Ajker Patrika

৮ হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্বরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়াই

  • আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও তাঁদের স্বজনদের নামে এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়।
  • দেশে মোট লাইসেন্স ৫৩,৭০২টি; আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে দেওয়া হয় ১৯,৫৯৪।
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন না পাঠিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি ছিল সবার জানা।
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা
৮ হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্বরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়াই
ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অন্তত আট হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এসব লাইসেন্সের অধিকাংশই পেয়েছেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং তাঁদের স্বজনেরা।

২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত দেওয়া এসব লাইসেন্সের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানলেও এত দিন প্রকাশ্যে আসেনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে। জেলায় জেলায় তদন্ত কমিটি কাজ করছে। মন্ত্রণালয় বলছে, যাচাই-বাছাই শেষে অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল, অস্ত্র জব্দ এবং মামলা করা হবে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুধু অনাপত্তিপত্রের বিষয় নয়, আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে শটগান বা এনপিবি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালা ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অনুমোদনের পর জেলা প্রশাসক (ডিসি) লাইসেন্স দিতে পারেন। কিন্তু পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসক আবেদনকারীকে যোগ্য মনে করলে সুপারিশসহ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। মন্ত্রণালয় অনাপত্তি দিলে জেলা প্রশাসক লাইসেন্স ইস্যু করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দেওয়া অন্তত ৮ হাজার ১৭৩টি পিস্তল ও রিভলবারের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের এই অনাপত্তি নেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও পাঠানো হয়নি। জেলাগুলোর সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের হিসাব মেলানোর সময় এই নিয়ম লঙ্ঘন ধরা পড়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত এসব লাইসেন্স নামমাত্র কাগজপত্র এবং রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে। বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানলেও এত দিন কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে কিছু বলেননি।

ওই সময় একটি জেলায় ডিসি থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি যে জেলায় দায়িত্বে ছিলেন, সেখানে এমনটা খুব একটা হয়নি। তবে বিষয়টি তাঁরা সবাই জানেন। সবকিছু দলীয়ভাবে পরিচালিত হলে এমন হওয়াই স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ থাকায় এবং আবেদনকারী মন্ত্রীদের স্বজন হওয়ায় আবেদনগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি। আর পাঠালেও তা অনুমোদন হয়েই আসত, তাই কেউ গুরুত্ব দেননি।

পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৩ হাজার ৭০২টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তির নামে রয়েছে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮৫৪টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি। রাজনীতিকদের নামে লাইসেন্স রয়েছে ১৪ হাজার ২৩৫টি, এগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীর কাছে ১১ হাজারের বেশি লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে। শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে (২০০৯-২০২৪) সারা দেশে মোট ১৯ হাজার ৫৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ১৭৩টি পিস্তল ও রিভলবারের লাইসেন্স দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি ছাড়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া পিস্তল বা রিভলবারের লাইসেন্সধারীদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের কাছে লাইসেন্স করা অন্তত আটটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। খুলনায় রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগের নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ (গল্লামারী), সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজগর বিশ্বাস, মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জেড এ মাহমুদ ডন, সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের সাবেক এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির ও তাঁর ভাই গোলাম কিবরিয়া বড় মনির, সাবেক এমপি ছানোয়ার হোসেন, সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহান জয়, সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুজ্জামান সোহেল এবং টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি।

বগুড়ায় আওয়ামী লীগের ১৩৪ জন নেতা-কর্মীর লাইসেন্স করা পিস্তল রয়েছে। তাঁদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মজনু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন, আসাদুর রহমান দুলু এবং পৌর আওয়ামী লীগের নেতা রফিনেওয়াজ খান রবিন উল্লেখযোগ্য। ওই আমলে মুন্সিগঞ্জে ১৮৪টি, কিশোরগঞ্জে ২০০টি, রংপুরে ৪০৮টি এবং নাটোরে ৩৫০টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি ছাড়াই দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল, অস্ত্র জব্দ ও মামলা করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশের পর ইতিমধ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের সব লাইসেন্স পর্যালোচনায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। লাইসেন্সগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় বা নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রতিটি জেলার ডিসি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এনএসআইয়ের প্রতিনিধি এবং পাবলিক প্রসিকিউটরকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া লাইসেন্সের বিষয়ে জেলায় জেলায় তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সম্ভাব্য অনিয়ম চিহ্নিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামায়াতের মঞ্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি

নেতানিয়াহু নিহত বা গুরুতর আহত হওয়ার দাবি ইরানি গণমাধ্যমের, ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল

ইরান যুদ্ধ থেকে ‘প্রস্থানের পথ’ খুঁজছে ইসরায়েল

ইরানের স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের শক্তিমত্তা

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মানুষের ৪৭টি মাথার খুলি, বিপুল পরিমাণ হাড়সহ গ্রেপ্তার ৪

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত