Ajker Patrika

ইরান চুক্তিতে নেতানিয়াহু বেকায়দায় পড়ে গেছেন?

রাজিউল হাসান
ইরান চুক্তিতে নেতানিয়াহু বেকায়দায় পড়ে গেছেন?
জেরুজালেমে ইসরায়েলি বাহিনীর নিপীড়নের দাগ কখনো মোছে না। ছবি: এএফপি

নানা নাটকীয়তার পর মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন দুই পক্ষের মধ্যে চলছে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে আলোচনা, দর-কষাকষি।

এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সরবরাহ করা হবে। আর সাম্প্রতিকতম বড় দুটি খবরের একটি হচ্ছে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অপর বড় খবরটি হলো, ইরানের জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।

সব মিলিয়ে বলা চলে, যেমন আচমকা ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আচমকা যেন সব ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। অনেকে হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন যে ইরান যুদ্ধ আচমকা শুরু হয়নি। গত ফেব্রুয়ারির শেষে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কথার কামান দাগছিলেন। এটা ঠিক; কিন্তু ইরানে মার্কিন হামলা শুরুর আগে কেউই বুঝতে পারেনি, যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই হামলা করে বসতে পারে, যুদ্ধটা এতটা বিস্তৃত হতে পারে।

সে যা-ই হোক, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে মোটামুটি সবাই একমত হবেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে এনেছে ইসরায়েল, বিশেষত দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর এবং তাঁর সরকারের দাবি, ইরানকে জব্দ করা না গেলে ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা হুমকি প্রশমন করা সম্ভব হবে না। কারণ, ইরান হামাস, হিজবুল্লাহসহ ওই অঞ্চলে ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই দাবির চেয়ে বড় সত্যিটা হলো, নেতানিয়াহু নিজ স্বার্থে ইরানকে কোণঠাসা করতে চান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, নেতানিয়াহু যখনই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন, ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েছেন বা পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন, তখনই তিনি আঞ্চলিক একটি উত্তেজনায় ইসরায়েলকে জড়িয়েছেন। জাতি হিসেবে ইসরায়েলের অনেকে হয়তো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমর্থন করেন। কিন্তু খোদ ইসরায়েলেও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। কাজেই এই যুদ্ধের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র বা জাতিকে দায়ী করার চেয়ে নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর সরকারের নীতিনির্ধারকদের দায়ী করাই বেশি সমীচীন হবে।

ফলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, ইরান চুক্তি ইসরায়েলের জন্য যতটা না দুশ্চিন্তার বিষয়, তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয় নেতানিয়াহুর জন্য। তিনি নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রক্ষা করতে যে ইসরায়েলকে যুদ্ধে জড়াতে কসুর করেন না, তা এখন প্রমাণিত।

তবে হ্যাঁ, এটাও মানতে হবে, অতীতে ইসরায়েলি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বলপ্রয়োগ করেছে। এখনো তারা বিভিন্ন জায়গায় বলপ্রয়োগ করে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েলের সরকারে যে-ই থাকুন না কেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর দমন-পীড়ন কখনো থামে না। জেরুজালেমে নিপীড়নের দাগ কখনো মোছে না। তারপরও নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকা মানেই যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বড় পরিসরে জটিলতা লেগে থাকা, সেটি এখন কারও নতুন করে বলে দিতে হয় না।

সেই হিসাবে ইরান চুক্তি যে সত্যিই নেতানিয়াহুকে, বিশেষত তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ কারণেই হয়তো কিছুদিন ধরে তাঁকে আর বাগাড়ম্বর করতে দেখা যাচ্ছে না। বিশেষত লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছে ‘ধমক’ খেয়ে তিনি যেন একদম চুপসে গেছেন।

তবে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি হয়েছে, তার মেয়াদ মাত্র ৬০ দিনের।

এর মধ্যেই দুই পক্ষকে আলাপ-আলোচনা শেষ করতে হবে, দর-কষাকষি করে একটা সুনির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে এই চুক্তির কোনো মানে থাকবে না। অবস্থাদৃষ্টে এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের আলোচনা সুন্দরভাবে অগ্রসর হলেও কখন কী ঘটে যায়, তা কে বলতে পারে!

এরই মধ্যে দেখা গেছে, চুক্তির দুদিন পেরিয়ে না যেতেই লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন ইস্যুতে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি তারা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। কিন্তু যেখানে আলোচনার টেবিলের দুই প্রান্তে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, আর দূরে দাঁড়িয়ে দর্শকের ভূমিকায় ইসরায়েল, সেখানে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুদ্ধ বন্ধে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা সম্পন্ন করার যে সময়সীমা, তা ইস্যুর বিস্তৃতি আর গভীরতার হিসাবে অনেক কম। কিন্তু এই আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য এক মুহূর্তের একটি ভুলই যথেষ্ট। আর যেকোনো তরফ থেকে সেই ভুলটা করাতে ইসরায়েল যে চেষ্টার অন্ত করবে না, তা আমাদের সবার জানা। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আপসরফা হওয়া মানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দাপটে অনেকটাই ভাটা পড়া। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের কোনো কোনো রাষ্ট্র হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। কিন্তু ইরান এবার যে প্রতিরোধ দেখিয়েছে, তা ইসরায়েলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই চ্যালেঞ্জে ইরান উতরে যাওয়া মানেই ইসরায়েলের গুরুত্ব অনেক কমে যাওয়া। আর ইসরায়েলের গুরুত্ব কমে যাওয়া মানে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কবর রচিত হওয়া। তিনি নিশ্চয় এমন কিছু চাইবেন না।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা ভেস্তে গেলেও ইসরায়েলের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। যে দুই মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার মধ্যে ইরানের অনেক কিছু অর্জনেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল, জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফিরে পাওয়া, তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ইরান যে এই দুই মাসে বিপুল সম্পদ অর্জন করবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সম্পদ দিয়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচিতে না ফিরলেও নিঃসন্দেহে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন এবং সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করবে। অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর বলছে, ইরান এরই মধ্যে তার সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতে শুরু করেছে। ফলে দুই মাস পর যে ইরানের সামনে ইসরায়েল পড়বে, সেটি এখনকার তুলনামূলক দুর্বল ইরানের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

কাজেই আমরা বলতে পারি, ইরানকে জব্দ করার জন্য ইসরায়েল যে যুদ্ধের প্ররোচনায় ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে, তা খোদ তেলআবিবের জন্য দুধারি তলোয়ারে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চুক্তি হলেও তা ইসরায়েলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হবে, আবার চুক্তি না হলেও ইসরায়েলকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ইরানের মুখে পড়তে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যুদ্ধ বন্ধ হলে নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত অনেক দুর্বল হয়ে যাবে। আর যুদ্ধ বন্ধ না হলে এবং ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো শুরু করলেও নেতানিয়াহুর প্রতি জনগণের আস্থায় ভাটা জোরদার হবে। সব মিলিয়ে তিনি এখন উভয়সংকটে। হয়তো তাঁর সাম্প্রতিক নীরবতার পেছনে এটাই বড় কারণ। আর সেই নীরবতায় ডুবে তিনি হয়তো নতুন কোনো পথ খুঁজছেন নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বাঁচাতে, ইসরায়েলের প্রভাব বাড়ানোর নামে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন কোনো জটিলতা তৈরির পট রচনা করতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত