Ajker Patrika

প্রেম-ভালোবাসা ছিল, আছে, থাকবে

অজয় দাশগুপ্ত
প্রেম-ভালোবাসা ছিল, আছে, থাকবে
হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকায় মানুষ এখন ফোনেই নাটক-সিনেমা দেখতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

অনেক দার্শনিকই কথাটা বলে থাকেন, চেঞ্জ ইজ লাইফ বা পরিবর্তনই জীবন। পরিবর্তন আবার দুই রকমের। ‘ভালো’ অথবা ‘মন্দ’; এই দুই ধরনের পরিবর্তন সমাজকে দুদিক থেকে প্রভাবিত করে। যেমন ধরুন, মুক্তিযুদ্ধ; সে শুভ পরিবর্তন আমাদের দেশ জাতি ও সমাজকে কতভাবে প্রভাবিত করেছে! সে সময়ে আমাদের জীবন হয়ে উঠেছিল বাঙালিময়। হঠাৎ আলোর মতো ফিরে এসেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আমাদের জিয়নে বেজে উঠেছিল নজরুলের ‘চল্ চল্ চল্’ গানের মতো আগুয়ান হওয়ার সংগীত। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর আমাদের যাত্রা থমকে গিয়েছিল। থমকে গিয়েছিল বললাম এই কারণে, তখনো থেমে যায়নি।

থামাতে পারেনি আমাদের দুশমনেরা। দুশমন বলতে আমরা যেন ভুল না বুঝি। আমাদের শত্রু মূলত তারাই, যারা যেকোনো উপায়ে নানাভাবে বাঙালিকে শুধু ছোট করতে চায়। তাদের আস্ফালন, অপপ্রক্রিয়া, ষড়যন্ত্র সবকিছুর পরও বাংলাদেশ পরাজিত হয়নি। যার মূল কারণ ছিল সংস্কৃতি। সংস্কৃতি তখন এতটাই প্রবল আর শক্তিশালী ছিল যে তার গায়ে ধাক্কা লেগে ফিরে যেত প্রতিক্রিয়াশীলদের অস্ত্র। আর আমরা আড়াল নিতাম সংস্কৃতির বুকে। সে আমাদের শিশুর মতো আগলে রাখত।

এই সেদিনও বাংলাদেশে সংস্কৃতি ছিল মানুষের জীবনের মুখ্য বিষয়। গান, নাচ, কবিতা, সিনেমা, নাটক, থিয়েটারে ঝলমল করত বাংলাদেশের সমাজ। নারী-পুরুষের সৌজন্যের দেয়াল থাকলেও এখনকার মতো বিভেদের প্রাচীর ছিল না। আমি যেটা খেয়াল করেছি, আমরা মানি বা না মানি, বিগত এক দশকে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে। যার জন্য তখনকার শাসকদের নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি ডিজিটাল দুনিয়াকে দায়ী করব। বিশ্বব্যাপী মৌলবাদ, ঘরের পাশে উগ্রবাদ আর পরাজিত পাকিস্তানের বিষ-নিশ্বাস ঘাড়ের ওপর পড়লেও আমাদের সরকার বা সমাজ তাকে পাত্তা দিত না। লোকদেখানো অনুষ্ঠান আর চোখের সুখের জন্য করা সংস্কৃতি খাঁচার পাখির মতো দেখতে ভালো, কিন্তু ডানাহীন। এই যে ডানাকাটা পাখি, তাকে খাঁচায় রেখে আমরা আকাশে যেসব চিলবাজ শকুনদের উড়তে দিয়েছি, তারাই নীরবে দেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।

আবারও বলছি, বিদায়ী ফ্যাসিস্ট বা অন্য কোনো রাজনীতির কথা বলছি না। বলছি উদারনৈতিক বাংলাদেশের দুরবস্থার কথা। রাতারাতি ভোজবাজির মতো সব উদারতা লোপ পাওয়া কি মুখের কথা? এই দেশে, এই মাটিতে লালনসাঁই, বাউল, ফকির, দরবেশ, সুফিবাদ এভাবে আক্রান্ত হবে বা হতে পারে—এটা কি কেউ ভেবেছিলেন? কিন্তু তা হয়েছে, হচ্ছে।

যে বিষয়টি লিখব বলে ঠিক করেছি, সে বিষয়ে আসি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। তাদের মোবাইল ফোনে তারা কি শুধু চ্যাট করে? শুধু ফোনে কথা বলে? এক প্রজন্ম সেটা যদি করেও, আরও দু-এক প্রজন্ম এই মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা অন্য মাধ্যমে নাটক-সিনেমা দেখে। নাটক-সিনেমা দেখা বাঙালি কেন, দুনিয়ার সব জাতির বিনোদন। চলে যাবে বা উঠে যাবে করে করেও যেমন মুদ্রিত মিডিয়া সংবাদপত্র আছে এবং থাকবে, বই পুস্তক আছে, থাকবে; তেমনি চলচ্চিত্রও থাকবে। এখন একদল মানুষ বলছে প্রেম নিয়ে সিনেমা করা যাবে না। এ বিষয়ে আইনেরও দ্বারস্থ হয়েছে তারা!

প্রেম কেন খারাপ? কেন রোমান্টিকতা খারাপ? এত বছর ধরে চলে আসা সিনেমা থিয়েটার, প্রেমে ভরপুর গল্প-কাহিনি কী কী সর্বনাশ করেছে আমাদের? আমার জন্মেরও আগে পদ্মাতীরে প্রথম ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল। মুখ ও মুখোশ নামের এই চলচ্চিত্র ঢাকার মুকুল টকিজসহ (পরে যার নাম হয় আজাদ সিনেমা) চট্টগ্রামের নিরালা (পরে এর নাম হয় রঙ্গম) সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ব্যবসাসফল এই ছবির পরিচালক আবদুল জব্বার খান বাংলাদেশি সিনেমার জনক। বেঁচে থাকলে এখন হয়তো তিনি এই খবর দেখে হয় মূর্ছা যেতেন, নয়তো দেশান্তরী হতেন!

আমরা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা যুগের মানুষ। বিলবোর্ডে রাজ্জাক কবরী, সুচন্দা, ববিতা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল থেকে শুরু করে সুজাতা, আজিম—এরাই ছিলেন আমাদের নায়ক বা নায়িকা। সিনেমা আমাদের প্রেম শিখিয়েছিল, রোমান্টিক সিনেমা শিখিয়েছিল বিরহ। কোনো কোনো প্রেমের সিনেমার কষ্ট, বেদনা সারা রাত ঘুমাতে দেয়নি। কোনো সিনেমাই আমাদের বিকৃত কাম জাগায়নি, ধর্ষণ শেখায়নি। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু প্রেমময় চলচ্চিত্র মানুষকে মানুষ হতে শিখিয়েছে।

বাঙালির জীবনে প্রেম এক জরুরি বিষয়। প্রেম মানে শুধু এক পুরুষ ও এক বা একাধিক নারী-পুরুষের যৌনতা? যারা কবিতা পড়ে না, গান শোনে না, ছবি আঁকে না, বাঁশি বাজায় না, তারাই শুধু বলতে পারে প্রেম বন্ধ হোক। কারণ খুব পরিষ্কার—যে মানুষ প্রেম করে না, সে মানুষ চমৎকার নোটিশ দিয়ে সিনেমায় প্রেম বন্ধ করতে চায়, সে গড়তে চায় নিষ্ঠুরতম হৃদয়হীন পাষাণ এক সমাজ।

প্রেম তখনই জয়ী হবে, যখন রাধা-কৃষ্ণ, লাইলি-মজনুর মতো আমরা প্রেমময় জীবন ভালোবাসব। মুশকিল হচ্ছে ডিজিটালের নামে বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে যাওয়া সমাজে এমন সাংঘাতিক একটা বিষয় তুলেও পার পাওয়া যায়। অথচ লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ—এই নামগুলো বলে দেয়, এরা কারা, কোন সম্প্রদায়ের মানব-মানবী হয়ে প্রেমের জন্য দুনিয়া জয় করেছেন।

যাদের প্রেমে অ্যালার্জি বা মানা আছে, তারা দূরে থাকলেই হয়। বাংলাদেশ ও এর বিপুল জনগোষ্ঠী ভালোবাসায় বাস করে এবং করবে, এটাই সত্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত