Ajker Patrika

সুখে থাকতে আসলে কী লাগে

রোকেয়া রহমান বর্ণা
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০: ১১
সুখে থাকতে আসলে কী লাগে
প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি আমার এক বন্ধু আমাকে একটি ভিডিও-কনটেন্ট পাঠিয়ে লিখেছে, ‘সুখে থাকতে খুব বেশি কিছু লাগে না।’ ভিডিওটি দেখে জানলাম, নায়লা শারাফ নামের এক নারী বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করেছেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও জনতা ব্যাংকে চাকরি করেছেন। এরপর ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন অন্য এক জীবন।

রাজধানী ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পড়াশোনা করা ওই নারী এখন নেত্রকোনার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে কেউ কেউ তাঁকে ‘পাগল’ও বলেছেন। কিন্তু বন্ধুকে জবাবে লিখলাম, ‘সুখে থাকতে খুব বেশি কিছু লাগে না—বিষয়টি মানতে পারলাম না।’

কারণ, সুখে থাকতে সবার একই রকম কিছু লাগে, ব্যাপারটি এমন নয়। একেকজনের কাছে সুখের সংজ্ঞা একেক রকম হয়। জীবনে সুখ ও শান্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রায় সবারই আছে, কিন্তু সবার সুখ-শান্তির ঠিকানা এক নয়। কেউ অঢেল টাকা উপার্জন করে অট্টালিকা গড়ে সুখী হন, কেউ সুখী হন টাকা জমিয়ে না রেখে দেশ-বিদেশ ঘুরে। কারও ভালো লাগে পদপদবি ও পরিচিতি, কেউ নিভৃতে নিজের মতো করে জীবন কাটাতে ভালোবাসেন। কেউ ঘর গুছিয়ে আনন্দ পান, কেউ অগোছালো ঘরে স্বস্তিতে থাকেন। কেউ রান্না করে অন্যদের খাইয়ে সুখ পান, কেউ অন্যের রান্না করা খাবার খেয়েই তৃপ্ত।

সমস্যাটি অন্য জায়গায়। কেউ যদি ভেবে বসেন, অন্য কেউ বা বাকিরা কেন তার মতো করে সুখী হতে চান না—এটাতেই বাধে বিপত্তি। সবচেয়ে সমস্যাপূর্ণ হয়, কেউ যখন অন্য কারও ‘কম পেয়ে’ সুখে থাকা মেনে নিতে পারেন না। এ কারণেই সমাজের চোখে উঁচু পদের চাকরি ছেড়ে অন্য কিছু করতে চাইলেই কাউকে কাউকে ‘পাগল’ তকমা দেওয়া হয়। যেন একটি নির্দিষ্ট পেশা, আয় কিংবা সামাজিক পরিচিতির বাইরে সুখী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই! অথচ যে জীবন একজনের কাছে সাফল্যের, অন্য কারও কাছে তা-ই হতে পারে অস্বস্তি কিংবা বন্দিত্বের।

সমাজের চোখে উঁচু কিংবা নিচু যে কাজই করা হোক না কেন, মন যদি সারাক্ষণ অস্থির থাকে, নিজের জীবন নিয়ে অতৃপ্তি কাজ করে, তাহলে কি মানুষ সুখী হয়? শুধু বাহ্যিক সাফল্য দিয়ে মনের শূন্যতা পূরণ করা যায়? আবার একজনের জীবনযাপনের ধরন অন্যদের পছন্দ নয় বলেই কি সেই মানুষটির সুখী হওয়ার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যায়?

সুখে থাকতে আসলে কী লাগে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল আগে পড়া বেশ কয়েকটি নিবন্ধের কথা। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের কথা ও পার্শ্ববর্তী নরডিক দেশগুলোর কথা।

নরডিক দেশ ফিনল্যান্ড ২০১৮ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত টানা নয়বার ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্সে বিশ্বের সুখী দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে। মানুষ নিজের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, তার ভিত্তিতেই এ র‌্যাঙ্কিং নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশ না হয়েও ফিনল্যান্ডের অবস্থান ও মানুষের ভালো থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম, সুখের সঙ্গে শুধু আয় বা সম্পদের সম্পর্ক নেই। সুখ কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয়ও নয়। বরং কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিমালা, সেবাব্যবস্থা ও জীবনযাপনের পরিবেশ ব্যক্তির ভালো থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং সুখী হওয়ার সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।

মূলত সুশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, সমতা ও ন্যায্যতা, পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক, প্রকৃতির সান্নিধ্য, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা, ভারসাম্যপূর্ণ জীবন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ু এবং কঠিন সময়ে সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা সুখে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সুখী দেশের তালিকায় বরাবরই শুরুর দিকে থাকা অন্য নরডিক দেশগুলোয়ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বেশ ভালো। যেমন ডেনমার্কে রয়েছে বিনা মূল্যে সরকারি শিক্ষার সুযোগ, সরকারি ব্যবস্থায় অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার সুবিধা, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্ব এবং সাইকেলবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা। আর সুইডেনে যোগ্য মা-বাবা একটি সন্তানের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪৮০ দিন পর্যন্ত অভিভাবকত্বকালীন ভাতা পেতে পারেন। এ ছাড়া নরডিক দেশ নরওয়েসহ ইউরোপের অন্যান্য অনেক দেশে নাগরিক কল্যাণে ও জীবনের অনিশ্চয়তা কমাতে নানা সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।

সুখের প্রসঙ্গ এলে যে দেশটির নাম না বললেই নয়, সেটি হলো ভুটান। দেশটি ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা সামগ্রিক জাতীয় সুখের ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, মানুষের ভালো থাকাকে শুধু আয়-উপার্জনের হিসাব দিয়ে দেখতে চায় না সে দেশের সরকার। সুখের সঙ্গে মানসিক শান্তি, সামাজিক সম্পর্ক, পরিবেশ ও সুশাসনেরও যে সম্পর্ক আছে, ভুটানের এই ভাবনা সেটিই মনে করিয়ে দেয়।

সর্বোচ্চ সুখী মানুষের দেশ ফিনল্যান্ডের ইতিবাচক একটি উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ফিরব। ফিনল্যান্ডে কেউ চাকরি হারালে বা কর্মহীন হয়ে পড়লে আর্থিক অনিশ্চয়তা কমাতে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কর্মক্ষম মানুষের জন্য অন্যতম বড় এক ভাবনা। ফলে এ দেশের মতো ঋণগ্রস্ত, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সীমিত সামাজিক সুরক্ষার বাস্তবতায় ফিনল্যান্ডের নিশ্চয়তার গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। কারণ বাংলাদেশে অনেকের নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও জীবিকা হারানোর ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। অসুস্থতায় বিনা মূল্যে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকে না, সরকারি স্কুলে সন্তানের ভালো পড়াশোনার নিশ্চয়তা মেলে না। এতে করে সুখের প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় বলে অনেকের কাছে আর থাকে না, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক চলে আসে। আর তাতেই নিক্তি দিয়ে অন্যের সুখ মাপতে বসে যান কেউ কেউ।

তবু শেষ পর্যন্ত সুখের কোনো একক সংজ্ঞা হয় না। আমি যদি বলি, নিজের মনের কথা লিখে ফেলতে আমার ভালো লাগে, সেটিও আমার সুখের একটি অংশ, আপনি কি তা মানবেন? না মানলেও ক্ষতি নেই। আমার সুখের সংজ্ঞা আপনার সংজ্ঞার সঙ্গে মিলতে হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম আসলে আছে কি?

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত