সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের বেতন পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করা উচিত। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়ে পরিবর্তন—এসব কারণেই এই পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এর আগে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে আগের বেতনের দ্বিগুণ হয়েছিল। সেবার ছয় বছর পর দেওয়া হয়েছিল নতুন পে-স্কেল। এবার ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল এল। এবারও দ্বিগুণ হলো। হিসাবটা মাথায় রাখলে সরকারি কর্মচারীরা বলতেই পারেন, নতুন এই পে-স্কেলে তাঁদের আসলে ঠকানো হয়েছে! এ সময়ে দুবার পে-স্কেল পরিবর্তন হতে পারত। সে ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি হতো দুবার।
এগুলো আসলে সহজ গণিত। কিন্তু জীবন তো পাটিগণিতের নিয়মে চলে না। আর সেটা যদি আমাদের মতো গরিব দেশের মানুষের জীবন হয়, তাহলে আরও চলে না। জীবনের হিসাবনিকাশ বড়ই জটিল। সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর দেশজুড়ে এ নিয়ে সন্তুষ্ট মানুষের চেয়ে অসন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যাই যেন বেশি দেখছি। এটা কি নিছকই ঈর্ষাজনিত কারণে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো যৌক্তিক কারণও রয়েছে?
আমাদের দেশে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা বর্তমানে ১৪-১৫ লাখের মতো। আসলে সংখ্যাটা ১৯ লাখ। কিন্তু প্রায় ৪ লাখের মতো পদ খালি রয়েছে। এর বাইরে পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী রয়েছেন ৭ লাখের মতো। এই লোকগুলোর বাইরে আর কেউ বেতন বৃদ্ধির কারণে খুব খুশি হয়েছেন, তা মনে হয় না। এমনকি যাঁরা এই বাড়তি বেতন দিতে রাজি হয়েছে, সেই সরকারও যে খুব আনন্দচিত্তে এটা দিচ্ছে—সেটাও মনে হয় না। তারা দিচ্ছে অনেকটা বাধ্য হয়ে। এই নতুন পে-স্কেল কিন্তু নতুন সরকার ঘোষণা করেনি। এটা পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ। অনেকে মনে করেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রচুর অপকর্ম করেছে, তার মধ্যে প্রধান দুটি হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন ও সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে-স্কেল ঘোষণা করা। এ দুটি কাজের মাধ্যমে তারা নতুন সরকারের জন্য পথচলাকেই কঠিন করে দিয়ে গেছে। এমন কথা বলার মাধ্যমে পে-স্কেলের যৌক্তিকতা নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি—তেমন মনে না করার জন্য অনুরোধ করব।
আসলে আমি বলতে চেয়েছি, নতুন একটা সরকার যদি যাত্রার শুরুতেই বাড়তি লক্ষাধিক কোটি টাকার একটা ব্যয়ের মধ্যে পড়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে একটা দিশেহারা ভাব তৈরি হতে পারে। এ কাজটিই যদি এই বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর, নতুন একটা কমিশন গঠন করে, সেই কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক করত, তাহলে তাদের জন্য সহজ হতো। কিন্তু সে সুযোগ এই সরকার পায়নি।
আমাদের সরকারের আকার নিয়েও একটা প্রশ্ন অনেক দিন ধরেই উচ্চারিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রথম দিকের একটা হিসাবে দেখা যায়, সরকারের মোট যে রাজস্ব আয়, তার ৪৩ শতাংশই ব্যয় হয়ে যায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। এবার নতুন বেতন স্কেল হয়েছে। নতুন এই স্কেলের হিসাবকে ধরলে দেখা যাবে, মোট রাজস্ব আয়ের ৫৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হয়ে যাবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশনে। পৃথিবীর যেকোনো দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই এটা একটা অবিশ্বাস্য বণ্টন। মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি যদি এভাবে কর্মচারীদের জন্য ব্যয় হয়, তাহলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলবে কীভাবে?
অনেকে হয়তো জানতে চাইতে পারেন, সরকারের সাইজ এত বড় করার দরকারই-বা কী? এর সম্ভাব্য জবাবটাও মোটেই সুখকর নয়। আসলে সরকার যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা তাদের অনুগত কর্মচারীদের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। তাদেরকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়, যাতে তারা সরকারের প্রতি অনুগত থাকে।
এই অনৈতিক চেষ্টাটা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। এ সময়ে সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে সামরিক ও সশস্ত্র কর্মচারীদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চপদস্থদের অনৈতিক অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একটা উদাহরণ দিই, ডেপুটি সেক্রেটারি বা এর উচ্চ পর্যায়ের আমলাদের অবিশ্বাস্য একটা সুবিধা আছে। গাড়ি কেনার জন্য সরকার তাঁদের বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা লোন দেবে। সেই টাকায় গাড়ি কেনার পর তার বিপরীতে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ! এই যে সুবিধা প্রদান, আমার সহজ বুদ্ধিতে এটাকে নিছক ‘ঘুষ’ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। শেখ হাসিনার সরকারের সময় থেকে এই ‘ঘুষ’টা শুরু হয়েছে। হাসিনা সরকার যে উচ্চপদস্থ আমলাদেরই ঘুষ দিয়েছে তা নয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়, যেটাকে অনেকে ‘নিশিরাতের নির্বাচন’ হিসেবেও অভিহিত করে, বিভিন্ন স্তরের পুলিশকেও ঘুষ দিয়েছে। রাতের মধ্যেই ভোট কার্যক্রম যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয়, সে জন্যই পুলিশকে দেওয়া হয়েছে নগদ অর্থ!
কিন্তু তারপরও কি শেষ রক্ষা হয়? হয়েছে? অনৈতিকভাবে গদি আঁকড়ে থাকা শাসকগোষ্ঠী আসলে ভুলেই যায়, প্রশাসন বা কর্মচারীরা নয়, চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের রক্ষাকর্তা আসলে দেশের সাধারণ মানুষই। এই যে ২০-২২ লাখ লোকের জন্য মোট রাজস্ব আয়ের অর্ধেকের বেশি ব্যয় করা, এতে কি বাকি মানুষেরা বঞ্চিত হচ্ছেন না? আচ্ছা, আমরা নাহয় চাকরিজীবীদের কথাই ধরি। সরকারি হিসাবেই দেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা পৌনে সাত কোটির মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছেন কৃষিজীবী মানুষ, প্রায় আড়াই কোটির মতো। কিছু আছেন শ্রমজীবী, দিনমজুর। এর বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে চাকরিজীবী রয়েছেন কমপক্ষে দেড় কোটির মতো। এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ, পরিবার, এদের বেতন কি এর মধ্যে বেড়েছে? তাঁদের সংসার চলবে কীভাবে? এদের নিয়ে কি সরকার ভেবেছে? একটা ভোটের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সেখানে কি এই দেড় কোটি মানুষের কোনো ভূমিকা ছিল না? আপনারা ক্ষমতায় আসবেন এদের ভোটে, আর দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা দেবেন মাত্র ২০ লাখ মানুষকে, এটা তো একধরনের প্রতারণা। অথচ মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে যে আমলা বা কর্মচারীদের নানা রকম অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সংকটের মুহূর্তে তাঁরা কিন্তু আর সঙ্গে থাকেন না, পল্টি মারেন।
নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তার কিছু না কিছু প্রভাব বাজারে পড়ে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা কোনো বাজার নেই। একই বাজার, যেখানে বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও যেতে হয়। তাহলে সেখানে একধরনের বৈষম্য কি তৈরি হয় না? আচ্ছা, বেসরকারি চাকুরেদের জন্য সরকারের কি কিছুই করার নেই? সরকার কি তাঁদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না? সরকার কি মনিটরিং করে দেখতে পারে না, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মচারীদের যে বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে, সেগুলো যথাযথ হচ্ছে কি না?
আমি একটা বড় প্রতিষ্ঠানের কথা জানি, যেখান মাস্টার্স পাস করা একজনের বেতন ধরা হয় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা! অথচ নতুন পে-স্কেলে একজন ঝাড়ুদারেরও মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, অন্যান্য ভাতাসহ এটা গিয়ে দাঁড়াবে ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। স্বীকার করি, বর্তমান বাজারে এই বেতনও হয়তো পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু ভাবুন তো, তবুও অষ্টম শ্রেণি পাস এই লোক মাস শেষে ৩৬ হাজার টাকা নিয়ে ঘরে যেতে পারছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে ওই লোক ১৮ হাজার টাকা নিয়ে ঘরে ফিরবেন কীভাবে? তাঁরা কি এই দেশের নাগরিক নন? তাঁরা কি ভোট দেন না? তাহলে তাঁদের প্রতি সরকারের কোনো দায়িত্ব থাকবে না কেন?
অনেকে হয়তো ভাববেন, আমি সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদকে উসকে দিচ্ছি। আসলে তা নয়। আমি কেবল বাস্তবতাটাকে তুলে ধরছি। এ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে চূড়ান্ত পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভালো বীজের গল্প, সঠিক সময়ে সেচ পাওয়ার গল্প, প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার গল্প, কৃষকের নিরলস শ্রম এবং সর্বোপরি একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। ধানের শিষটি যখন কৃষকের মাঠে দুলতে থাকে তখন তার পেছনে কাজ করে যায় বহু প্রতিষ্ঠানের নীরব প্রচেষ্টা।
৬ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশের অন্যতম মশা গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। মশা নিয়ে জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
১ দিন আগে
সামনে পূজার ছুটি। শহর ছেড়ে লাখো মানুষ তখন ছুটবেন গ্রামের বাড়ির পথে। তাঁদের বড় ভরসা ট্রেন। প্রতিবছরের মতো এবারও কেউ ভোরে কাউন্টারে দাঁড়াবেন, কেউ মোবাইল ফোন হাতে বসে বারবার টিকিট কাটার চেষ্টা করবেন। কিন্তু বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিট পরই দেখা যাবে, টিকিট শেষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়...
১ দিন আগে
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতেই তুলে দিল সরকার। বিরোধী রাজনৈতিক দল,শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি ও প্রতিবাদের মধ্যেই ১৫ বছরের জন্য চুক্তি হয়ে গেল।
১ দিন আগে