Ajker Patrika

নারীর অধিকার কোনো একটি সরকারের দান নয়: সারা হোসেন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ২১
নারীর অধিকার কোনো একটি সরকারের দান নয়: সারা হোসেন
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নারীর অধিকার কোনো একটি সরকারের দান নয়; এটি বহু বছরের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।

আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর পুরাতন এলিফ্যান্ট রোডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) অডিটরিয়ামে উইমেন ইন ডেমোক্রেসির (উইনড) উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান, দায় ও দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

গোলটেবিল আলোচনা। ছবি: আজকের পত্রিকা
গোলটেবিল আলোচনা। ছবি: আজকের পত্রিকা

আলোচনায় সারা হোসেন বলেন, ‘নারীর অধিকার কোনো একটি সরকারের দান নয়; এটি বহু বছরের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল। ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার যে নীতি সংবিধানে রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্র বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে এবং বৈষম্যের নতুন ক্ষেত্রগুলো মোকাবিলায় সংবিধানকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে কি না।’

বাংলাদেশে নারীর অধিকার ও বৈষম্য নিরসনে যে সাংবিধানিক অর্জন বহু দশকের সংগ্রামের ফল, তা আজ নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘সরাসরি বৈষম্য নিষিদ্ধ করার যে অধিকার স্বাধীনতার পর সংবিধানে নিশ্চিত হয়েছিল, সেটির ওপরও এখন হাত পড়তে দেখা যাচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের।’

সারা হোসেন স্মরণ করিয়ে দেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীরা শুধু সংগ্রামী হিসেবেই নয়, ভুক্তভোগী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বীরাঙ্গনাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন ও নীতিমালা গড়ে ওঠে। ভিকটিম হওয়ার অভিজ্ঞতাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, বরং সেসব অভিজ্ঞতাই রাষ্ট্রকে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সারা হোসেন বলেন, সংবিধানে বৈষম্য নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অর্জন থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীবান্ধব রায় দেওয়া একাধিক বিচারকের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ইতিবাচক বার্তা দেয় না।

সারা হোসেন অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের সহিংস ঘটনার বিচার প্রয়োজন হলেও সেই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বহু নারীকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কারাবন্দী করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নির্বাচনের আগে ও পরে এই অনিয়ম বন্ধে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সারা হোসেন আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইবনে সিনার’ চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের উদাহরণ দেখা যাচ্ছে, যা সংবিধানবিরোধী। একইভাবে পাহাড়ি নারীর জাতিসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনপ্রতিনিধিত্ব চ্যালেঞ্জ করার ঘটনাও উদ্বেগজনক।

ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে নারী অধিকারকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে মামলা ও সামাজিক আক্রমণ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা আইন নেই, অথচ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আইনের অপব্যবহার ছাড়াও জনমনে কৃত্রিম ক্ষোভ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

সারা হোসেন বলেন, ‘কে মুসলমান আর কে নয়—এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নেই। তবু কিছু গোষ্ঠী প্রকাশ্যে এই দাবি করছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে।’

বক্তব্যের শেষে সারা হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের অগ্রগতি এক ধাপে হয়নি। নানা সময়ে প্রগতিশীল আইন, আদালতের রায় ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই অর্জন এসেছে। সেই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। নারী অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার সংগ্রাম এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত