Ajker Patrika

অতীতের দুঃস্বপ্নগুলো মুছে দিক ২০২৬

অরুণ কর্মকার
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭: ৫৯
অতীতের দুঃস্বপ্নগুলো মুছে দিক ২০২৬

রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে আমাদের অতীতকে মোটেই সুখের কিংবা স্বস্তির বলা যায় না। প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধিরও নয়। ১৯৭১ সালে সংঘটিত সর্বাত্মক সশস্ত্র জনযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, ৫৪ বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক থেকেই গেছে। অন্যদিকে প্রায় প্রতিটি দশকে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে এমন কতিপয় ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে দুঃস্বপ্ন বলাই যথার্থ। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই এসব ঘটনার শুরু, যা নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের মর্মমূলে অমোচনীয় ক্ষত এবং স্থায়ী অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিল। তারপর প্রায় নিয়মিত বিরতি দিয়ে একের পর এক ঘটনা-দুর্ঘটনা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আর সুস্থির হতেই দিল না। এখন পর্যন্তও না।

যেসব ঘটনা-দুর্ঘটনা এই বাংলাদেশকে সব সময় অস্থিতিশীল করে রেখেছে, তার বিস্তারিত ঠিকুজি-কুষ্ঠি বিচার করতে গেলে অনেক অপ্রিয় প্রসঙ্গের অবতারণা হবে। তা ছাড়া এই নিবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে তার সবটা তুলে ধরা সম্ভবও নয়। কিন্তু একটা কথা অবশ্যই বলা যায়। রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার সুযোগ একাধিকবার এসেছে। জাতীয় ঐক্যও একাধিকবার গড়ে উঠেছে। কিন্তু আবার তা তলিয়ে গেছে অন্তহীন চোরাবালিতে। এইভাবে ‘মার্ক টাইম’ (একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মার্চ করা) করতে করতে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে ২০২৬। অথবা আমরা একটি বৃত্তে ঘুরতে ঘুরতে ২০২৬-এ পৌঁছেছি। তবে সেটা যে কেবল মহাকালের পরিক্রমায় হয়েছে, তা-ও ঠিক নয়। কিছু অর্জন, কিছুটা হলেও সামনে এগিয়ে যাওয়া রয়েছে এর পেছনে। কিন্তু তাকে প্রকৃত অর্থে সামনে এগিয়ে যাওয়াও বলা যায় না। কারণ, সে চলা ছিল একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে। ফলে মনে হয়েছে যে আমরা সামনে এগোচ্ছি। কিন্তু ঘুরে ঘুরে আবার সেই একই জায়গায় ফিরে এসেছি। অগ্রগতিটাকে ধরে রাখা যায়নি।

অনেকে বলতেই পারেন যে অগ্রগতি তো যথেষ্ট হয়েছে। তার অনেক কিছুই দৃশ্যমানও বটে। সে কথা স্বীকার করেও বলা যায়, এই অগ্রগতির পুরোটাই রাষ্ট্রের বহিরাঙ্গের। সময় সময় শাসকের দক্ষতায় কিংবা চতুরতায় রাষ্ট্রের বহিরাঙ্গের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্তর্গত শক্তিকে হীনবল করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অধ্যবসায়ে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের অবনমন হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অবলোপনও হয়েছে। এর পেছনে শাসকের অপরিণামদর্শিতা যেমন থাকতে পারে, তেমনি কোনো কোনো বহিঃশক্তির ভূমিকাও থাকতে পারে। অথবা দুটিই সমান্তরালভাবে থাকতে পারে বা ছিল। তারপরও সেই সুদীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আমরা ২০২৬-এ উপনীত হয়েছি। এই যে উপনীত হয়েছি, এও তো একপ্রকার চলা। এখন যদি ২০২৬-এ বসে অতীতের ঘটনাবলি দেখতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে আমরা আসলে সামনে অগ্রসর হইনি। আবারও একটি বৃত্তের ওপর ঘুরে এসেছি মাত্র।

আজ যে আমরা ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে আছি, এর পেছনে শক্তি হলো ২০২৪। আজকের ২০২৬-এর মেরুদণ্ড হলো ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। এত বড় একটা আলোড়ন আমাদের নিয়ে এল সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতায়। সে বাস্তবতা আশাবাদের, উচ্ছ্বাসের, সামনে এগিয়ে যাওয়ার। তারপরও বৃত্তের ওপর দিয়ে চলা কিংবা অতীতের কোনো দুঃস্বপ্ন ফিরে আসার কথা উঠছে কেন! উঠছে কারণ ২০২৪ও তো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারেনি। সেই আলোড়িত গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই তো জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরতে দেখা গেছে। আর এখন তো তা ভেঙেচুরে একেবারে ছত্রখান হয়ে গেছে। একে কি আমরা সামনে এগোনো বলতে পারি! পারি না বলেই প্রশ্ন ওঠে সেই বৃত্তবন্দী হয়ে চলার। অথবা মার্ক টাইম করার।

জাতীয় রাজনীতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, সেখান থেকে কি আমরা আশা করতে পারি অতীতে অবনমিত হওয়া রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পুনরুদ্ধার হবে? আমরা কীভাবে আশা করতে পারি দায় ও দরদের সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে, যা আমাদের এখনো বলা হচ্ছে। আমি জানি, আমরা সবাই জানি এত সহজেই সেটা হবার নয়। সে জন্য সময় লাগবে আরও অনেক। কাজেই এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আমরা তো এও জানি এবং দেখি যে চতুর্দিকে কী ভয়াবহভাবে চরম অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটছে। দেশের রাজধানী শহরে প্রকাশ্যে একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। গত বুধবার রাতেও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যে ঘটনা ঘটেছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে ওই ঘটনা ঘটানো হয়েছে মব সৃষ্টি করে। আবার প্রেশার গ্রুপও হতে পারে। তবে তারা এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কার ওপর প্রেশার তৈরি করছে, সেটা তো বোঝা যাচ্ছে না। সরকার এসব ঘটনায় খুব একটা প্রেশার অনুভব করে বলে মনে হয় না। তবে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয় নিঃসন্দেহে। সাধারণ মানুষ এটাও আশা করতে পারছে না যে এই ধরনের নৃশংস ঘটনা এটাই শেষবার ঘটল। তাহলে সে কোন ভরসায় বুক বাঁধবে!

২০২৪-এর অভ্যুত্থানের এক বিচিত্র বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এই মব। অনেকেই এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে এই মব সৃষ্টিকারী শক্তি ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের গর্ভেই লুকিয়ে থাকা এক সহযোগী শক্তি। এখন এর অনেক নাম। একেক সময়, একেক ঘটনায় একেক নাম ব্যবহার করে। কিন্তু কাজ একটাই। এই মব সৃষ্টিকারী শক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে উপেক্ষা করে অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে। এখনো ঘটিয়ে চলেছে। এরা এতটাই বেপরোয়া যে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী—কেউই এদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না। এ কথা বোঝার জন্য খুব বেশি এটা ভাবার দরকার হয় না যে এদের একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কথাগুলো বলতে পারেন না, যে কাজগুলো প্রকাশ্যে করতে পারেন না, তারা সেগুলো বলে এবং করে কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে সহায়তা করে। এই সহায়তা করার জন্যই তাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।

সামনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট। এই নির্বাচনের সময় যদি মব সৃষ্টিকারী শক্তি কোনো বিষয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যদি তারা কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তাহলে সরকার বা নির্বাচন কমিশন তা সমলাতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন দেশবাসীর প্রধান চাওয়া একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে, তারা যেন অতীতের দুঃস্বপ্নগুলোকে চিরতরে বিদায় করতে পারে। অতীতের কোনো দুঃস্বপ্ন যেন কোনো দিন আর এই দেশে ফিরে না আসে—সেই প্রত্যাশা নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছে দেশের আপামর মানুষ।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ফাতেমার সন্তানেরা কী করেন, ১৬ বছর কেমন কেটেছে

ছেড়ে দিলে কী আর করার: মোস্তাফিজ

ভেনেজুয়েলায় নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ‘ধরে নিয়ে গেল’ যুক্তরাষ্ট্র

মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় শাহরুখ খানের ক্ষমা চাওয়া উচিত: সর্বভারতীয় ইমাম সংগঠনের সভাপতি

মাদুরোকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করল ভেনেজুয়েলা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত