Ajker Patrika

স্বাধীনতা দিবস: অর্জন, অপ্রাপ্তি ও প্রত‍্যাশা

সেলিম জাহান, অর্থনীতিবিদ
স্বাধীনতা দিবস: অর্জন, অপ্রাপ্তি ও প্রত‍্যাশা

একটি দেশের জন‍্য তার স্বাধীনতা দিবস বড় পবিত্র। এই দিন যেকোনো জাতির জন‍্য বিশাল গর্বের, অনন‍্য প্রাপ্তির এবং অনেক প্রত‍্যাশারও বটে। বাংলাদেশও এর ব‍্যত্যয় নয়। আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগে অনেক ত‍্যাগ, তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ‍্যমে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম আমাদের স্বাধীনতার সূর্যকে। আজ প্রায় অর্ধশতক বছর পরে সময় এসেছে পেছনে ফিরে তাকানোর; আমাদের অর্জন, অপ্রাপ্তি এবং সামনে তাকিয়ে প্রত‍্যাশার একটি মূল‍্যায়নের। শেষ প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, মাত্র কিছুদিন আগে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ‍্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন পথযাত্রা শুরু হয়েছে। অতএব, এ পথযাত্রায় জনগণের চাওয়া-পাওয়ার একটি নতুন মাত্রিকতা আছে।

স্বাধীনতা-উত্তর পঞ্চান্ন বছরে আমাদের অর্জন কিন্তু নিতান্ত কম নয়। মানুষ আর অর্থনীতির কথাই যদি বলি, তা হলে ১৯৭১ সালের শেষে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত, বিধ্বস্ত। সেখান থেকে আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৪৬ হাজার কোটি ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের বছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮০০ ডলার। আমাদের প্রত‍্যাশিত গড় আয়ু ৭৩ বছর, ভারতে যেটা ৭০ এবং পাকিস্তানে ৬৭। বাংলাদেশে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুমৃত‍্যুর হার হাজারে ৩১-এ নামিয়ে আনা গেছে। ভারতে সেটা এখনো হাজারে ৩৪, পাকিস্তানে ৬৭। ১৯৯০ সালের ৫৮ শতাংশ থেকে বাংলাদেশ তার দারিদ্র্যের হার এখন ২১ শতাংশে কমিয়ে আনতে পেরেছে।

কিন্তু এত সব অর্জনের নিরিখে আমাদের অপ্রাপ্তি বা ঘাটতিরও একটি খতিয়ান নেওয়া দরকার। সেসব অপ্রাপ্তির কিছু কিছু চলমান, কিছু কিছু ঘনায়মান এবং কিছু কিছু আবির্ভূমান। যেমন দারিদ্র‍্য ও বঞ্চনা বাংলাদেশের একটি চলমান সমস‍্যা। এ দেশে এখনো ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র‍্যসীমার নিচে বাস করে। আরও ৬ কোটি লোকের দারিদ্র‍্যের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলমান ঘাটতির মধ‍্যে জীবনের নানান ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অসমতা ও বৈষম‍্য উল্লেখযোগ‍্য।

ঘনায়মান সংকটের মধ‍্যে ক্রমবর্ধমান অসমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি অন‍্যতম। এই অসমতা সুযোগ ও ফল উভয় ক্ষেত্রেই ব‍্যাপ্ত। বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশ ধনিক শ্রেণি দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, অথচ দেশের জনগোষ্ঠীর নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ মাত্র ৫ শতাংশ সম্পদের মালিক। আয়ের দিক থেকে দেখলে জাতীয় আয়ে এই দুই গোষ্ঠীর হিস্যা যথাক্রমে ৪১ শতাংশ বনাম ১৯ শতাংশ।

আবির্ভূমান সংকটের মধ‍্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক সমস‍্যা, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংকট। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে আবির্ভূত ইরানের সংঘাত এবং তা থেকে সৃষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধ ইতিমধ‍্যে এদেশের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। আমাদের জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে রপ্তানি-আমদানি এবং প্রবাসী আয় সবকিছুর ওপরই এই সংঘাত একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশকে অবিলম্বে এই আবির্ভূমান সংকটের মোকাবিলা করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের, যখনই তা ঘটুক না কেন।

এখন প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পঞ্চান্নতম স্বাধীনতা দিবসে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত‍্যাশাগুলো কী, বিশেষত নবনির্বাচিত সরকারের কাছে। প্রথম প্রত‍্যাশাটি হচ্ছে একটি স্বস্তির পরিবেশের, যেখানে মানুষ একটি সহনীয় ও শান্তির জীবনযাপন করতে পারে। তার জন‍্য একদিকে যেমন প্রয়োজন একটি আস্থা রাখার মতো রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতাবস্থার, অন‍্যদিকে দরকার হবে সঠিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় মূল‍্যস্ফীতি কমিয়ে এনে মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, ঠিক এই মূহূর্তে মানুষ ইরান সংঘাতের অভিঘাত নিয়ে শঙ্কিত। সে অভিঘাতের যেমন একটি অর্থনৈতিক মাত্রিকতা আছে, তেমনি আছে একটি মানবিক মাত্রিকতাও। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অভিঘাতের মধ‍্যে আছে জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে বৈদেশিক বাণিজ‍্যের অস্থিতিশীলতা এবং প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমার ঝুঁকি। স্বাভাবিকভাবে এসব বিষয় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করবে। বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক দেশে ছুটিতে এসে আটকে গেছেন; তাঁদের অনেকের কর্মচুক্তি এবং ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। আমরা প্রত‍্যাশা করি যে জনগণের উদ্বেগ লাঘব করতে স্বল্প মেয়াদ থেকে মধ‍্য মেয়াদে একটি সুচিন্তিত নীতিকাঠামো এবং ব্যবস্থাপত্র তৈরি করে সরকার এসব সমস‍্যার মোকাবিলা করবে।

তৃতীয়ত, আজ বাংলাদেশের সমাজে সন্ত্রাস ও সহিংসতা যেভাবে গেড়ে বসেছে, মানুষ তা থেকে অতি দ্রুত মুক্তি চায়। এ জাতীয় সন্ত্রাস সামাজিক স্বস্তি ছাড়াও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিঘ্নিত করে। মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, জুলুমবাজি ব‍্যবসা-বাণিজ‍্যের জন‍্য একটি আতঙ্ক ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষের প্রত‍্যাশা, এগুলো বন্ধ হয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। একটি শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হোক, যেখানে নতুন উদ‍্যোগ গ্রহণ করা হবে, দেশি-বিদেশি বিনোয়োগ আসবে।

মধ‍্য মেয়াদে জনগণের প্রত‍্যাশা, অর্থনীতিতে কর্মনিয়োজন বাড়ুক, নতুন নতুন কাজের সৃষ্টি হোক। সেই সঙ্গে নানান প্রণোদনার মাধ‍্যমে মানুষের সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা নতুন নতুন সুযোগ পাক। স্বাস্থ‍্যসেবার মতো মৌলিক মানবিক সেবার দক্ষতা ও মান বৃদ্ধি পাক, এটা সব মানুষের কাম‍্য। প্রবৃদ্ধি এমন সব খাতে ঘটুক, যেখানে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা কাজ করে। এটা হলে দারিদ্র‍্য ও বঞ্চনা কমিয়ে আনার ব‍্যাপারে একটি ইতিবাচক ব‍্যাপার ঘটবে। সেই সঙ্গে জোরদার করতে হবে সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে। যুব সমাজের কর্মকুশলতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর জন‍্য যথাযথ উদ‍্যোগ নেওয়া হোক, এটাও মানুষ চায়। সেটার জন‍্য বর্তমানের ঘুণে ধরা শিক্ষাকাঠামো ও পদ্ধতির খোলনলচে বদলে দিতে হবে।

জনগণের আশা, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সম্মুখযাত্রার একটি পথনকশা যেন জাতির সামনে থাকে। আমরা সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে পারি, কোনদিকে যাচ্ছি। সেখানে অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকারের বিষয়টি যেন জনগণকে জানানো হয়। সেই সঙ্গে যেন প্রতিষ্ঠিত হয় একটি দৃশ‍্যমানতার সংস্কৃতি এবং একটি জবাবদিহির কাঠামো। চূড়ান্ত বিচারে যেন অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ণ হয়ে একটি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র বাংলাদেশে গড়ে ওঠে। কারণ মানুষ জানে, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ভিন্ন রাজনৈতিক গণতন্ত্র অর্থহীন।

জনগণ বোঝে যে এসব কিছুই এক দিনে হবে না। তারা এটাও জানে যে যূথবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু যে ব‍্যাপারে তারা নিশ্চিত হতে চায়, সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছা, অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকার। আজ বাংলাদেশের ছাপ্পান্নতম স্বাধীনতা দিবসে সেটাই রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রত‍্যাশা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত