Ajker Patrika

ঈদযাত্রা: দুই মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা

  • উত্তরাঞ্চলে যাত্রায় হেমায়েতপুর থেকে নবীনগর ও নবীনগর থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত অংশ ঝুঁকিপূর্ণ।
  • এলেঙ্গায় চলমান কাজের জন্য এবং যমুনা সেতুর দুই প্রান্তেও দীর্ঘ জট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
  • ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভুলতা, সাহেপ্রতাপ, আশুগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ হতে পারে জটের হটস্পট।
  • দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে ভোগান্তি দেবে সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় মোড়ে বাসগুলোর বিশৃঙ্খলা।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
ঈদযাত্রা: দুই মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপনে শিকড়ের টানে কর্মস্থল রাজধানী ঢাকা ছাড়বেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। প্রতিবছরের মতো এবারের ঈদযাত্রায়ও বাড়িমুখী মানুষের বেশি চাপ পড়বে মহাসড়কে। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে যাত্রীর বাড়তি চাপে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, ছুটি কম হলে বা শিল্পকারখানায় ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া না হলে একসঙ্গে বাড়িমুখী মানুষের ঢল নামলে মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হতে পারে।

রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে গাবতলী, সাভার, বাইপাইল, চন্দ্রা, উত্তরা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, কাঞ্চন ব্রিজ, সায়েদাবাদ, কাঁচপুর এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকারি দপ্তরগুলোর ঈদের প্রস্তুতিমূলক অভ্যন্তরীণ সভায় এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশাবাদ জানানো হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সড়ক ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে সড়ক বিভাগে সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি বলেছেন, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ঈদযাত্রা স্বস্তির ও নিরাপদ হবে। এ জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলার যাত্রীরা। কারণ এই পথের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর পর্যন্ত এবং নবীনগর-বাইপাইল-চন্দ্রা মহাসড়কে তীব্র যানজট মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে। আবার মহাখালী থেকে উত্তরার আবদুল্লাহপুর হয়ে বাইপাইল-চন্দ্রা পথেও থাকে যানজট। একই অবস্থা হয় টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে। এই পথে চলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের যানবাহন।

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঈদযাত্রা, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা, মহাসড়কে সরাসরি লেনে ও উল্টোপথে ব্যাটারিচালিত অসংখ্য রিকশা, রিকশা-ভ্যানসহ তিন চাকার যানের চলাচল, চালকদের নিয়ম না মানার কারণে সালেহপুর সেতুর পর থেকে হেমায়েতপুর-সাভার-নবীনগর এবং নবীনগর থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাভার-নবীনগরের জট ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ব্যবহারকারীদেরও ভোগান্তিতে ফেলবে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা হয়ে রংপুর পর্যন্ত অধিকাংশ অংশ ৬ লেনে উন্নীত হয়েছে। এতে চলাচল সহজ হওয়ার কথা থাকলেও বাইপাইল এলাকায় আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের কারণে নিচের সড়ক সরু হয়ে গেছে। চন্দ্রা মোড়ে বিভিন্ন গন্তব্যের বাসসহ যানবাহন একত্র হওয়ায় সেখানে জটের ঝুঁকি থাকে। টঙ্গী, গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা একসঙ্গে বের হলে চাপ আরও বাড়তে পারে। এলেঙ্গা এলাকায় সড়ক প্রশস্তকরণ চলছে। অতিরিক্ত যানের চাপ পড়লে যমুনা সেতুর দুই প্রান্তেও জট হতে পারে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ওভারপাস নির্মাণকাজের কারণে নিচের সড়ক সংকুচিত, সেখানেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর সেতুর পশ্চিম ঢাল, যাত্রামুড়া, তারাব, ডেমরা ও ভুলতায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। চার লেনের উন্নয়নকাজ চলায় বিভিন্ন অংশে সড়কের অবস্থা নাজুক। নরসিংদীর সাহেপ্রতাপ বাজার, ভোলানগর ও ইটখোলায় সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। এসব স্থানে স্থানীয় যানবাহন ও কাউন্টারের কারণে বাস দাঁড় করিয়ে রাখায় জট সৃষ্টি হয়। ভৈরব বাজার, আশুগঞ্জ, হবিগঞ্জের মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ গোলচত্বরে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ছুটি কম হলে এবারের ঈদে এই দুই মহাসড়কে ভোগান্তি হতে পারে।

এ ছাড়া এই দুই মহাসড়কের যানগুলোকে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথেও তীব্র জটে পড়তে হতে পারে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুরের পূর্ব ঢাল ও মদনপুরে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহনের জন্য সায়েদাবাদ, দোলাইরপাড় ও পোস্তগোলার জট মানুষকে ভোগাবে। বিশেষ করে দোলাইরপাড় মোড়ে গড়ে ওঠা কাউন্টারগুলোর সামনে এবং এক্সপ্রেসওয়ের প্রবেশমুখে বাসের বিশৃঙ্খলায় প্রতি ঈদেই তীব্র জট সৃষ্টি করছে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজায়ও চাপের কারণে জটের শঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিমানবন্দর, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর ও গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকাও জটের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশালের মহাসড়ক দুই লেনের হওয়ায় ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বাড়লে দুর্ঘটনা আশঙ্কা থাকে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, মহাসড়কে বড় কোনো জটিলতা নেই। গতবার ঢাকা-সিলেট পথে তেমন যানজট হয়নি, এবারও তেমন সমস্যা হবে না বলে আশা করা হচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চলের পথে বাইপাইল, চন্দ্রা ও যমুনা সেতু এলাকায় কিছুটা যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। ধাপে ধাপে ছুটি কার্যকর করা গেলে চাপ কমবে। ঈদের আগমুহূর্তে সাময়িক জট হতে পারে। তবে মহাসড়কের অবস্থার কারণে বড় ধরনের জটের আশঙ্কা কম।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৫ রমজানের মধ্যে সড়কের সব মেরামতকাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিমেন্ট, রড, পাথর ও বালুবাহী ট্রাক ঈদের আগে-পরে সাত দিন সীমিত এবং ঈদের তিন দিন আগে বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক থাকবে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, এবার ঈদযাত্রা আগের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে। ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুলিশ সদস্য মহাসড়কে মোতায়েন করা হয়েছে। সড়কে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, দেশের বাস্তবতায় পর্যাপ্ত সড়ক এবং যানবাহন—দুটিরই অভাব থাকায় ভোগান্তি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ছুটি বাড়িয়ে ধাপে ধাপে মানুষকে বাড়ি পাঠিয়ে, সড়কে অযান্ত্রিক ছোট যান বন্ধ রাখাসহ কিছু ব্যবস্থা নিলে সেটা কমানো সম্ভব। ঈদের সময় সড়কে ঈদ সালামির নামে চাঁদা তোলা বন্ধ করতে হবে।

ঈদে দেড় কোটি মানুষ রাজধানী ছাড়তে পারেন

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব বলছে, ঈদুল ফিতরে প্রায় দেড় কোটি মানুষ রাজধানী ছাড়তে পারেন। তাঁদের ৬০-৭০ শতাংশ যাবেন সড়কপথে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ ছুটি থাকলে চাপ ভাগ হয়ে যেতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিআরটিএ, সওজসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখন থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করলে ভোগান্তি হবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত