ধরে নিন, আপনি প্রিয় কোনো সুরসাধক বা শিল্পীর জমকালো কনসার্ট দেখতে মাঠে ঢুকলেন। আপনার টিকিটের গায়ে কোনো আসন নম্বর লেখা নেই, তবে আপনি নিশ্চিত জানেন টিকিটগুলো পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর থেকে বিক্রি শুরু হয়েছিল। এখন মাঠে বসে আপনি কি নিজেকে ১ নম্বর কিংবা একেবারে শেষের টিকিটধারী দর্শক বলে দাবি করবেন? নিশ্চয়ই না। সাধারণ বুদ্ধি ও বাস্তবতার নিরিখে আপনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ধরে নেবেন—আপনি মাঝখানের কোনো এক সাধারণ দর্শক। আপনি না একদম শুরুর অতিক্ষুদ্র একটি দলের অংশ, না একেবারে শেষ মুহূর্তের।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন আর বিশ্বজুড়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তিগত অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই ঝোড়ো বিশ্বে যদি প্রশ্ন করা হয়—আমাদের এই সমৃদ্ধ মানবসভ্যতা আর কত দিন টিকে থাকবে? উত্তর হয়তো কোনো কাল্পনিক সায়েন্স ফিকশন গল্প বা জ্যোতিষশাস্ত্রের ভবিষ্যদ্বাণীতে পাওয়া যাবে না। তবে গণিতের অত্যন্ত সহজ কিন্তু ধারালো এক হিসাব আপনাকে চমকে দিতে বাধ্য। পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার এই বিস্ময়কর তত্ত্বটির নাম ‘ডুমসডে আর্গুমেন্ট’ বা ‘ধ্বংসের যুক্তি’। এই তত্ত্ব দাবি করে, কোনো বিশাল গ্রহাণুর আঘাত বা মহাজাগতিক অশুভ বিপর্যয় ছাড়াও কেবল অঙ্কের সাধারণ হিসাব কষে বলে দেওয়া সম্ভব এই পৃথিবীতে মানবজাতির আয়ু আর কত দিন বা কত প্রজন্ম বাকি রয়েছে।
এই যুক্তির মূল গভীর ভিত্তিটি তৈরি হয়েছিল ষোড়শ শতকে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের এক বিপ্লবী তত্ত্ব থেকে। তিনি মানবজাতিকে বুঝিয়েছিলেন, মহাবিশ্বে আমাদের পৃথিবী কোনো ‘বিশেষ’ বা ‘কেন্দ্রীয়’ স্থানে অবস্থান করছে না। সূর্য পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরে না, বরং পৃথিবীই সৌরজগতের সাধারণ একটি গ্রহমাত্র। ১৯৮৩ সালে প্রখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ব্র্যান্ডন কার্টার এই কোপার্নিকীয় ধারণাকে মানুষের সময় ও অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন বৈজ্ঞানিক রূপ দেন, যাকে পরবর্তী সময়ে ‘কার্টার ক্যাটাস্ট্রফি’ নাম দেওয়া হয়।
কার্টারের সহজ কিন্তু গভীর যুক্তি ছিল: মানব ইতিহাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট যত মানুষ জন্মাবে, তাদের দীর্ঘ সারিতে আপনি বা আমি কোনো ‘বিশেষ’ বা ‘অনন্য’ সময়ের বাসিন্দা নই। সময়ের বিশাল ক্যানভাসে আমরা এই দীর্ঘ জনস্রোতের খুব সাধারণ ও দৈবচয়নমূলক অংশমাত্র।
নৃতত্ত্ববিদ ও পরিসংখ্যানবিদদের যৌথ হিসাব অনুযায়ী, মানবজাতির সূচনা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আজকের দিনটি পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ১১ হাজার কোটি (১১০ বিলিয়ন) মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে। ডুমসডে আর্গুমেন্টের পরিসংখ্যান আমাদের বলে—আপনি যদি মানব ইতিহাসের একেবারে শুরুর অতি-বিশেষ ৫ শতাংশ কিংবা শেষ ধ্বংসের মুখোমুখি হতে যাওয়া অতি-বিশেষ ৫ শতাংশ দলের সদস্য না হন, তবে ৯৫ শতাংশ গাণিতিক সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনি মোট জন্ম নিতে যাওয়া মানবজাতির মাঝামাঝি বা শেষের ৯৫ শতাংশের ভেতরেই অবস্থান করছেন।
অঙ্কের এই সাধারণ হিসাবটি যখন পুরো মানবজাতির ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন তা থেকে বেশ আতঙ্কজনক ও বিস্ময়কর একটি ফল সামনে আসে। ধরে নেওয়া যাক, আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া এই ১১ হাজার কোটি মানুষ যদি মানবজাতির পুরো অস্তিত্বের মোট সংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ হয়, তবে অতীতের হিসাব থেকে পাওয়া যায় যে পুরো মানব ইতিহাসে মোট মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২২ হাজার কোটিতে (২.২ ট্রিলিয়ন)।
এখন ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যদি আমরা পৃথিবীর জনমিতি পর্যালোচনা করি এবং দেখি জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান গতি বা একটি স্থিতিশীল হার ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, তবে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের (অর্থাৎ আরও প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন মানুষ) জন্ম হতে আর কত দিন লাগবে? বিজ্ঞানীদের ‘বায়েসীয় পরিসংখ্যান’ (বায়েসিয়ান প্রোবাবিলিটি) মডেল ব্যবহার করে কষা হিসাব বলছে, আমাদের হাতে থাকা সময়টা কিন্তু একদমই বেশি নয়। বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী, আগামী মাত্র কয়েক শ বছর থেকে শুরু করে খুব জোর ৯ হাজার থেকে ১৭ হাজার বছরের মধ্যেই পৃথিবীর বুক থেকে মানবজাতি চিরতরে বিলুপ্ত বা হারিয়ে যেতে পারে! মহাবিশ্বের প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছরের ইতিহাস কিংবা পৃথিবীর প্রায় ৪৫০ কোটি বছরের বয়সের তুলনায় এই কয়েক হাজার বছর চোখের একটা পলক ফেলার মতোই অতি-ক্ষুদ্র ও ক্ষণস্থায়ী।
গাণিতিক এই হিসাবটি শুনতে রোমাঞ্চকর কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও এর গাণিতিক সূক্ষ্মতা বিজ্ঞান ও দর্শনের জগৎকে সব সময়ই গভীরভাবে ভাবায়। কারণ এই যুক্তিতে জটিল কোনো ভূ-রাজনীতি, পরিবেশবিদ্যা কিংবা জটিল পদার্থবিজ্ঞানের কাল্পনিক উপাত্ত ব্যবহৃত হয়নি; ব্যবহৃত হয়েছে কেবল নিখাদ সম্ভাবনা ও বায়েসীয় পরিসংখ্যানের নীতি। তবে আধুনিক কালের অনেক নামকরা গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও দার্শনিক এই গাণিতিক যুক্তির তীব্র সমালোচনাও করেছেন। সমালোচকদের প্রধান যুক্তিগুলো মূলত দুটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়:
২০২৬ সালের এই সংযোগ-প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবর্গ প্রযুক্তি এবং বায়ো-টেকনোলজির যেভাবে রূপান্তর ঘটছে, তাতে ভবিষ্যতে যদি মানুষ ও প্রযুক্তির মিশ্রণে নতুন কোনো ডিজিটাল প্রজাতির সৃষ্টি হয়, তবে কি তাদের এই গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে? কিংবা মানুষ যদি সফলভাবে পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গল বা অন্য কোনো দূরবর্তী গ্রহ-উপগ্রহে চিরস্থায়ী উপনিবেশ গড়ে তোলে, তবে এই হিসাবটি তো আর একমুখী থাকবে না। মানব প্রজাতি কেবল একটি অপরিবর্তনশীল বা স্থবির পরিসংখ্যানে আটকে থাকার পাত্র নয়। বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মহাশূন্য অভিযানের মাধ্যমে মানুষ নিজের জন্মহার, টিকে থাকার সক্ষমতা এবং জীবনের গড় আয়ু প্রতিনিয়ত বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
প্রকৃতপক্ষে, ডুমসডে আর্গুমেন্ট বা ধ্বংসের যুক্তি কোনো অলৌকিক কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ বা ক্যালেন্ডারের দিনক্ষণ ঘোষণা করে না। বরং এটি ২০২৬ সালের আধুনিক মানবজাতির আয়না হয়ে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা সামনে এনে দেয়। আমরা সাধারণত নিজেদের অবচেতন মনে ধরে নিই যে আমাদের গড়ে তোলা এই বিশাল সভ্যতা হয়তো কোটি কোটি বছর ধরে এভাবেই নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু গণিতের এই নির্মম ও বাস্তবতাবাদী হিসাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মহাকালের দরবারে আমাদের সময় অসীম নয়। বিশেষ করে আজ যখন বিশ্বজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষমতাধর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি, বিশ্বব্যাপী মারাত্মক জলবায়ুর সংকট, নতুন মহামারি এবং পরমাণু যুদ্ধের মতো বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন এই গাণিতিক সম্ভাবনা সত্য হতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়বে না।
প্রকৃতির অন্ধ নিয়ম কিংবা অঙ্কের কোনো কৃত্রিম সমীকরণ একা কখনো আমাদের মূল ভাগ্য লিখে দেয় না। বরং আজকের এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মানবজাতি হিসেবে আমরা জলবায়ু, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক শান্তির বিষয়ে কী ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি, তার ওপরই চূড়ান্তভাবে নির্ভর করবে আমাদের প্রজাতির টিকে থাকার মেয়াদ এবং আমাদের সময়ের ঘড়িটি ঠিক কখন থেমে যাবে।
আসিফ, বিজ্ঞানবক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি যখন জারি হলো, তখন ঢাকার পাম্পগুলোতে গাড়ির লম্বা সারি হচ্ছিল। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল লিটারে ১১৫ থেকে ১৩৫, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার পণ্যেই এক রাতে ২০ টাকা বৃদ্ধি।
২ ঘণ্টা আগে
একদম ঠিক শুনছেন। জি, ১৩ মাস বয়সী শিশুটির বাবার কথাই বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, বাবা। আপনারা বিন্দুমাত্র ভুল করেননি শুনতে। মায়ের কোল থেকে এই বাবা শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিস্কুট কিনে দেবেন বলে। তারপর লাপাত্তা! লাপাত্তা হওয়ার আগে অবশ্য স্ত্রীকে একটা ফোন করেছিলেন তিনি। তা-ও আবার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার দুই দিন পর।
২ ঘণ্টা আগে
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কেবল দশম শ্রেণিতে উঠেছি। ১৯৭১ সালের শুরুতে ক্লাস ঠিকমতো শুরু হয়নি। আমরা সেভাবে ক্লাস করতে পারিনি। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় ১ মার্চে। সেদিন আমি একরকম ঘটনাক্রমেই এর সঙ্গে জড়িয়ে যাই। স্কুলে যাচ্ছিলাম, পথে স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছিল পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ।
১ দিন আগে
মানবসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানতে ইচ্ছে হয়, কে প্রথম জমির মাটি আলগা করতে লাঙল আবিষ্কার করেছিল? সেই লাঙল আবিষ্কারের মাধ্যমেই কৃষিতে প্রথম যন্ত্রের ছোঁয়া লেগেছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে কৃষির ধরনেও এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
১ দিন আগে