Ajker Patrika

১২-২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রেশন চালুর উদ্যোগ, কী থাকছে এতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ০৪
১২-২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রেশন চালুর উদ্যোগ, কী থাকছে এতে

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে এবং কাজে মনোযোগ বাড়াতে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ বিভাগ এই প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, গত মে মাসে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক প্রথম এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীরা চরম অর্থ-সংকটে ভুগছেন। অনেকে ধার-দেনা ও ঋণের জালে জড়িয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন, যা তাঁদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কর্মচারীদের এই মানসিক চাপ কমাতে এবং জীবনযাত্রা সহজ করতে রেশন সুবিধা চালু করা জরুরি।

ডিসিদের এই প্রস্তাবের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে এবং অর্থ বিভাগের কাছে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করে। গত জুন মাসে অর্থ সচিবকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, অর্থ বিভাগকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের অগ্রগতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানাতে হবে। এ ছাড়া তিন মাস পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন অধিশাখার উপ-সচিব মো. মামুন বাসসকে জানান, ডিসি সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের করণীয় জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কারা পাবেন এই সুবিধা এবং বর্তমানে কারা পাচ্ছেন?

১২ থেকে ২০তম গ্রেডের আওতায় মূলত সরকারি চাকরির নিম্ন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা রয়েছেন।

১২তম গ্রেড: এই স্তরে রয়েছেন অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক, গুদামরক্ষক, নিরাপত্তা পরিদর্শক এবং ডাটা এন্ট্রি সুপারভাইজারের মতো কর্মীরা।

২০তম গ্রেড: এটি সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন স্তর, যা সাধারণত চতুর্থ শ্রেণি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত এসএসসি বা সমমান শিক্ষাগত যোগ্যতায় এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদে রয়েছেন অফিস সহায়ক (পিয়ন), নিরাপত্তা প্রহরী, মালি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১০টি বিশেষায়িত সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্ধারিত মূল্যে রেশন সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে:

১. সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী)

২. বাংলাদেশ পুলিশ

৩. বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)

৪. আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী

৫. কারা অধিদপ্তর

৬. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

৭. জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)

৮. স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)

৯. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

১০. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

উদাহরণস্বরূপ, পুলিশ বাহিনীতে চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য বর্তমানে মাসে ২০ কেজি চাল, ২০ কেজি আটা, ২ কেজি ডাল, সাড়ে ৪ লিটার সয়াবিন তেল এবং ২ কেজি চিনি সাশ্রয়ী মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। নতুন উদ্যোগ সফল হলে ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের সাধারণ কর্মচারীরাও একই ধরনের সুবিধা পেতে পারেন।

এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও সরকারি কর্মচারীরা রেশন সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। তৎকালীন খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমামও কর্মচারীদের রেশন দেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে অর্থ বিভাগে ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনাধীন ছিল।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সুশাসন নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ফিরোজ মিয়া বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে রেশন সুবিধা চালুর প্রস্তাবটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। অনেক সময় সরকারি কর্মচারীরা তাদের আর্থিক অসচ্ছলতা বা সুযোগ-সুবিধার অভাবকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করান। এই রেশন-সুবিধা চালু হলে তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হবে এবং অনৈতিক চর্চা নিয়ন্ত্রণে এটি সাহায্য করবে।’

তবে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘রেশন বিতরণ ব্যবস্থা সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হলে কিংবা প্রকৃত সুবিধাভোগীরা যদি এই সহায়তা না পান, তবে এই ভালো উদ্যোগটিই হিতে বিপরীত হতে পারে।’

বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই রেশন ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্যও ইতিবাচক সুফল বয়ে আনার একটি রাষ্ট্রীয় তাগিদ তৈরি করবে। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য রেশন নিশ্চিত করতে সরকারের সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিতরণ কাঠামো গড়ে তোলাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত