Ajker Patrika

প্রাক্‌-নির্বাচনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ: টিআইবি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৪৩
প্রাক্‌-নির্বাচনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ: টিআইবি
ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত ‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। ছবি: আজকের পত্রিকা

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে সামনে রেখে প্রাক্‌-নির্বাচন পর্যায়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক দুর্বলতা নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত ‘প্রাক্‌-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. মাহফুজুল হক। অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

টিআইবি জানায়, তফসিল ঘোষণার আগে ও পরবর্তী উভয় পর্যায়েই নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিন দফা ভোটার তালিকা হালনাগাদ সত্ত্বেও কিছু আসনে অস্বাভাবিক হারে ভোটার স্থানান্তর (মাইগ্রেশন) এবং বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ১ হাজার ১৮৫টি দাবি ও আপত্তি নির্বাচন কমিশনে জমা পড়লেও কিছু ক্ষেত্রে জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

নতুন নিবন্ধন পাওয়া কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই-বাছাই, যোগ্যতা ও নিবন্ধন শর্ত পূরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে একাধিক দল। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও সেসব এলাকায় কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পর্যবেক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে টিআইবি জানায়, নামসর্বস্ব এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যবেক্ষক নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। ৮১টি সংস্থার অধীনে নিবন্ধিত ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ১৭টি সংস্থা থেকেই ৬৪ শতাংশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। এমনকি কোনো অফিস ও পর্যাপ্ত লোকবল না থাকা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা পর্যবেক্ষণের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশনের বহনের সিদ্ধান্তকেও কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের সময় প্রায় ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য সাময়িকভাবে ফাঁসের ঘটনাকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এমন পোস্টাল ভোট নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর সন্দেহ রয়েছে। একজনের মোবাইল নম্বর দিয়ে অন্যজনের ব্যালট গ্রহণ, নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোট গ্রহণ এবং কয়েকটি দেশে একই ঠিকানায় বিপুলসংখ্যক ব্যালট গণনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তফসিল ঘোষণার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির অভিযোগ করেছে টিআইবি। পূর্ববর্তী নির্বাচনে সহিংসতাপ্রবণ এলাকা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেশি সহিংসতা ঘটেছে—এমন জেলাগুলোতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, মব ভায়োলেন্স ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীর হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখানোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যকেও বিতর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই নিয়েও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছে টিআইবি। আয়-ব্যয়, দ্বৈত নাগরিকত্ব, বিদেশে সম্পদ ও ঋণ-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অসংগতি প্রকাশ্যে এলেও সেগুলোর কার্যকর যাচাই হয়নি। অন্তত ৪৫ জন ঋণগ্রস্ত প্রার্থী আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া মনোনয়ন বাছাই ও বাতিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ, নারী প্রার্থীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের কঠোরতা না দেখানোর বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সামগ্রিকভাবে প্রাক্‌-নির্বাচন পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান দুর্বলতা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে টিআইবি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত