Ajker Patrika

ইলিশের উৎপাদন

সম্পাদকীয়
ইলিশের উৎপাদন

মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে শুধু বিত্তবানেরাই ইলিশ মাছ কিনতে পারেন। ইলিশের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে এর উৎপাদনও কমে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক কর্মশালার তথ্যমতে, বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৭১ হাজার টন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ লাখ টনে।

ইলিশের এই উৎপাদন কমার পেছনে প্রকৃতির খেয়ালের চেয়ে অব্যবস্থাপনা এবং মানুষের তৈরি সংকট বেশি দায়ী। কর্মশালার মূল প্রবন্ধে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইলিশ কমার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নদীর নাব্যতা-সংকট, কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকা। নদীমাতৃক বাংলাদেশে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নাব্যতা কমার কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। মিঠাপানির এই সংকট ইলিশকে তার চেনা পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একশ্রেণির অসাধু চক্র নির্বিচার জাটকা এবং ডিমওয়ালা মা ইলিশ নিধন করছে, যার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ছে সামগ্রিক উৎপাদনে। আর এই চক্রের পেছনে কাজ করছে জেলেদের চরম অর্থনৈতিক অভাব।

এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং বিশ্ববাজারে ইলিশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করার জন্য এখন প্রয়োজন শক্তিশালী এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে কিছু ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে সেটি যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, এটি নিশ্চিত করতে হবে।

ইলিশের উৎপাদন আগের মতো বাড়াতে প্রয়োজন—সাগর ও নদীতে ইলিশ আহরণে সুনির্দিষ্ট সময়ের যে বাধ্যবাধকতা আছে, তা আইনের মাধ্যমে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। জাটকা ধরা নিষিদ্ধের সময় জেলেদের পুরো ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। নতুন যে প্রকল্প নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না যায়। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ড্রেজিং বা খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি, যাতে ইলিশের চলাচলের পথ সুগম হয়। কারেন্ট জালের উৎপাদন ও বিপণন পুরোপুরি বন্ধ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, সেটি হলো ইলিশ রক্ষায় মূল অংশীজন অথবা জেলেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। দেশের সাগরে ও নদীতে মৎস্যসম্পদের তুলনায় জেলের সংখ্যা অনেক বেশি, যা এই সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তাই জেলেদের একটি বড় অংশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে অন্য কোনো লাভজনক পেশায় স্থানান্তরের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইলিশ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার যে স্বপ্ন সরকার দেখছে, তা বাস্তবায়নে ইলিশের প্রজনন ও সুরক্ষায় আপস করার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জেলেদের টেকসই পুনর্বাসনের মাধ্যমেই শুধু ইলিশের এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত