Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০: ১১
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ
এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটির দাবি, বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা ধরনের ত্রুটি ও অনিয়মের কারণে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দী করা এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

আজ বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ এসব উদ্বেগের কথা জানায়।

গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকও। তাঁদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালে দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলা ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের মুখে ওই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে বর্তমানের অনেক বিচারপ্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক মানের সুষ্ঠু বিচারের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করছে না। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। নতুন সরকারের উচিত সুষ্ঠু তদন্ত, ইচ্ছামাফিক আনা অভিযোগ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করা।

বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার চলছে। ওই ঘটনায় ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হন। এই আন্দোলনের পরই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারায়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো অন্যান্য অভিযোগও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, তারা ট্রাইব্যুনালের এক ডজনের বেশি মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের মতে, এসব মামলায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন অপরাধের অভিযোগ এনে ব্যক্তিদের আটক করেছে, অথচ তদন্তে ব্যবহৃত একাধিক জবানবন্দিতে একই ধরনের ভাষা হুবহু কপি-পেস্ট করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে, যাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনাও রয়েছেন। মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রথম গঠন করা হয় ২০১০ সালের মার্চে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়। এর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা। তবে সে সময়ের বিচারগুলোও প্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে আঁতাত এবং মৌলিক আইনি সুরক্ষার অভাবের কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনাকারী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংশোধন আন্তর্জাতিক আদালতের সমমানের বিচারিক প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারও এ বিষয়ে আর কোনো সংশোধনী আনেনি।

সংস্থাটির ভাষ্য, বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রসিকিউটররা প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন। আটক ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে লিখিত কারণ ছাড়াই আটক রাখা সম্ভব। আলাদা আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগও নেই। প্রসিকিউশন প্রমাণ প্রকাশের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিচার শুরু করা যায়, যা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় নয়। অনুপস্থিতিতে বিচার হলেও অভিযুক্তের নিজের আইনজীবী বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের জেরা করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে তাঁদের সংবাদ পরিবেশনকে কেন্দ্র করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সে সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার অভিযোগ থাকলেও প্রসিকিউটরদের দাবি, এই দুই সাংবাদিক ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচার করে সরকারকে হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সহায়তা করেছিলেন।

তাঁদের আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, গ্রেপ্তারের সময় প্রসিকিউটররা তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লিখিত কারণ দেননি। এটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের লঙ্ঘন।

পরে ২৭ জুলাই এই দুই সাংবাদিককে ৪১ জনের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলতে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট অপরাধকে বোঝায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তাদের নেওয়া একাধিক জবানবন্দিতে একই ধরনের অনুচ্ছেদ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, যা এসব জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

উদাহরণ হিসেবে সংস্থাটি মোহাম্মদ হাসান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার কথা উল্লেখ করেছে। চট্টগ্রাম শহরে ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটিতে প্রকাশিত ৫৫টি জবানবন্দির মধ্যে ১৪টিতে ছয় লাইনের একটি অংশ প্রায় হুবহু একই ভাষায় রয়েছে। সেখানে সাতজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কর্মীদের ব্যবহার করে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আরও নয়টি জবানবন্দিতে দীর্ঘ একটি অনুচ্ছেদ প্রায় একই ভাষায় ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ছয়জন নেতা বারবার উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং বাকি ১৬ অভিযুক্তকে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ ও নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই একই মামলায় আটক থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে একটি অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ করেন। সেখানে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরকে ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। ওই ঘটনা প্রকাশের পর প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন। তবে প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয় এখনো তদন্ত শেষ করেনি। এর মধ্যেই বিচারকেরা অভিযোগ গঠন করেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে যে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উঠেছিল, সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। একই ধরনের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ গঠন একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে আবারও ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার এবং বাংলাদেশের জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত