Ajker Patrika

টেকসই উন্নয়নে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ

ড. মো. শফিকুল ইসলাম
টেকসই উন্নয়নে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা এখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সে জন্য মানবসম্পদের মান, গবেষণা-সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনের গতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ডিগ্রি প্রদান কিংবা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে এই চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়; দরকার এমন একটি ইকোসিস্টেম, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে। এই প্রেক্ষাপটে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।

প্রথমত, লিংকেজের লক্ষ্য স্পষ্ট হওয়া দরকার। এর উদ্দেশ্য শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্ত করা। উন্নত দেশগুলোতে এই লক্ষ্যগুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড বা দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকার প্রণোদনা, করছাড় এবং যৌথ তহবিলের মাধ্যমে এই অংশীদারত্বকে টেকসই করেছে। বাংলাদেশেও এমন লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রম ও দক্ষতার বৈচিত্রায়ণ জরুরি। শিল্প খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দক্ষতার চাহিদা-ডেটা অ্যানালিটিকস, অটোমেশন, সাপ্লাই চেইন ডিজিটালাইজেশন, সবুজ উৎপাদন, সাইবার সিকিউরিটি—এসবকে নিয়মিতভাবে আপডেট করে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটবেইসড কোর্স, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল ও স্পট স্কিল সার্টিফিকেট চালু করলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার, অথচ শিল্প-কারখানা ও করপোরেট খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাবে বিপুল বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। এই বৈপরীত্যই স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের মধ্যে কাঠামোগত একটি বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ শুধু একটি ধারণা নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য কৌশল।

দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে মার্চেন্ডাইজিং, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশি পেশাজীবীরা কাজ করছেন। এর পেছনের মূল কারণ হলো স্থানীয় গ্র্যাজুয়েটদের বাস্তবমুখী দক্ষতার ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর অনেক শিক্ষার্থী জব মার্কেটের চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হন। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ জনবল পাচ্ছে না। এই দ্বিমুখী সংকট সমাধানের কার্যকর উপায় হলো শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো।

বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, বিগ ডেটা ও সবুজ প্রযুক্তি শিল্প খাতের রূপ বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্প খাতও ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি এই পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে প্রস্তুত করছে? অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম এখনো তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজের মাধ্যমে শিল্প খাত সরাসরি পাঠ্যক্রম উন্নয়নে যুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, জার্মানির ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ বা দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় শিল্প গবেষণা পার্কগুলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় প্রশিক্ষণ নেয়, বাস্তব সমস্যার ওপর কাজ করে এবং পড়াশোনা শেষ করার আগেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও এই ধরনের মডেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যদি সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাত সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেয়।

সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও দেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনো অপর্যাপ্ত। এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে, শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তাহলে

এর কার্যকারিতা বহুগুণে বাড়বে। পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও কো-অপ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা গেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। যদিও বর্তমানে সরকার ইন্টার্নশিপ চালু করছে।

ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা ও উদ্ভাবন। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টি ও নতুন ধারণা বিকাশের কেন্দ্র। কিন্তু গবেষণার ফল যদি শিল্প খাতে প্রয়োগ না হয়, তাহলে তা অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারে না। যৌথ গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী ধারণা বাণিজ্যিকীকরণ করা সম্ভব, যা নতুন পণ্য, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ তৈরিতে সহায়ক হবে।

এতে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পেটেন্ট এবং লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হবে, অন্যদিকে শিল্প খাত পাবে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। সবুজ শিল্পায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনেও এই লিংকেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এই ক্ষেত্রগুলোতে গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-সক্ষমতা এবং শিল্প খাতের বাস্তব প্রয়োগ একত্র হলে টেকসই শিল্পায়নের পথে বাংলাদেশের দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

শিক্ষকদের ভূমিকার কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প খাতের পেশাজীবীদের গেস্ট লেকচার, যৌথ গবেষণা ও কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টে যুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জব মার্কেট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিল্প খাতের আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আপডেটেড থাকতে পারবেন। এটি একটি দ্বিমুখী শেখার প্রক্রিয়া, যা উভয় পক্ষের সক্ষমতা বাড়ায়। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, ভিশন ২০৪১ কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। এটি শুধু বেকারত্ব কমানোর উপায় নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সে কারণে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাত যদি সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসে, তবে বাংলাদেশের তরুণসমাজ দেশীয় এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে এবং দেশ এগিয়ে যেতে পারবে টেকসই উন্নয়নের পথে।

আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হলে প্রযুক্তি স্থানান্তর ত্বরান্বিত হবে। প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের মেন্টরশিপ ও যৌথ প্রকল্পে যুক্ত করা গেলে জ্ঞান ও বাজার—দুটোরই সেতুবন্ধন তৈরি হবে। ফলাফল পরিমাপের জন্য স্পষ্ট সূচক দরকার। যৌথ গবেষণার সংখ্যা নয়—পেটেন্ট, লাইসেন্সিং আয়, স্টার্টআপ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি—এসব আউটকামভিত্তিক সূচকে সাফল্য মাপা উচিত। নিয়মিত মূল্যায়ন হলে নীতিগত সংশোধন সহজ হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে নয়, জাতীয় কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। নীতি, অর্থায়ন, মানবসম্পদ ও শাসনব্যবস্থা—সবখানে সমন্বয় না হলে প্রত্যাশিত ফল আসবে না। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ খুবই জরুরি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মাত্র দেড় বছর আগে র‍্যাবে যোগদান করেছিলেন বিজিবি সদস্য মোতালেব

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা: বিএনপিতে বিদ্রোহী অর্ধশতাধিক

রাস্তায় সাইকেল থামিয়ে মুদিদোকানিকে কুপিয়ে হত্যার পর ‘হামলাকারী’ নিহত গণপিটুনিতে

কূটনীতিকদের কাছে আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরল বিএনপি

ইডেন–বদরুন্নেসা–হোম ইকোনমিকস নিয়ে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়তে চায় জামায়াত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত