Ajker Patrika

‘সেরা’ শিক্ষক

সম্পাদকীয়
‘সেরা’ শিক্ষক

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল ইসলামকে ‘বর্ষসেরা শিক্ষক’ হিসেবে একটা পুরস্কার দেওয়া যায় না? কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের কিছু গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কাগজে-কলমে পাকা হিসাব দিয়ে দক্ষ অর্থনীতিবিদের পরিচয় দিয়েছেন! আজকের পত্রিকায় ২০ আগস্ট প্রকাশিত একটি সংবাদ পড়লে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হওয়া যাবে অবশ্য।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ইমদাদুল ইসলাম বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়মনীতি না মেনে অন্তত আটজন আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের জমি বিক্রি, বিভিন্ন খাতের অর্থ নয়ছয় এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি আত্মসাতের মতো ভয়াবহ অভিযোগও উঠেছে। সাবেক অফিস সহায়ক আব্দুল হালিম অভিযোগ করেছেন, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু সেশন ফি থেকেই ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা নয়ছয় করেছেন ইমদাদুল ইসলাম। ভর্তি ফি, কেন্দ্র ফি, সরকারি অনুদান, হাট ডাক, গাছ ও পুরোনো ভবনের মালামাল বিক্রিসহ আরও বিভিন্ন খাতের অর্থ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. শাহাবুদ্দিন দিয়েছেন চমকপ্রদ তথ্য—আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও অবসরে যাওয়ার আগে ইমদাদুল ইসলাম খাতাপত্রে হিসাব-নিকাশ সব ঠিক করেই গেছেন। তাই ‘সেরা শিক্ষক’ কিংবা ‘সেরা অর্থনীতিবিদ’ এমনকি ‘সেরা ব্যবসায়ী’ হিসেবেও তাঁকে পুরস্কৃত করা যেতে পারে!

অভিযোগগুলো সত্য কি না, আমরা তা জানি না। কারণ, অভিযোগকারীর বক্তব্য সত্য না-ও হতে পারে। আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যেহেতু অভিযুক্ত ব্যক্তি এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেননি, তাই অভিযোগ বাতিলও করে দেওয়া যায় না। ফলে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের হিসাবপত্র, ব্যাংক লেনদেন, ভাউচার, অডিট প্রতিবেদন, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং জমি বিক্রির দলিল পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে।

অভিযুক্ত শিক্ষক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে নাকি দীর্ঘদিন তাঁর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় যদি অনিয়মের ঢাল হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানে প্রশাসনিক জবাবদিহি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। দলীয় পরিচয় যা-ই হোক, আইন ও প্রতিষ্ঠানের অর্থের ক্ষেত্রে সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা কি জরুরি নয়?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বলা হয় জাতি গঠনের কারখানা। সেখানে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সততা, ন্যায় ও নৈতিকতার শিক্ষাও পায়। অথচ সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ আত্মসাৎ বা অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কঠোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অবসর গ্রহণের পর অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসা প্রমাণ করে, নিয়মিত তদারকির ঘাটতি কতটা বিপজ্জনক। এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল—সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত