
লেখক, সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আজ ৯১তম জন্মদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক তিনি। ২৪ বছর ধরে ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। জন্মদিন উপলক্ষে জীবনের নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
শিক্ষকতাকে আমি পেশা হিসেবেই গ্রহণ করি, কিন্তু পেশা ক্রমান্বয়ে ব্রতে পরিবর্তিত হয়। এর কারণ দুটি মিলে একটিই। দুটির একটি ছিল আনন্দ, অপরটি চরিতার্থতা; এবং দুটি একটিতেই পরিণত হয়। তাকে বলা চলে সন্তোষ। শিক্ষকতা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। এবং সুখের স্মৃতিটা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভেতরে সাহিত্যপাঠে ও জ্ঞানান্বেষণে আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারা। শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি ক্লাসের শেষে, টিউটরিয়াল ক্লাসে, এমনকি অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দেখতে পেলে যে আনন্দ পেয়েছি, সেটাই আমার জন্য সুখের বড় স্মৃতি।
আমাদের কালে শিক্ষকদের ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। ওই সংগ্রামটা ছিল রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। সবাই যে রাজনীতিসচেতন ছিলেন, তা নয়; রাজনৈতিকভাবে কেউ কেউ আবার বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে সমর্থনও করতেন। তবে শাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাই ছিল বিশেষভাবে দৃশ্যমান। শিক্ষার মান বিষয়েও সচেতনতা ছিল সুবিস্তৃত। বিশেষত এই কারণেও যে পেশাগত উন্নতি নির্ভর করত গবেষণা, প্রকাশনা এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ওপর।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভেতর নৈকট্যটা ছিল উল্লেখযোগ্য। নৈকট্যের ভেতরে অবশ্য কিছুটা সামন্তবাদী আনুগত্য থাকত। স্বাধীনতার পরে আশা ছিল সম্পর্কটা গণতান্ত্রিক হবে এবং আদান-প্রদানের ভেতর দিয়ে নৈকট্য আরও বাড়বে। নৈকট্য কিন্তু বাড়েনি। বেড়েছে বরং দূরত্ব। মিলবার একটি ক্ষেত্র হতে পারত ছাত্র সংসদ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ থাকলেও সেটা শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। কারণ, বর্তমানের ডাকসুর নেতারা শিক্ষার্থীদের সমস্যা না দেখে ক্যাম্পাসের গরিব মানুষদের উচ্ছেদ করেছে দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। এ কাজ আসলে তাদের ছিল না, কিন্তু তারা সেটাকে তাদের গুরুদায়িত্ব মনে করেছে। উত্তরণের একটি পথ—বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলা।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কথাটা ভ্রান্তিমূলক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বৈশিষ্ট্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল—একটি তার আবাসিক চরিত্র, দ্বিতীয়টি এর ছাত্র সংসদ। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হয়েছে, অক্সফোর্ডকে তো নয়ই, বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই তেমন দায়িত্ব ছিল না। ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে যে অবনতিটা ঘটেছে তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের যতটা, তার চেয়ে অধিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবস্থার। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের চর্চাকে মূল্য দেওয়া, শিক্ষকদের মানসম্মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ভেতর জ্ঞানার্জনে আগ্রহ সৃষ্টি। আগ্রহ সৃষ্টির জন্য আবশ্যক হবে কর্মের সংস্থান করা।
যে সমস্যাগুলোর কথা বললেন, সেগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি নির্মম বাস্তবতা। সেটি হলো পুঁজিবাদী উন্নয়ন। এই উন্নয়ন মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু চেনে না এবং ভোগবাদিতাকে উৎসাহিত করে। যে তরুণদের ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তারা সামনে কোনো আদর্শ দেখতে পায় না; পুঁজিবাদী উন্নতিকেই তারা জীবনের লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করতে বাধ্য হয়। আর বয়স্ক যাঁরা, তাঁরা তো পুঁজিবাদী উন্নয়নের আদর্শের ভেতরেই আছেন। ওদিকে আবার সংস্কৃতির সুস্থ চর্চা নেই। মানুষ অসামাজিক এবং আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
আগের প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে বুর্জোয়াদের হাতে, তারা পুঁজিবাদী উন্নয়ন ভিন্ন অন্য কোনো উন্নয়নের কথা ভাবতে পারে না। অথচ আজ যেটা প্রয়োজন, কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো ব্যক্তিমালিকানাকে বিদায় করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। এটি সম্ভব করে তোলার দায়িত্বটা বামপন্থীদের। বামপন্থীরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ছিলেন। কার্যত তাঁরাই ছিলেন চালিকাশক্তি। কিন্তু নেতৃত্ব চলে গেছে বুর্জোয়াদের হাতে। বামপন্থীদের লক্ষ্য হওয়ার কথা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলা। সেই আন্দোলনটা তাঁরা গড়ে তুলতে পারেননি। তাঁদের বড় অংশ ঠিক বুর্জোয়াদের মতো না হলেও বেশ ভালোভাবেই নির্বাচনী রাজনীতির আগ্রহী হয়ে রইল। তদুপরি বামপন্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল রুশপন্থী, চীনপন্থী বিভাজন। বামপন্থী আন্দোলন শক্তিশালী হতে না পারার
একটি বড় কারণ দক্ষিণপন্থীদের (অর্থাৎ বুর্জোয়াদের) শাসন প্রতিষ্ঠা। সংকট যে ক্রমেই গভীর হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু আমি আশাবাদী; কারণ মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাতে চাইবে না; মানুষকে এই উপলব্ধিতে বাধ্য হবে যে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গাতে সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা চাই। এর জন্য অবশ্য হৃদয়বান ও বুদ্ধিমান মানুষদের তৎপরতা আবশ্যক হবে।
আমার জীবনের সফলতাটা এইখানে যে চিন্তার দিক থেকে আমি স্থবির থাকিনি, ক্রমাগত এগিয়ে গেছি। সেই সঙ্গে কাজের মধ্যে থাকতে চেয়েছি। সেই কাজ যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সামাজিক। অপূর্ণতার বোধ অবশ্যই রয়েছে। সেটা হলো আমার সময়টাকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা দরকার ছিল।
পরামর্শ একটাই; সেটা হলো জ্ঞানের চর্চা চাই এবং সেই চর্চা যান্ত্রিক হবে না, তাকে হতে হবে সৃষ্টিশীল, দ্বান্দ্বিক ও সামাজিক; লক্ষ্য হওয়া চাই একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ, যে জাগরণ পুঁজিবাদী উন্নয়নকে হটিয়ে দিয়ে সামাজিক মালিকানার জগৎ তৈরির পক্ষে কাজ করবে। দৃষ্টিভঙ্গিটা হবে সেই সঙ্গে দেশপ্রেমিক ও আন্তর্জাতিক।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজকের পত্রিকাকেও ধন্যবাদ।

১৯ শতকের প্রথমার্ধে আমাদের দেশে ইংরেজি তথা আধুনিক শিক্ষার গোড়াপত্তন ঘটেছিল মূলত ইংরেজদের হাত ধরে। তবে আর কিছু যেমনই হোক, শত বছরেও এখানকার কোনো প্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স পড়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি কিংবা বন্দোবস্ত পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে
১৪ ঘণ্টা আগে
অ্যান্টার্কটিকার ওয়েডেল সাগরে সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি ছোট পাথুরে দ্বীপ বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির মানচিত্রে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। গিজার মহাপিরামিডের সমতুল্য এই দ্বীপটি এত দিন বিশাল বরফের স্তূপের নিচে লুকানো ছিল। ড্রোনের ক্যামেরায় যখন প্রথম এই পাথুরে ভূমির অস্তিত্ব ধরা পড়ল, তখন তা কেবল একটি ভৌগোলিক
১৪ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি একজন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার জন্য গাছে উঠতে হয়েছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য। এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি নিছক একটি ভাইরাল ভিডিও ছিল না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। এখন প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক
১৪ ঘণ্টা আগে
পদ্মা নদীর ভাঙন বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়। পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটায় প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীগর্ভে বিলীন হয় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক ও জীবিকার উৎস। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ভাঙন যেন আমাদের কাছে একটি মৌসুমি সংবাদে পরিণত হয়েছে; কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে
১৪ ঘণ্টা আগে