Ajker Patrika

অবশেষে চালুর পথে ট্রাক চালকদের চার বিশ্রামাগার

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
অবশেষে চালুর পথে ট্রাক
চালকদের চার বিশ্রামাগার
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসারে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের জন্য নির্মিত আধুনিক বিশ্রামাগার। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেড় বছর ধরে অব্যবহৃত থাকার পর মহাসড়কের পাশে ২২৭ কোটি টাকায় নির্মিত চারটি চালক বিশ্রামাগার ইজারার মাধ্যমে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ হলেও এগুলো এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। বিশ্রামাগারগুলো আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের বিশ্রামের সুযোগ বাড়িয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া, হবিগঞ্জের জগদীশপুর, কুমিল্লার নিমসার এবং মাগুরার লক্ষ্মীকান্দরে নির্মিত হয়েছে এই চারটি বিশ্রামাগার। এতে রয়েছে শোয়ার ঘর, গোসলখানা, ক্যানটিন, চিকিৎসাকক্ষ, ওয়ার্কশপ, ওয়াশ জোন, গাড়ি পার্কিং, নামাজের স্থান, বিনোদনকেন্দ্র ইত্যাদি সুবিধা।

সংশ্লিষ্ট চারটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীরা আজকের পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, দরপত্রে পর্যাপ্ত দর না পাওয়ায় বারবার টেন্ডার আহ্বান করতে হয়েছে বলেই বিশ্রামাগারগুলো চালু করতে দেরি হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের বিশ্রামাগারের জন্য পাঁচ দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রায় ৪৫ লাখ টাকার দর পাওয়া গেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইজারা চূড়ান্ত হতে পারে।

হবিগঞ্জের বিশ্রামাগারের জন্য তিন দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২৩ জুলাই তৃতীয় দফার দরপত্র খোলা হবে। কুমিল্লার বিশ্রামাগারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে চারবার। সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা দর পাওয়া গেছে। আরও ভালো প্রস্তাবের আশায় আবারও দরপত্র ডাকা হয়েছে।

মাগুরার বিশ্রামাগারের জন্যও কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৭ লাখ টাকার দর পাওয়া গেলেও এখনো ইজারা চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দরেই ইজারা দিলে পরে অডিট আপত্তি উঠতে পারে যে আরও বেশি দর পাওয়া সম্ভব ছিল। সে কারণেই সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দর ওঠা নিশ্চিত করতে কয়েক দফা পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিশ্রামাগার পরিচালনার জন্য টেন্ডারপ্রক্রিয়া এখন চলমান। এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’

বিশ্রামাগার কেন ইজারায়

পণ্যবাহী গাড়িচালকদের জন্য পার্কিং সুবিধা থাকা বিশ্রামাগার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশিকায় ইজারা, অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ওঅ্যান্ডএম) অথবা বিভাগীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ শেষ পর্যন্ত ইজারা পদ্ধতিই বেছে নিয়েছে।

বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, নিজস্ব জনবল দিয়ে এসব বিশ্রামাগার পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আবার ওঅ্যান্ডএম পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্যও কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার পাওয়া যায়নি। তাই ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইজারাদারের জন্য যেসব শর্ত

উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিশ্রামাগারগুলো তিন বছর মেয়াদে ইজারা দেওয়া হবে। ইজারাদারকে ১২ মাসের ইজারা মূল্যের সমপরিমাণ নিরাপত্তা জামানত এবং কর-ভ্যাটসহ সব সরকারি পাওনা পরিশোধ করতে হবে। বরাদ্দের মেয়াদ শেষের অন্তত ছয় মাস আগে নতুন ইজারাপ্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। নিয়মিত আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন সড়ক ও জনপথ বিভাগে জমা দিতে হবে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারিত সেবামূল্য দিয়ে ট্রাকচালক ও সহকারীরা বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে পারবেন। প্রবেশের সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পরিচয়পত্র যাচাই করা হবে। মাদক ও জুয়া নিষিদ্ধ থাকবে। পুরো এলাকা সিসিটিভির আওতায় রাখতে হবে। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, সেবামূল্য প্রদর্শন, অভিযোগ বাক্স, প্রবেশ-প্রস্থানের রেকর্ড সংরক্ষণ এবং কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। অবকাঠামো, পার্কিং এলাকা ও সংযোগ সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও থাকবে ইজারাদারের ওপর।

বিশ্রাম নিতে দিতে হবে নির্ধারিত ফি

বিশ্রামাগারে দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের রাতে থাকা এবং অন্যান্য সেবা নিতে জন্য কিছু ফি দিতে হবে। যানবাহন পার্কিং, বিশ্রামকক্ষ ও শৌচাগার ব্যবহারের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। অতিভারী পণ্যবাহী মোটরযানের ক্ষেত্রে পার্কিং ফি হবে প্রথম পাঁচ ঘণ্টার জন্য ১৫০ টাকা এবং এরপর প্রতি ঘণ্টায় ৩০ টাকা। ভারী পণ্যবাহী গাড়ির জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টার ফি ১০০ টাকা, এরপর প্রতি ঘণ্টায় ২০ টাকা। মাঝারি পণ্যবাহী যানের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ ঘণ্টার জন্য ৭৫ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টায় ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর হালকা শ্রেণির পণ্যবাহী গাড়ির জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টায় ৫০ টাকা এবং এরপরের প্রতি ঘণ্টার জন্য ১০ টাকা দিতে হবে। বিশ্রামকক্ষ ব্যবহারের জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টার ভাড়া ১৫০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টার জন্য ৩০ টাকা দিতে হবে। টয়লেট ব্যবহার ফি ৫ টাকা, গোসল ১০ টাকা। টয়লেট ও গোসলখানা একসঙ্গে ব্যবহার করলে ১৫ টাকা দিতে হবে।

কেন জরুরি এই বিশ্রামাগার

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী একজন চালকের একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো নিষেধ। এরপর অন্তত আধ ঘণ্টা বিশ্রাম দিয়ে আবার সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে। দিনে আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানোও নিষিদ্ধ।

দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। বড় পণ্য বা যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চালক বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাঁর মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা ও দীর্ঘ রুটে এমন হয়।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের জন্য চালকদের বিশ্রামাগার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আরও আগেই চালু হওয়া উচিত ছিল। তবে চালুর পর নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মাদকসহ বিভিন্ন অপকর্মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইজারাদার যেন শুধু মুনাফার দিকে না তাকিয়ে সেবার মান বজায় রাখে, সে জন্য কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন।’

ভবিষ্যতে আরও সুবিধা

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে এসব বিশ্রামাগারে ফিলিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, চেইন ফুড শপ, উন্নত ওয়ার্কশপ এবং প্রশিক্ষণ বা সেমিনারের সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পৃথক দুটি কমিটির মাধ্যমে বিশ্রামাগারের কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত