Ajker Patrika

বস্তুকে না মেনে বদলানো চাই

ছাত্রজীবনে দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতর সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলবার মতো প্রায় কেউই ছিলেন না। ছাত্র মহলে ও আন্দোলনে বরং সমাজতন্ত্রের চিন্তাটা ছিল। কিন্তু ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় আক্রোশের কবলে পড়ে গিয়েছিল। যতটুকু প্রবহমান ছিল, তা-ও বেগবান হওয়ার সুযোগ পেত না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বস্তুকে না মেনে বদলানো চাই

সভ্যতার ইতিহাস তো আসলে অসন্তোষেরই ইতিহাস। সন্তোষ দেখা দিলে সভ্যতা এগোত না। কিন্তু ওই অসন্তোষটা শুধু ব্যক্তিগত তো নয়ই, প্রধানতও ব্যক্তিগত নয়; হয়ে পড়েছে সমষ্টিগত এবং যখন সে সমষ্টিগত হয়েছে, তখনই ঘটেছে উত্তরণ, তার আগে নয়। সমষ্টির আঘাতে এবং সমষ্টির স্বার্থেই পুরোনো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে।

আমার বয়স যত বেড়েছে, অসন্তোষও বেড়েছে সেই পরিমাণেই। নিজের অসন্তুষ্টিকে আমি মেলাতে চেষ্টা করেছি সবার অসন্তোষের সঙ্গে। চূড়ান্ত বিচারে আমার লেখালেখির পেছনের তাড়নাটা রয়েছে ওইখানেই। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো চোখের সামনে ক্রমাগত পরিষ্কার হয়ে এসেছে। বাইরের চোখের শক্তি কমেছে, ভেতরের চোখের শক্তি বেড়েছে।

ব্যবস্থাটা যে পুঁজিবাদী, আমার সেটা বোঝা হয়ে গেছে প্রায় শুরুতেই। তবে ভালোভাবে বোঝার ব্যাপারে অসুবিধা ছিল। পুঁজিবাদ নিজেকে নানাভাবে অস্পষ্ট করে রাখে। আর তাকে চিনবার জন্য যে সাহায্য এবং যে অনুশীলন দরকার ছিল, সেটা মোটেই সহজলভ্য ছিল না। রাষ্ট্র তো বটেই, সমাজও দীক্ষিত ছিল পুঁজিবাদেই। সাতচল্লিশে দেশ যখন তথাকথিত রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পেল, তখন আওয়াজ উঠেছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের। আমরা শুনতাম পূর্ববঙ্গের সাহিত্য কেমন করে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য থেকে স্বতন্ত্র করা যায়, সেই চেষ্টার কথা। দৃষ্টান্ত দেওয়া হতো আমেরিকান সাহিত্যের; বলা হতো, সে সাহিত্যে ইংরেজি সাহিত্যের মূলধারা থেকে কীভাবে এবং কী কারণে আলাদা হলো, সেটা দেখতে হবে এবং দেখে নিয়ে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করার চেষ্টা করা চাই। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মাঝখানে আটলান্টিক নামের একটা সমুদ্র আছে বললে জবাবে বলা হতো, তাহলে আইরিশ সাহিত্য দেখো, আয়ারল্যান্ড তো গা-ঘেঁষেই রয়েছে ইংল্যান্ডের, কিন্তু সাহিত্য তো আলাদা। জাতীয়তাবাদের বিষয়টা তুলে ধরা হতো। যে জাতীয়তাবাদ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল, সংগতভাবেই তার নাম দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ।

স্বাতন্ত্র্যটা আসবে এই জাতীয়তাবাদের কারণেই, চিন্তাটা ছিল এই রকমের। এর বিপরীত ধারায় যাঁরা সাহিত্যের চর্চা করতেন, তাঁরা ছিলেন উদারনীতিক। তাঁরা গোটা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে সাহিত্যচর্চা করবেন মনস্থ করেছিলেন।

পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে এঁদের বিস্তর পার্থক্য। এঁরা ছিলেন আধুনিক। কিন্তু অন্তরে ঐক্য ছিল ওই দুই ধারার ভেতরে। উভয় ধারাই ছিল পুঁজিবাদে বিশ্বাসী।

পুঁজিবাদের সমালোচনা দুই ধারা থেকেই পাওয়া যেত। কিন্তু সমালোচনার সুর ও স্বর—দুটোই ছিল মৃদু। উভয় পক্ষই পুঁজিবাদকে মেনে নিয়েছিল, মেনে নিয়েই সংস্কার চাইত। বিকল্প ব্যবস্থার কথা কোনো পক্ষই বলত না, ভাবতেও চাইত না। অথবা যেটা ভাবত, সেটা পুঁজিবাদকে নিয়েই। যেমন জাতীয়তাবাদীরা কেউ কেউ বলতেন, ইসলামি সমাজতন্ত্র চাই; তাঁদের সেই সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদের কল্পনা স্থান পেত না, ব্যক্তিমালিকানা ঠিক রেখেই তাঁরা সমাজতন্ত্র চাইতেন। ব্যক্তিগতভাবে উদারনীতিকেরা ব্যক্তিমালিকানার সমস্যা দ্বারা পীড়িত ছিলেন, জীবিকা ও আবাসনের সুবন্দোবস্ত করাটা সহজ ব্যাপার ছিল না। অনিশ্চয়তা ছিল অর্থনৈতিক জীবনে, কিন্তু তাই বলে তাঁরা যে সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন তা নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরে থেকে তাঁরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য আশা ব্যক্ত করতেন। ছাত্রজীবনে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভেতর সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলার মতো প্রায় কেউই ছিলেন না। ছাত্র মহলে ও আন্দোলনে বরং সমাজতন্ত্রের চিন্তাটা ছিল। কিন্তু ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় আক্রোশের কবলে পড়ে গিয়েছিল, যতটুকু প্রবহমান ছিল, তা-ও বেগবান হওয়ার সুযোগ পেত না। সমাজতন্ত্রের পক্ষে রাজনৈতিক কর্মী যাঁরা ছিলেন, রাষ্ট্র তাঁদেরকে কমিউনিস্ট বলত এবং অত্যন্ত তৎপর থাকত যত দ্রুত পারা যায় তাঁদেরকে কারারুদ্ধ করতে।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন একটা বড় রকমের আঘাত হেনেছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ওপর এবং পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রযাত্রার জন্য। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতারাও ছিলেন পুঁজিবাদী। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে একটা প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেল, সেটা হলো পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা আর পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের অধীনে থাকবে না, তারা একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেই করবে। প্রশ্ন আরও একটা ছিল। খুবই জরুরি প্রশ্ন। সেটা হলো রাষ্ট্রের চরিত্রটা কী হবে? পুঁজিবাদী, নাকি সমাজতন্ত্রী? নেতৃত্বে ছিলেন যে জাতীয়তাবাদীরা তাঁরা সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রকে সমাজতন্ত্রী করবেন এমন অঙ্গীকার তাঁদের মোটেই ছিল না। আমরা তো চোখের সামনেই দেখেছি যে পুঁজিবাদী বিশ্ব মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে; তাদের ভয় ছিল স্বাধীন হলে বাংলাদেশের মানুষ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। কিন্তু যুদ্ধের পরে তারা দেখল নতুন রাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রবেশ করাটা মোটেই দুরূহ কাজ নয়। এবং দ্রুতই তারা প্রবেশ করল। ভেতর ও বাইরের—দুই দিকের টানে বাংলাদেশ চলে গেল পুঁজিবাদী বলয়ের ভেতরে। আসলে যেখানে ছিল, রয়ে গেল সেখানেই।

ঘটনার ওই প্রবাহ অন্যদের মতো আমাকেও দেখতে এবং সহ্য করতে হয়েছে। এ দেশের মানুষের দারিদ্র্য অতি পুরোনো ব্যাপার। দারিদ্র্যের কারণ অন্য কিছু নয়; কারণ হচ্ছে ভেতরের ও বাইরের শোষণ। ভেতরের শোষণে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে; বাইরের শোষণে ওই ধনীদের সহায়তায় দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। এটা তো আমরা হরদম দেখতে পাচ্ছি। মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষ, প্রায়-দুর্ভিক্ষ, নীরব দুর্ভিক্ষ কতবার কতভাবে সহ্য করতে হয়েছে। অল্প কজনের বিলাসিতা ঢেকে দিতে পারেনি অসংখ্য মানুষের বঞ্চনা-যন্ত্রণা। কিন্তু এর বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াতে পারছি না। আমাদের, অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের পক্ষে ভীষণ অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু সেটা ঘটছে না। এর একটা কারণ—ব্যক্তিমালিকানার গুণগান গাইবার লোকের অভাব নেই; কিন্তু সামাজিক মালিকানার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের খুবই দুর্ভিক্ষ। যাঁরা বলেন তাঁদের কথা যাতে শোনা না যায়, তার ব্যবস্থা রয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে। আমার অবস্থান সামাজিক মালিকানার পক্ষে।

২.

কথাটা তাই দাঁড়ায় এই, আমার লেখালেখি উদ্দেশ্যমূলক। কিন্তু তাই বলে প্রচারমূলক যে তা নয়। বলা যাবে, লেখা একটা সাংস্কৃতিক কাজ। ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থাকে বিদায় করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম চলছে, আমার লেখার কাজ তার সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছে। এই লেখা রক্ষণশীল নয়, আবার উদারনীতিক যে তা-ও নয়। উদারনীতিকে আমি বরং অধিক পরিমাণে ভয় করি; কারণ, সে রক্ষণশীল তো বটেই, আবার ছদ্মবেশীও। তার ভদ্রতাটা ছদ্মবেশমাত্র। ছদ্মবেশী বলে সে নিজেই রক্ষণশীলতার তুলনাতে বেশি ক্ষতিকর।

ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখার প্রয়োজনে আমাকে অনেক পরিমাণে লিখতে হয়। পত্রিকাতে লিখি, আবার বইও বের করি। অনেক কিছু লেখার দরুন উদারনীতিকেরা ভাবেন সাহিত্যের নয়, চর্চা করছি সাংবাদিকতার। সেটা তাঁরা বলেনও। আবার একসময়ে খবরের কাগজে নিয়মিত লিখতাম বলে রটে গিয়েছিল যে আদপে আমি একজন কলামিস্ট। পরিচয়টা যা-ই হোক, আমি দেখেছি, না লিখে কোনো উপায় নেই; বিশেষ করে এই কারণে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা ভেঙেও ভাঙছে না; সূচনাকালের গুণগুলো খুইয়ে, নিছক টিকে থাকার প্রয়োজনেই সে এখন বেপরোয়া হয়ে অতি নৃশংস আচরণ করছে; মানুষ, প্রকৃতি, প্রাণী—সবার সঙ্গেই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক নৃশংস আচরণ তার। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আবশ্যকতা এখন তাই আরও বেশি, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায়। লেখা থামানোর কোনো সুযোগ দেখতে পাই না।

তা ব্যবস্থার শত্রুতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভটা অবশ্য এখন প্রায় সর্বজনীন। যেকোনো বৈঠকে এর প্রকাশ দেখা যায়। বিষোদ্‌গার, দৃষ্টান্ত-উপস্থাপন, দুঃসহ যন্ত্রণায় আর্তকণ্ঠ—এসব উঠে আসে। ভাসতে থাকে। বাংলা ভাষায় এ রকম বৈঠককে আমরা বলি আড্ডা দেওয়া। আমি যে লিখি, তার একটা অতিরিক্ত কারণ হলো আড্ডাতে অনীহা। আলাপ ঠিক আছে, কিন্তু আলাপ আর আড্ডা—দুটি ভিন্ন জিনিস। আলাপে একটা লক্ষ্য থাকে, আড্ডা লক্ষ্যবিহীন। আড্ডাতে বৈদগ্ধতার যে প্রকাশ পায় না তা নয়, হাসি-ঠাট্টাও খুব চলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিণতিটা দাঁড়ায় ক্লান্তি। আমার লেখার ভেতরের সুরটা কথাবার্তার; আশা করি তা আড্ডাবাজির নয়। কথাবার্তা বাড়ানো চাই, আড্ডাবাজি কমিয়ে। সে জন্য দরকার সাংস্কৃতিক অনুশীলনের, লেখার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক ওই অনুশীলনটাই করছি বলে আমার ধারণা।

যতই যা বলা হোক, মন কিন্তু স্বাধীন নয়। মন বস্তুর ওপর নির্ভর করে এবং বস্তুর সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। দ্বন্দ্বটা চলতেই থাকে। আমার ধারণা, আমার লেখা মন ও বস্তুর ভেতরকার এই দ্বন্দ্বেরই প্রকাশ। আমি বস্তুকে মেনে নেওয়ার পক্ষে নই, তাকে বদলানোর পক্ষে। এমতাবস্থায় না লিখে পার পাই কী প্রকারে!

লেখক: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মাত্র দেড় বছর আগে র‍্যাবে যোগদান করেছিলেন বিজিবি সদস্য মোতালেব

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা: বিএনপিতে বিদ্রোহী অর্ধশতাধিক

রাস্তায় সাইকেল থামিয়ে মুদিদোকানিকে কুপিয়ে হত্যার পর ‘হামলাকারী’ নিহত গণপিটুনিতে

কূটনীতিকদের কাছে আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরল বিএনপি

ইডেন–বদরুন্নেসা–হোম ইকোনমিকস নিয়ে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়তে চায় জামায়াত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত