Ajker Patrika

জলাবদ্ধ নগরে জবাবদিহির খরা

জলাবদ্ধ নগরে জবাবদিহির খরা
জলাবদ্ধতা শুধু সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়; এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি বিপুল। ছবি: আজকের পত্রিকা

কাঠফাটা রোদ আর হাড়মাংস আচার হয়ে যাওয়া গরমের পর বর্ষার বৃষ্টি আমাদের জীবনে প্রশান্তি বয়ে আনে। এটাই আবহমান বাংলার ষড়্ঋতুর রূপবৈচিত্র্যের অন্তহীন খেলা। কাজেই বর্ষা আর তার বিভিন্ন মাত্রার বারিধারা আমাদের জীবনযাত্রারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিছু ঝক্কিঝামেলা বাদে বাংলার প্রকৃতি তার অন্যতম মোহনীয় রূপে সাজে এই ঋতুতে। কিন্তু সেই বর্ষার বৃষ্টি এই ইট-সিমেন্ট-বিটুমিনে আপাদমস্তক মোড়ানো রাজধানীতে স্বস্তির বদলে প্রায়ই মহা আতঙ্কে পরিণত হয়। আজকাল এক-দুই ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি মানেই ঢাকার জীবন স্থবির হয়ে যাওয়া। সড়কগুলো তখন নদীতে পরিণত হয়, নিচু এলাকার বাড়িঘরের নিচতলায় ঢুকে যায় পানি, রাজপথে যানবাহন হয়ে পড়ে অচল। ঢাকায় বড় বৃষ্টি মানেই লাখ লাখ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়া।

অতিবৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা ঢাকাকে বহুদিন ধরেই ভোগাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে হাজার হাজার কোটি টাকার নানা ধরনের নানা আকারের প্রকল্পও হয়েছে। কিন্তু ফলের দিকে তাকালে বলতেই হবে, যোগফল শূন্য—কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর অন্তত ১২৯টি স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অসংখ্য সড়ক, অলিগলি, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। বকশীবাজারের মতো জায়গায় নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যেতে দেখা গিয়েছে পরীক্ষার্থীকে। কোথাও কোথাও পানি ঢুকে পড়েছিল ঘরবাড়ি ও দোকানপাটেও।

বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি জবাবদিহির গুরুতর সংকটের অনিবার্য পরিণতি এই জলাবদ্ধ ঢাকা। কাজেই কারণটা অজানা নয়। কিন্তু সমাধান সহজে মিলছে না। তাহলে অদৃষ্টবাদী হয়ে কি মেনে নিতে হবে এ ভোগান্তি রাজধানীবাসীর কপালের লিখন?

সরকারি হিসাবে জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য শুধু গত এক দশকেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। নালা নির্মাণ, সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য এই বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ হয়েছে। ২০২০ সালের পর পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের হাতে যাওয়ার পর আরও শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো বেশি বৃষ্টিতে রাজধানী কার্যত অচল হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পানি সরাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা কার্যত পানিতেই তলিয়ে গেছে। প্রত্যাশিত ফল আর দিচ্ছে না। এ ব্যর্থতার দায় কার?

প্রতিবছর বর্ষা এলেই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং সংস্থাগুলো একই ধরনের ব্যাখ্যা দেয়। কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের তত্ত্ব দিয়ে বলেন, অতিবৃষ্টি বেড়ে চলেছে, এ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক, বিশ্বের কত বড় শহর তলিয়ে যায় ইত্যাদি। কেউ আবার চিরাচরিত খাল দখল বা খালে-নর্দমায় আবর্জনা ফেলার চিত্র তুলে ধরেন। মোদ্দা কথা, কেউই নিজের গায়ে দায়িত্ব নেন না। সব দোষ ঝেড়ে ফেলেন। এসব কারণ অবশ্যই সত্য। কিন্তু এটা তো নতুন বা অনন্য কিছু নয়। বিশ্বের অনেক শহরই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করছে। তাদের অনেকেই ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়িয়েছে, জলাধার সংরক্ষণ করেছে, প্রযুক্তিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। ঢাকার জন্যও তো অর্থব্যয় বিস্তর হয়েছে। তাহলে ঢাকা কেন এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারল না?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৭টি স্লুইসগেটের একটিও বর্তমানে সচল নয়। যে অবকাঠামো নগরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বছরের পর বছর অচল পড়ে আছে। একটি দেড়-দুই কোটি জনসংখ্যার মহানগরের নিকাশি ব্যবস্থাপনার এমন মৌলিক অবকাঠামো যদি অকেজো থাকে, তাহলে জলাবদ্ধতা দূর হবে কী করে? নগর-পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্য সমস্যার গভীরতর এবং বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে। তাঁদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল সংকট কেবল কিছু ড্রেন বা খাল-নালা বন্ধের নয়। বরং এটি পুরো নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। রাজধানীর আকার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নিচু জলাধার ভরাট করা হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়া খালগুলোর বেশির ভাগই তো এখন পাওয়া যায় পুরোনো ম্যাপে। স্বাধীনতার পর ধরলেও ঢাকায় সম্ভবত হাজারো পুকুর ছিল। এখন কয়টা আছে? খোঁজ নিলেই যে চিত্র বেরিয়ে আসবে, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। তাহলে বৃষ্টির পানি আর যাবে কোথায়?

ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান ও মহাপরিকল্পনায় জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার এবং প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা উপেক্ষিত হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু পরিকল্পনা মেনে হয়নি। ফলে একদিকে যেমন শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, অন্যদিকে পানি ধারণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা চিরতরে ধ্বংস করা হয়েছে। এই শহরে খাল বন্ধ করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের বক্স কালভার্ট, যা ভেতরে হাজার টনের বর্জ্য জমে প্রায় অচল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আত্মঘাতী উন্নয়ন ছাড়া আর কী বলবেন?

জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বা ব্যর্থতা। ড্রেন, নালা ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার হয় না। প্লাস্টিক সামগ্রী, পলিথিন, নির্মাণ বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনায় পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষার সময় এসব ড্রেন কার্যত অকার্যকর। নাগরিকদের অসচেতনতা যেমন এখানে দায়ী, তেমনি দায় এড়াতে পারে না সিটি করপোরেশনও। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সমস্যা কখনোই সমাধান কি হবে? বহু টাকা খরচ করে টিভি ক্যামেরা ডেকে খাল পরিষ্কারের ছয় মাস পর কী হয়, তা দেখতে কেউ সেখানে যান কি?

জলাবদ্ধতা শুধু সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়; এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি বিপুল। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না বলে উৎপাদনকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে যায়। যানজটে নষ্ট হয় অসংখ্য কর্মঘণ্টা। রাস্তার ময়লাপূর্ণ বা সরাসরি নর্দমার পানি বাসাবাড়িতে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে।

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যখন নাগরিকেরা একই দুর্ভোগে পড়েন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, কার পেটে যায়? প্রকল্পগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, তার স্বাধীন মূল্যায়ন করা হয়েছে কি?

বিএনপি অনেক দিন পর সরকারে ফিরেছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসানের পর গঠিত এ নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর তরুণ প্রজন্মসহ জনগণের মনোজগতে এসেছে পরিবর্তন। নাগরিক সমস্যাসহ সব ধরনের জাতীয় ইস্যুতে তারা সোচ্চার হচ্ছে। তথ্যবিপ্লবের এই সময়ে তাদের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলিয়ে রাখা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। নতুন সরকারকে তাই বুঝতে হবে ঢাকার জলাবদ্ধতার সমাধান (অন্তত লক্ষণীয় উন্নতি) হতে পারে তাদের সক্ষমতার অন্যতম পরীক্ষাও। এ সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি। রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু এ সপ্তাহের এত বড় বিপর্যয়ের পর সরকার কী করছে, সে দিকে সচেতন নাগরিকদের সতর্ক নজর থাকবে। বিরোধী দলও যে সময়মতো একে বড় ইস্যু করবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাই নিজের স্বার্থে হলেও নগর কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে মাঠে নামতে হবে।

নতুন সরকারের এখনই উচিত রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় হওয়া সব প্রকল্পের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা করা। শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাব নয়, প্রকল্পের কার্যকারিতা, নকশার মান, বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। যেসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোর দায় নির্ধারণ করে যথাসম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে দরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দেওয়া। সরকারের উচিত হবে ঢাকার সব খাল পুনরুদ্ধারের কাজ কঠোরভাবে এগিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা। আদালতের নিষেধাজ্ঞাসহ আরও নানা বাধা থাকতে পারে। কিন্তু এই কাজ অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। ঢাকার আশপাশের এলাকার জন্য জলাভূমি সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। অকেজো যন্ত্রপাতি ও স্লুইসগেটের মতো স্থাপনার সংস্কার করতে হবে।

একটি রাজধানী শহরের মান কেবল উঁচু উড়ালসড়ক, সুরম্য ভবন কিংবা আলোকসজ্জা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নাগরিকেরা স্বচ্ছন্দে ও নিরাপদে চলাচল করতে পারেন কি না, পয়ঃনিষ্কাশন বা গণপরিবহনব্যবস্থা বা বায়ুর মান কেমন, মৌলিক নগরসেবা কার্যকর কি না—এসবের মধ্যেই একটি আধুনিক নগরের প্রকৃত পরিচয়।

ঢাকার বাসিন্দারা চান একটি এমন নগর, যেখানে বৃষ্টি হবে প্রকৃতির আশীর্বাদ, চায়ের কাপ হাতে ব্যালকনিতে বসে উপভোগের বিষয়—চরম দুর্ভোগের কারণ নয়। সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন ভাবনাহীন কিংবা মতলববাজির নিত্যনতুন প্রকল্প নয়, বরং সুশাসন ও পরিকল্পনা। গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অঙ্গীকার ও তার বাস্তবায়ন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্ভবত জবাবদিহি। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসবে—নগর ডুববে পানিতে, আর প্রতিকারের দরজায় কড়া নেড়ে মিলবে শুধুই নীরবতা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত