ্যে করে দেখিয়েছে। প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত সরকারে যারা আছে, তারা এখন এক বিপদে।

সময় এসেছে, আমাদের দেশেও পরীক্ষাপদ্ধতি আধুনিকায়ন করার; যোগ্য ও টেকনিক্যালি অভিজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষাপদ্ধতি কম্পিউটার-বেইজড করার। বছরের শুরুতে সবার হাতে বই তুলে দেওয়াকেই এখনো দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশাল অর্জন বলে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি চলছে।

বিগত সরকারের সময়ে যোগ হয়েছিল আরেক রোগ। ঘন ঘন শিক্ষা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই রোগের বালাই ছিল। একেক সরকার আসে আর শিক্ষা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থা এখানে উপযোগী না। ইউরোপে এক ক্লাসে ছাত্র ২০-২৫ জন। আর আমাদের এত ছাত্র, রোল কল করতে করতেই ক্লাসের ৪০ মিনিট শেষ! প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক চট্টগ্রামের নিউমার্কেট থেকে আড়াই ঘণ্টায় তিনটা বাস পরিবর্তন করে গ্রামের ভুজপুর স্কুলে পৌঁছান। ফেরার সময় জ্যামে তিন ঘণ্টা। কখন যে পড়ানোর সময় পান শিক্ষক!

আর উচ্চশিক্ষা হয়েছে ব্যবসা। শতবর্ষ সরকারি কলেজগুলোর মান উন্নয়ন না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তিমালিকানায় বিগত সরকারগুলো কিছু মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে।

তরুণেরাই যেহেতু এখন পরিবর্তনের ধারক হয়ে উঠেছে, তাই তাদেরই রাজনীতির বাইরে গিয়ে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। ক্লাসে ছাত্রদের প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে ‘স্যার, আপনার নতুন গবেষণা সম্পর্কে আমাদের জানান। প্রয়োজনে আমাদেরও যুক্ত করুন।’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্প শিক্ষকদের দিয়ে সাত-আটটা করে কোর্স নিতে হয়। আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহে গুটিকয়েক ক্লাস নিয়ে যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাড়তি আয়ের জন্য। এসব অনাচার বন্ধ করলেই ছাত্ররা ক্লাসে ব্যস্ত থাকবে। পড়ার মান বাড়বে। লাল, নীল, সাদা দলের পেছনে না দৌড়ালে শিক্ষকেরা আরও সম্মানিত হবেন।

লেখক: গবেষক ও পরিচালক চট্টগ্রাম উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত