আমার বয়সী অনেক বন্ধু বলে, বন্ধু, আসো না একদিন একটু আড্ডা দিই। শুনে হাসি পায়। আড্ডা দেওয়ার জন্য এ রকম আমন্ত্রণ জানাতে হয়! আমার নীরবতা লক্ষ করে তারপর বলে, এসো খাওয়া-দাওয়া হবে, অনেক দিন পরে আমরা বেশ কয়েকজন একসঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠব। এবার আমি বেদনা অনুভব করি। আড্ডার জন্য খাওয়া-দাওয়ার লোভ দেখাতে হচ্ছে। অথচ এই বন্ধুটির সঙ্গে দিনের পর দিন, কখনো রাত কাবার হয়ে গেছে। আড্ডা দিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীফ মিয়ার ক্যানটিনে, এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে, বাংলা একাডেমির গেটের পাশে চায়ের দোকানে, পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ে এবং শেষ দিকে আজিজ মার্কেটে, ছবির হাটে, নিউমার্কেটের নলেজ হোমের সামনে এবং আরও অনেক জায়গায়। কখনো চায়ের দোকানের ভেতরে, কখনো বাইরে ইটের ওপর কাঠের তক্তা বসিয়ে একটুখানি বসার জায়গা করে। বর্ষায় তুরাগ নদের নৌকায় আর ভ্রাম্যমাণ আড্ডা তো আছেই। বিশেষ করে ট্রেনে, লঞ্চে—কোথায় নয়।
শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও অসংখ্য আড্ডার জায়গা ছিল একসময়। রেলস্টেশনগুলোতে একসময় নিউজ কর্নার ছিল। পত্রিকা পাওয়া যেত, সঙ্গে কিছু লিটল ম্যাগাজিনও। এমনি করে কৈশোর পেরিয়ে যৌবন এবং যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে এসেও মহিলা সমিতির সামনে, শিল্পকলা একাডেমিতে আড্ডার মানুষ খুঁজে বেড়াই। আমি একা নই, আমার বয়সী বা আমার চেয়ে বয়সে কম যারা, তারাও। অবশ্য আজকের লেখকেরা কাটাবনের পাশে কনকর্ডের নিচে অথবা মিরপুরে অথবা মগবাজারে আড্ডার একটা জায়গা খুঁজে নিয়েছে। একেবারেই যারা তরুণ তাদের অবশ্য আড্ডার প্রয়োজন হয় না। চারজন সমবয়সী বন্ধু বসে আছে, হাতে তাদের মোবাইল। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেই না। চা খাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তাদের জীবনে নেই। অথচ যারা আড্ডা দেয় তাদের চায়ের প্রয়োজন হয়। আমরা তো সেই সময়ে এক কাপ চা একাধিকজনে ভাগ করেও খেতাম।
বেশ কিছুদিন আগেও দেখেছি পাড়ায় পাড়ায় শরীর সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামকে ঘিরে আড্ডা জমে উঠত। মিরপুরে একটা জায়গায় একটা হাসির ক্লাব গড়ে উঠেছিল। সকালবেলায় একটু ব্যায়াম করার পর সব প্রবীণ হাসতে শুরু করত। অতঃপর চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিত। আড্ডার বিষয়বস্তু বিচিত্র। কারও কাছে খেলাধুলা, কারও কাছে শিল্প-সংস্কৃতি, কেউ আবার বাজারদর ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলত। আবার একটা বিষয় নিয়ে কেউ বসে থাকে না, ছড়িয়ে যেতে থাকে তার ডালপালা। তবে সবচেয়ে মুখরোচক বিষয় হচ্ছে রাজনীতি। কিন্তু রাজনীতিতে যখন মব চলে এল, তখন সবাই ওই বিষয়টিকে আড্ডার বিষয় না করে ঘরের আলোচনার বিষয় করে ফেলল। এখন ঘরে ঘরে রাজনীতি। ১৮ কোটি লোকই পারলে ঘরে রাজনীতির আলাপ করে।
যে কথাটি বলার জন্য এত কথার অবতারণা তা হলো—আড্ডা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? আড্ডা ছাড়া সৃজনশীল সমাজ হয় কী করে? আড্ডাই তো হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠতম সংসর্গ।
আমরা কয়েকজন আড্ডাবাজের কথা জানি। তার মধ্যে শীর্ষে আছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তুখোড় আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই একটা আড্ডার চক্র গড়ে উঠেছে। সেটি তাঁর নিজ শহর ঢাকা বা কাবুল বা মিসরের কায়রো বা জার্মানি। আর তাঁর হাতেখড়ি তো শান্তিনিকেতনে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই আড্ডাবাজ মানুষটি এতগুলো ভাষা শেখার সময় পেলেন কোথায়? এত লেখার কাজই কখন করলেন? তাহলে কি তিনি আড্ডা থেকেই তাঁর লেখার রসদ সংগ্রহ করতেন? নাকি আড্ডাই ছিল তাঁর প্রেরণা। আড্ডা শেষ হলেই তাঁর লেখার কাজ শুরু হতো, আবার লেখা শেষ হলেই আড্ডায় ছুটে যেতেন।
জাতি হিসেবে বাঙালি এবং শহর হিসেবে কলকাতা আড্ডাবাজদের এক মহা আখড়া। তার পাশাপাশি ফরাসি দেশ হলো আড্ডাবাজদের দেশ। তার মোকাম হলো প্যারিস। এমনি করে পৃথিবীর সব দেশে আড্ডার জায়গার অভাব নেই। কোনো কোনো দেশে কফির দোকান, কোনো কোনো দেশে আবার বার, রেস্তোরাঁ, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে। জাপানের শহরগুলোতে দেখেছি তুখোড় আড্ডার জায়গা হচ্ছে বার এবং রাস্তার পাশের ছোট ছোট সাকের দোকান। যেখানে স্বর্গীয় সাকের সঙ্গে অনুপান হিসেবে ইয়াকিটোরি পাওয়া যায়। ইয়াকিটোরি মানে হচ্ছে মুরগির গিলা, কলিজা, ডানার কাবাব।
ঢাকা শহরের আড্ডার ইতিহাসে এক অতি আশ্চর্য সংবাদ পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে শিক্ষকদের কোয়ার্টারের সামনের একটা গাছের গুঁড়িকে ঘিরে। সেখানে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক, প্রফেসর আহমদ শরীফসহ অনেক জ্ঞানীজনের বৈকালিক আড্ডা বসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপকের আড্ডাই হতো সেখানে।
বলা হয়ে থাকে ষাটের দশক আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল সময়। সেই সময়টা আড্ডার ইতিহাসেও এক সুবর্ণ যুগ ছিল। এ সময় রাজনীতিই মুখ্য আড্ডার বিষয় হলেও শিল্প-সাহিত্যের একটা স্বর্ণযুগ বলা যায়। সারা বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেশের সমঝদারদের সম্পর্ক গড়ে উঠছে। দর্শন, অর্থনীতি, বিজ্ঞান—সবকিছুই নিয়ে তখন যেন গনগনে চুলার মতো উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তেমনি আড্ডার চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। সেই জন্যই মানুষ বুঝতে পারছে কী হয়েছে, কী হচ্ছে এবং কী হওয়ার সম্ভাবনা আছে? পত্রিকা, বই-পুস্তক পড়ে যা বোঝা যায় না, আড্ডায় তা একেবারে জলবৎতরলং তা। একেবারেই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যেত এবং দুরন্ত সাহসের সঙ্গে সবাই রাজা-উজির মেরে ফেলত। আড্ডায় রাজা-উজির মারতে মারতে একসময় সত্যি আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের পতন হলো।
আড্ডার এমন একটা দুর্দমনীয় শক্তি, যা কাউকে ভয় পায় না। আড্ডাবাজ কাজী নজরুল ইসলাম হয়তো কোনো আড্ডা থেকেই বলে উঠেছিলেন—দুর্নিবার প্রকাশের দুরন্ত সাহস। শান্তিনিকেতনের শৃঙ্খলার মধ্যে থেকেও পরবর্তীকালের বড় বড় মনীষী কালীর দোকানের চায়ের সন্ধান পেয়েছিলেন।
আজকাল আড্ডার হাহাকারের মধ্যে একটি সত্যই লুকিয়ে থাকে তা হলো—মানুষে মানুষে যোগাযোগটাই ভীষণভাবে কমে গেছে। কেউ কারও কথা শোনে না, কেউ কারও ধার ধারে না। কেউ কারও সঙ্গে নিজেকে মেলাবার চেষ্টা করে না। সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হচ্ছে, কেউ বিরুদ্ধমত সহ্য করতে পারে না। কোথাও কোথাও কিছু লোক একত্র হলেই সবাই একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। অথবা ক্লাসরুমের মতো, সেমিনারের মতো একাই একজন বলে যাচ্ছে আর সবাই বুঝে বা না বুঝে তা শুনছে।
প্রযুক্তির ভয়াবহ উল্লম্ফনের কারণে আড্ডা এখন আর সেভাবে জমে ওঠে না। নিজের মত প্রকাশের জন্য ফেসবুক এখন হাতের মুঠোয়। বলে যাচ্ছে একা, প্রতিবাদও হচ্ছে একা। অন্তহীন প্রতিবাদে কোনো মীমাংসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করাও বৃথা। একধরনের পাগলামির মতো স্বগত সংলাপ বলে যাচ্ছে প্রতিটি মানুষ। অন্তহীন এই স্বগত সংলাপ বিরতিহীনভাবে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই একসময় সমাপ্তি টেনে দিচ্ছে। মনোযোগ কাড়ার জন্য চটকদার কিছু কথা বলে ফেসবুকে আলোচনায় থাকার এক সীমাহীন প্রচেষ্টা চলছে। তবে এরও একটা ক্লান্তি আছে। যে ক্লান্তির একটা সহজ সমাধান আড্ডা। তবে সে আড্ডার আনুষ্ঠানিকতা নয়, অনেক সময় ভারী ভারী বিষয়বস্তুকে আড্ডার বিষয় করার জন্য কিছু আয়োজনও হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো আড্ডাবাজেরা থাকেন না। আড্ডার জন্য অবশ্যই আড্ডাবাজ লাগবে, যাঁরা আড্ডাকে একটা শিল্পে পরিণত করতে পারেন। আড্ডা শিল্পটাই বা কেমন? সে কি সাজানো-গোছানো কবিতার একটি পঙ্ক্তিমালা, নাকি স্বতঃস্ফূর্ততার, আনন্দের, ক্ষোভের, বেদনার, সহমর্মিতার, ভিন্ন চিন্তার অপরিকল্পিত কিছু প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অপরিপক্ব সংলাপ। আড্ডা ছাড়া কি কোনো সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায়? কোনো সৃজনশীল সমাজের স্বপ্ন দেখা যায়? আড্ডার জন্য কত লোকের চাকরি গেল। কত সংসার ভেঙে গেল। আবার কত সংসার জোড়াও লাগল। কত মান-অভিমানের সৃষ্টি হলো, আবার অভিমান ভাঙল। এসব মিলিয়েই যেমন সমাজ, তেমনি আড্ডারও সমাজ। আজকের দিনে সমাজের নিত্য নিষ্ঠুরতায় একাকী লোভের রাজত্বে আবার আড্ডার সংস্কৃতিকে কি ফিরিয়ে আনা যায়? যেখানে মানুষ নতুন করে বাঁচবে।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

বিশ্বকাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। কোটি কোটি মানুষ তখন একসঙ্গে হাসে, কাঁদে, উদ্যাপন করে। ২০২৬ বিশ্বকাপও সেই উৎসবেরই অংশ। কিন্তু সবার জন্য বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা এক নয়। মাঠে খেলা শুরু হওয়ার আগেই কিছু খেলোয়াড়, সমর্থক ও কর্মকর্তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন এক বাস্তবতার...
৩ ঘণ্টা আগে
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এক মাদ্রাসাশিক্ষক বেশ একটা বীরত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তিনি তাঁর শিক্ষার্থীকে মারধর করে দাঁত ভেঙে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আহত শিক্ষার্থীর মা বলেছেন, ‘আসরের নামাজের সময় সবাই খেলে। ওই সময় পাশে এক বড় ভাই মোবাইল ফোন দেখছিল।
৩ ঘণ্টা আগে
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিষয়টি বেমানান। বাংলাদেশে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু দেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবনের কারণে শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এখনো এ ধরনের দৃশ্য মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনাটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার গড়িনাবাড়ী ইউনিয়নের কাশিমপুর সরকারি...
১ দিন আগে
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন গেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কূটনীতি বা অর্থনীতির প্রয়োজনে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়মিতভাবেই বিদেশ সফর করতে হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর দুটিকে শুধু গতানুগতিক সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই।
১ দিন আগে