Ajker Patrika

বদরুদ্দীন উমরের মতাদর্শের ধরন

সৌভিক রেজা
বদরুদ্দীন উমরের মতাদর্শের ধরন
বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১ – ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

‘মার্ক্সবাদের ঐতিহাসিক বিকাশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মার্ক্স সম্পর্কে এঙ্গেল্সের উদ্ধৃতি টেনে লেনিন বলেছিলেন, ‘আমরা যা প্রচার করেছি তা গুরুবাক্য কিছু নয়, তা হলো কর্মসাধনের পথসূচক মাত্র। মার্ক্সবাদের যে দিকটা প্রায়ই দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়, এই চিরায়ত উক্তির মধ্যে সেই দিকটার ওপরই অতি স্পষ্ট আকারে সুতীব্র জোর দেওয়া হয়েছে।’ সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এই দিকটাকে দৃষ্টির অগোচরে রাখার ফলেই আমরা মার্ক্সবাদকে এমন একটা কিছুতে দাঁড় করাই, যা একপেশে, বিকৃত ও প্রাণহীন; তার সজীব আত্মাকেই আমরা বাদ দিয়ে থাকি, তার যে মৌলিক তাত্ত্বিক ভিত্তি-দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, বিরোধবিধৃত আনুপূর্বিক সমগ্র ঐতিহাসিক বিকাশের সেই তত্ত্বকেই আমরা ছোট করে দেখি; ইতিহাসের প্রতিটি নতুন মোড় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে যুগের কর্তব্যকর্মেও যে বদল ঘটা সম্ভব, প্রতি যুগের সেই সুনির্দিষ্ট কর্তব্যকর্ম থেকে আমরা মার্ক্সবাদের সম্পর্কচ্ছেদ করে বসি।’

রাশিয়ায় মার্ক্সবাদের চর্চাকারীদের কারও কারও সম্পর্কে লেনিন যে কথাগুলো বলেন, সেটি আজকের বাংলাদেশের তথাকথিত মার্ক্সবাদী অনেকের ক্ষেত্রে ভয়াবহভাবে সত্য। বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর ছিলেন এমন একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, যিনি মার্ক্সবাদকে কখনোই গুরুবাক্য হিসেবে গ্রহণ করেননি, তাঁর হাতে মার্ক্সবাদী মতাদর্শ বিকৃত, প্রাণহীন এবং একপেশে কোনো রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবেও কখনোই চর্চিত হয়নি। এবং সেই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে তাঁর নিজের যুগোপযোগী কর্তব্যকর্ম স্থির করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একজন মার্ক্সবাদী হিসেবে এটিই তাঁর বিরাট সাফল্য।

বদরুদ্দীন উমরের মার্ক্সবাদচর্চার নমুনা হিসেবে তাঁর বিখ্যাত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ গ্রন্থে জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক লোকের ধারণা, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিষ্ঠার মধ্যে যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ঠ। সাম্প্রদায়িকতার চরিত্রকে বিশ্লেষণ করলে এ ধারণা যে বিভ্রান্তিমূলক, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। শুধু তাই নয়, এ বিভ্রান্তি যে বহুলাংশে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির উৎপত্তি সেটাও যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়।’ সেসব বিভ্রান্তি দূর করার প্রত্যয় নিয়েই তিনি সাম্প্রদায়িকতার একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তার মানে আবার এই নয় যে ‘সাম্প্রদায়িক’ সমস্যাকে তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে নিজের অভিমতের ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ধর্মনিষ্ঠা এবং সাম্প্রদায়িকতার এই প্রভেদ সত্ত্বেও অনেকের ধারণায় তারা অবিচ্ছেদ্য। এ ধারণাকে একটি সংস্কার হিসেবে গণ্য করা চলে। কিন্তু এ সমস্যার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে এর থেকে একদিকে বিকৃত সামাজিক চিন্তা এবং অন্যদিকে সক্রিয় রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির উৎপত্তি। মুসলমান অথবা হিন্দুর সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে সমর্থ হওয়ার অক্ষমতা আমাদের দেশের লোকের পক্ষে স্বাভাবিক মনে হয়। কারণ চিন্তার এ বিকৃতি আমাদের মধ্যে এসেছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে।’

একজন রাজনৈতিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও শিল্প-সাহিত্যের বিষয়েও কখনো মুখ ফিরিয়ে থাকেননি বদরুদ্দীন উমর। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ‘শিল্প-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কলাকৈবল্যবাদ নামে যে শঠতা প্রচলিত আছে, তার প্রধান কথা হলো শিল্পী-সাহিত্যিক ও অন্যান্য সংস্কৃতিসেবীরা সমাজের মধ্যে বসবাস করলেও তাদের সাধনা ও সৃষ্টির সঙ্গে সমাজের কোনো প্রয়োজনীয় সংযোগ নেই। অর্থাৎ সৃষ্টিকালে শিল্পী আকাশবিহারী হন এবং এমন এক কল্পলোকে বিচরণ করেন, যেখানে মানবিক ও সামাজিক সমস্যার তেমন কোনো স্থান নেই।’

আমাদের ইতিহাসচর্চার ধরনও বদরুদ্দীন উমরকে কখনো কখনো হতাশ করত। তিনি বলতেন, ‘প্রতিক্রিয়ার কাজে ইতিহাসকে ব্যবহার করার উপায় হলো ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করা এবং সম্ভব হলে ইতিহাস বিষয়ে জনগণকে ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখা।’ পাশাপাশি তাঁর এমনো মনে হয়েছে, ‘বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী এই দুইভাবেই ইতিহাসকে প্রতিক্রিয়ার খেদমতে ব্যবহার করছে। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এ নিয়ে...বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক তাঁদের মধ্যে কোনো আলোড়ন তো নেই-ই, এমনকি কোনো প্রতিবাদেরও লেশমাত্র নেই।’

মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী বদরুদ্দীন উমর তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একটা কথা শুধু বলা যেতে পারে যে পরিবর্তন না হলে বর্তমান অবস্থা থেকে বেরোনো যাবে না। একটা সামাজিক বিপ্লব ছাড়া এর থেকে বেরোনো যাবে না...আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে সেই বিপ্লব হতেই হবে; এই আশাবাদ তো আমাদের রাখতেই হবে।’ আর এই আত্মবিশ্বাস তিনি আমৃত্যু বজায় রেখেছিলেন।

২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কমরেড বদরুদ্দীন উমর পরিণত বয়সে প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও রক্তিম অভিবাদন।

লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত